প্রায় তিন দশক একসঙ্গে জোটবদ্ধ রাজনীতি করেছে বিএনপি ও জামায়াত। রাজপথ থেকে ক্ষমতার মঞ্চ— দুই ক্ষেত্রে তাদের রসায়ন রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল। এ দুইটি দলের এমন দীর্ঘ মেয়াদী ঐক্যের দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। তবে ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এক সময়ের মিত্র এই দল দুটির আলাদা পথচলা শুরু হয়। কার্যত ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দুই দলই আলাদাভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে থাকে। তাই তারা নিজেদের মতো করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। আখেরে সরকার গঠন করে বিএনপি ও প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তাদের সঙ্গে আরও যুক্ত হয় তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে অতীতে সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান ছিল পরস্পরবিরোধী। বিশেষ করে ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ঘুরেফিরে সরকার ও বিরোধী দলের আসনে বসে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।
সেখান থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সংসদের প্রধান বিরোধী দল না হলেও তৎকালীন সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষই ছিল বিএনপি। এই সময় কোনও ইস্যুতেই সরকার ও বিরোধী দলের একমত হওয়ার তেমন নজির নেই। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের অবস্থান ছিল ভিন্ন। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবার দুই সাবেক মিত্রই সরকারও বিরোধী দলের আসনে। নির্বাচনের আগে ও পরে বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দলের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ছিল স্বাভাবিক বিষয়। বিশেষ করে জুলাই সনদ, গণভোট ও ‘রাজাকার’ ইস্যুতে সংসদ-রাজপথে দু’পক্ষই মাঝে-মধ্যে অশান্ত হয়ে ওঠার দৃশ্য দেখা গেছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন আবহও দেখা গেছে।
সংসদে সরকার দল ও বিরোধী দল প্রায় সময় মারমুখী হলেও আওয়ামী লীগ প্রশ্নে আবার একই ধরনের মনোভাব দেখাচ্ছে। সর্বশেষ গত ৩০ এপ্রিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সমাপনী অধিবেশনে সংসদ নেতা তারেক রহমান ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে কিছুটা ঐক্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বিরোধী দলীয় নেতার ঐক্যের ডাক, জ্বালানি সংকট নিয়ে দুই পক্ষের যৌথ কমিটি ও বিরোধী দলীয় নেতার নির্বাচনি আসনে উন্নয়ন বরাদ্দ বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনা— এসব কারণে প্রশ্ন উঠেছে, সরকার কেন বিরোধী দলের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চায়? তাদের কি উভয়ের মাঝে কোনও গোপন সমঝোতা আছে?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিরোধী দলের সঙ্গে কিছু বিষয়ের ঐক্যে মনে হচ্ছে— সরকার অহেতুক ঝামেলায় জড়াতে চায় না। তাই জ্বালানি সংকট ও সংবিধান সংশোধন ইস্যুতে গঠন করা কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্বও রেখেছে। আবার শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা নিয়ে দুই পক্ষ ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। আমি মনে করি, এটা খারাপ কিছু না। দেশের স্বার্থে কিছু বিষয়ে ঐক্য থাকা জরুরি।’’
কখনও ঐক্য কখনও অনৈক্য
জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই কার্যত দুই মেরুতে অবস্থান বিএনপি ও জামায়াতের। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জুলাই সনদ নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় যেকোনও কর্মসূচিতেই দুই দলের প্রতিনিধিত্ব ছিল। তখনও তাদের মধ্যে এক ধরনের অঘোষিত ঐক্য তৈরি হয়েছে বলে আলোচনা আছে। কিন্তু সরকার গঠনের শুরুতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেওয়া না নিয়ে কিছুটা দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে পরে দুই পক্ষ। জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলের সদস্যরা দুইটি শপথ নিলেও বিএনপিসহ মিত্ররা একটি শপথ নিয়েছেন। তাদের দাবি, সংবিধান অনুযায়ী তারা শুধু সংসদ সদস্যের শপথ নিতে বাধ্য।
অপরদিকে সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়া নিয়ে প্রথম দিন থেকেই মারমুখী অবস্থানে ছিলেন জামায়াত জোটের এমপিরা। নজিরবিহীন প্রতিবাদের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন তারা। অনেকে তার দিকে তেড়ে যান। আবার গণভোট বাস্তবায়ন নিয়েও কোনও সুরাহা হয়নি। শেষ পর্যন্ত রাজপথেই এর ফায়সালা খুঁজছে বিরোধী দল।
এত দ্বিমতের পরও সেই রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর প্রথমে ৪৭ ঘণ্টা আলোচনায় সম্মত হন সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা। পরে বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের প্রস্তাবে ৫০ ঘণ্টা আলোচনায় সম্মত হয় দুই পক্ষ। আবার আওয়ামী লীগ ও ‘ফ্যাসিবাদ’ প্রশ্নে তাদের সুর একই রকম। জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকার-বিরোধী দলের বিশেষ কমিটি গঠন এবং জামায়াতের ফাঁসি কার্যকর হওয়া নেতাদের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে শোক প্রস্তাব আনাসহ বেশ কিছু বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছে। দুই দলের এমন ঐক্য-অনৈক্য ভিন্ন বার্তা দেয় বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
সরকার প্রধান ও বিরোধী দলীয় নেতার নমনীয় মনোভাব
সংসদের ভেতরে ও বাইরে দুই পক্ষের ভিন্ন রকম অবস্থান দেখা গেলেও সরকার প্রধান ও বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যের এক ধরনের সহনশীলতার প্রতিচ্ছবি দেখা গেছে বলে মনে করেন কেউ কেউ।
গত ৩০ এপ্রিল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সমাপনী অধিবেশনে সাম্প্রতিক শিক্ষাঙ্গনের পরিস্থতি নিয়ে প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা বক্তব্য রাখেন। এ সময় তিনি বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। জবাবে তারেক রহমান বলেন, ‘‘স্বাভাবিকভাবে আমি চাই, আমার দেশের সন্তানেরা একটি সুন্দর পরিবেশে লেখাপড়া করুক।’’
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার কারণে বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি সমস্যা তৈরি হয়েছে— যার তাপ বাংলাদেশে এসেও লেগেছে। সেদিন বিরোধী দলের পক্ষ থেকে একসঙ্গে বসে সুরাহা বের করার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল— এ ব্যাপারে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার, যাতে দেশের মানুষ স্বস্তিতে থাকতে পারেন।
এ বিষয়ে যৌথভাবে কমিটির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমার মনে হয়, আমরা আজও এই সমস্যার (শিক্ষাঙ্গনের) সমাধানও উভয় পক্ষ একসঙ্গে বসে নিশ্চয় বের করতে সক্ষম হবো।’’
একই অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘‘এই সংসদের দিকে সারা বিশ্বে থাকা বাংলাদেশিরা তাকিয়ে রয়েছেন। বিপুল প্রত্যাশা এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে এসেছি সবাই।’’
জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের ঐক্য কাজ করে বলে দাবি করেন জামায়াত আমির। অপরদিকে নিজ নির্বাচনি এলাকা-১৫ আসনের খাল দখল, ভাঙাচোরা সড়ক, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বেহাল অবস্থা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সমাধান চান বিরোধী দলীয় নেতা। তখন প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যের সময় খুঁনসুটির ছলে বলেন, বিরোধী দলীয় নেতা ও উপনেতার এলাকায় যেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়ন কাজ হয়, সেই জন্য মন্ত্রীদের নির্দেশ দেন।
বিরোধী দলের সঙ্গে সম্প্রীতি চায় সরকার, আসলে কী?
প্রধান বিরোধী দল ও জোটের বেশ কয়েকটি প্রস্তাবনা নিয়ে সরকারের ইতিবাচক মনোভাবকে ভিন্নভাবে দেখছেন বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদরা। তারা মনে করেন, দুই পক্ষই এক ধরনের সমঝোতা চায়। কারণ তারা দীর্ঘ দিনের মিত্র। আবার কেউ কেউ মনে করেন, দেশের স্থিতিশীলতার জন্য সবাইকেই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দেখাতে হবে। তবে সরকার নিজেদের স্বার্থ ঠিকই সংরক্ষণ করে। একেবারেই বিপদে পরে গেলে বিরোধী দলের দ্বারস্থ হয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী রতন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সরকার ও সংসদের তথাকথিত বিরোধী দল— তারা দীর্ঘ দিনের মিত্র। তাই তাদের মধ্যে এক ধরনের ভাগাভাগির চুক্তি থাকতে পারে। এখন যে ধরনের ঐক্যের মনোভাব দেখা যাচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের কোনও কাজে আসবে না।’’ তিনি মনে করেন, উভয়পক্ষের সম্মতিতে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে। তাই তারা কেউই এই বিষয়টি নিয়ে উচ্চবাচ্য করছে না।
জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব সাইফ মোস্তাফিজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সরকার একেবারে সারতে না পারলে বিরোধী দলের প্রস্তাব মানছে না। সংসদের সমাপনী অধিবেশনেও বিরোধী দলকে অগ্রাহ্য করেই দুইটা বিল পাস করিয়ে নিয়েছে। জ্বালানি নিয়ে বিপদে পরেই বিরোধী দলকে নিয়ে কমিটি গঠন করেছে। অথচ জ্বালানি কারসাজিতেও সরকারি দল জড়িত ছিল।’’
ঢাকা-৫ আসন থেকে নির্বাচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এমপি কামাল হোসেন বলেন, ‘‘আমরা বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করছি না। সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণেরও প্রতিবাদ করছি। এক্ষেত্রে সরকার দুই-একটি বিষয়ে আমাদের কথা শুনলেই— তারা আমাদেরকে সবক্ষেত্রে ছাড় দিচ্ছে এটা বলার সুযোগ নেই।’’
অবশ্য পহেলা মে নয়াপল্টনে শ্রমিক দলের সমাবেশর বিএনপির মহাসচিব বলেছেন, ‘‘সরকার ঐক্যবদ্ধভাবেই সবাইকে নিয়ে দেশ গড়তে চায়।’’