দীর্ঘ দেড় যুগ রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম, জেলজুলুমসহ দুঃসহ নির্যাতন ভোগের পর দুই মাসাধিক আগে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নেতারা এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন। ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন সরকারি কাজকর্মে। দম ফেলার ফুরসত নেই। সরকারি কর্মকাণ্ডে ব্যাপক চাঙাভাব তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কর্মকাণ্ডে মন্ত্রী-এমপিরা তো বটেই, আমলাদেরও ছোটাছুটি বেড়েছে। সবাই অতিমাত্রায় ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন।
বিপরীতে যে দলের ব্যানারে তাঁরা সরকার গঠন করে রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব পেয়েছেন, মাত্র ৯ সপ্তাহের ব্যবধানে সেই দলের কর্মকাণ্ডে দেখা দিয়েছে লক্ষণীয় স্থবিরতা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান অবস্থায় ‘সরকার চাঙা’ হলেও বিএনপি পুরোমাত্রায় স্থবির। দলীয় কর্মকাণ্ডে চরম মাত্রায় ভাটা পড়েছে। এমনকি কার্যালয়গুলো এখন প্রায় ফাঁকা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রীয় নানান ব্যস্ততা বেড়েছে। তবে সংসদীয় কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গ রূপ পাওয়ার পর আমাদের অগ্রাধিকার হবে সাংগঠনিক পুনর্গঠন। শিগগিরই সেদিকে নজর দেওয়া হবে।’
সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকার বাইরে তো বটেই, এমনকি রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি যেখানে জাতীয় নির্বাচনের আগপর্যন্ত জনারণ্যে পরিণত ছিল, তা এখন প্রায় জনশূন্য। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও দলের মুখপাত্র অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী ছাড়া আর বড় কোনো নেতার পদধূলি সচরাচর নয়াপল্টনে পড়ে না। মাঝখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে দুই দিন সেখানে গিয়েছিলেন তখন কিছুটা সরগরম পরিবেশ লক্ষ করা গেলেও এখন আর তেমন অবস্থা নেই।
এ বিষয়কে দলের প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতারা নেতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। কারণ ক্ষমতাসীন দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যখনই স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, সেই সরকার তখনই বিপদে পড়েছে। তখন প্রতিপক্ষের মাঠের বা রাজপথের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের বিপরীতে মোকাবিলা করার মতো কোনো উপায় যেমন থাকে না, ঠিক তেমনি সাংগঠনিকভাবেও দল দুর্বল বা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। নিকট অতীতেও এমন দুরবস্থা সরকারি দলে দেখা গেছে।
জানা গেছে, একদিকে সরকার পরিচালনায় ব্যস্ততা, অন্যদিকে মাঠের কর্মকাণ্ডে ভাটা; এর ফলে ক্ষমতাসীন বিএনপির রাজনীতিতে বর্তমানে একধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তৃণমূলে এটি আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। এই ঝিমিয়ে পড়া দলীয় রাজনীতিকে চাঙা করার কথা হাইকমান্ড মাঝেমধ্যে ভাবলেও রাষ্ট্র পরিচালনার কর্মব্যস্ততার কারণে পরক্ষণেই আবার তাতেও ভাটা পড়ছে। সরকার গঠনের পর যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই স্বাভাবিক চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে আগের মতো করে সংগঠনের গতি ধরে রাখা। কারণ এ সময়ে দায়িত্বের ভার যেমন বাড়ে, তেমনি দলীয় কার্যক্রমও অনেক সময় প্রশাসনিক ব্যস্ততার আড়ালে চাপা পড়ে যায়। সদ্য ক্ষমতায় আসা বিএনপিও এর ব্যতিক্রম নয়।
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে বিএনপি। এর মধ্য দিয়ে প্রায় ২০ বছর পর সরকার গঠনের সুযোগ পায় দলটি। বিপুল জনরায় নিয়ে ক্ষমতায় এলেও মাঠের কার্যক্রম না থাকায় দুই মাসের মধ্যেই ঝিমিয়ে পড়েছে দলটি। বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শীর্ষ নেতাদের বেশির ভাগই সরকারের অংশ হয়ে উঠেছেন। ফলে দলীয় কর্মকাণ্ডকে বেগবান করতে তাঁরা মনোনিবেশ করতে পারছেন না। অন্যদিকে দলীয় নেতা-কর্মীদের একটি অংশ এখন বেশি মনোযোগী এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করা নিয়ে। কেউ কেউ আবার ব্যক্তিগত প্রত্যাশা পূরণের অপেক্ষায় লবিং-তদবিরে ব্যস্ত। ফলে আগের মতো দল ও সংগঠনকেন্দ্রিক সময় দেওয়া হচ্ছে না তাঁদের পক্ষে।
রাজনৈতিক কর্মসূচি, দলের আদর্শিক চর্চা এবং সংগঠন শক্তিশালী করার কাজ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে তৃণমূল পর্যায়ে, যেখানে কর্মীদের মধ্যে আগের মতো উদ্দীপনা ও সক্রিয় কর্মকাণ্ড চোখে পড়ছে না। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, অনেকেই দলের হাইকমান্ডের দিকনির্দেশনার অভাবে কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। দলের নিবেদিতপ্রাণ নেতারা রাজনীতির মাঠ থেকে দেশ পরিচালনার কাজে সময় দিতে গিয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে অনেকটা দূরে সরে গেছেন। যার প্রভাব পড়েছে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে। আগের মতো জমছে না নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। মিছিল-মিটিংয়ে রাজপথ কাঁপাতেও দেখা যায় না নেতাদের। পাশাপাশি বিগত সময়ের মামলা জটিলতা নিয়ে এখনো উদ্বেগে অনেকে। এ ছাড়া মূল দল ও অঙ্গসংগঠনের অনেক ইউনিটে কমিটি না থাকায় নেতৃত্বশূন্যতা দেখা দিয়েছে। সে কারণে দিকনির্দেশনার অভাবেও ঝিমিয়ে পড়েছে বিএনপির রাজনীতি। তার মধ্যেও একটু আশার আলো হচ্ছে সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলকে সক্রিয় করার চেষ্টা করছে বিএনপি। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছেন। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক যোগাযোগ বাড়ানো, কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়, মাঠপর্যায়ে সক্রিয়তা বাড়াতে কাজ করছেন নেতারা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় কার্যালয়ে এলে নেতা-কর্মীরা সত্যিই উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন। তিনি চলে যাওয়ার পর আবারও নিস্তেজ হয়ে পড়েন। বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল সম্প্রতি এক দিনের ব্যবধানে দলের কেন্দ্রীয় ও গুলশান কার্যালয়ে তারেক রহমানের আগমনকে ঝিমিয়ে পড়া দলকে উজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে মনে করছেন। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দলটি শুধু নির্বাচন বা সরকার গঠন করার জন্য একটু পিছিয়ে পড়েছে তা নয়, বরং দলের নেতৃত্বেও তো বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। আমরা বেগম খালেদা জিয়াকে হারালেও সেখানে আমাদের বর্তমান চেয়ারম্যানকে পেয়েছি। সরকার গঠনের পর খুব দ্রুতই তিনি দলের ঝিমিয়ে পড়ার বিষয়টিকে অনুধাবন করেছেন। এ কারণেই দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে সরাসরি নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, নানা বিষয়ে পরামর্শ করেছেন। মূল দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোর সাংগঠনিক পুনর্গঠন কীভাবে শুরু করা যায়, সে ব্যাপারেও তিনি পর্যায়ক্রমিক আরও আলোচনা করবেন। খুব দ্রুত এ ব্যাপারে সারা দেশে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও সাংগঠনিক স্তরগুলোতে পুনর্বিন্যাসের কার্যক্রম শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সরকারের বাইরে, বিশেষত বিরোধী দল যখন রাস্তার আন্দোলনে সক্রিয় হয়, তখন সরকার থেকেও বেশি সরকারি দলের কার্যক্রম একটু চাঙা হয়। স্বাভাবিক কারণেই দেশে এখন রাজপথে বিরোধী দলের আন্দোলন তেমন নেই। সরকারি ও বিরোধী দল এখন সংসদকেন্দ্রিক ভূমিকা পালন করছে। অর্থাৎ গত দেড় মাসে নানা চড়াই-উতরাই, নানা পরিস্থিতি আমরা দেখেছি। তবে দলগতভাবে একটি প্রক্রিয়া চলছে, যাতে আগামী দিনে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলোকে সুসংগঠিত করা যায়। এর জন্য দলের ভিতরে আলোচনা হচ্ছে। শিগগিরই হয়তো সাংগঠনিকভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
জানা যায়, চলতি বছরেই নতুন করে দলের জাতীয় কাউন্সিল করার চিন্তাও আছে বিএনপির হাইকমান্ডের। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি এমনটা জানিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা দলগুলোর এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া নতুন কিছু নয়। স্বাভাবিকভাবেই সরকার পরিচালনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় সংগঠনে প্রভাব পড়ে। তাই দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র-সর্বত্র ত্যাগী নেতাদের দিয়ে সংগঠন পুনর্গঠন করাও জরুরি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. শামসুল আলমের মতে, দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যাঁরা মন্ত্রিসভায় আছেন, তাঁরা আবার দলের সঙ্গেও আছেন। তাঁরা এতদিন অত্যাচার-নির্যাতনের মুখে দলের সঙ্গে ছিলেন। যে কারণে সংগঠনের ওপর চাপ পড়া স্বাভাবিক। এর মধ্যেও সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। কিন্তু গতি কম। তবে আরও চাঙা করতে হবে। এ কাজে পরীক্ষিত, ত্যাগী লোকদের দায়িত্ব দিতে পারলে ভালো ফল বয়ে আনবে।
ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের একজন সহসভাপতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দল সরকারে আসার পর থেকে সেভাবে সাংগঠনিক ব্যস্ততা নেই। দলেও কেমন যেন গুরুত্ব কমে গেছে। এমনটা চলতে থাকলে তো সবাই পুরোপুরি ঝিমিয়ে পড়বে। নীতিনির্ধারকদের এদিকে নজর দেওয়া উচিত। বিএনপির পাশাপাশি ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের মতো ভ্যানগার্ড সংগঠনগুলোকে নতুন করে সাজানো জরুরি হয়ে পড়েছে।