Image description

রাজশাহীর বাগমারার হামিরকুৎসা ইউনিয়নের মাঝগ্রামের কৃষক আব্দুল কাফি পাঁচ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। বৃষ্টি না থাকায় পাটক্ষেতে দিতে হবে সেচ। কিন্তু ডিজেল না পাওয়ায় সেচের ব্যবস্থা করতে পারেননি। সেচের পর জমিতে সার দিতে হবে।

সেই সারেরও সংকট রয়েছে। আব্দুল কাফি গতকাল বললেন, ডিলার বলছে সার নেই। আর বাজারে পাচ্ছি না। তবে বাইরের দোকানে বস্তাপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা বেশি দিলে সার মিলছে।

এভাবে দেশের বিভিন্ন জেলায় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি দামে সার কিনতে কৃষককে বাধ্য করা হচ্ছে। অন্যদিকে সেচযন্ত্র চালানোর ডিজেলও কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। গত বুধবার দুপুরে এক কৃষকের হয়ে ডিজেল আনতে পাম্পে গিয়ে হিট স্ট্রোকে মারা যান রাজশাহীর মোহনপুরের বাকশৈলের বৃদ্ধ আলম দেওয়ান। মোহনপুর উপজেলার কৃষক লোকমান আলী বলেন, টিএসপি সার মিলছে না সহজে।

টাকা বেশি দিলে পাওয়া যাচ্ছে। আবার পানের বরজে সেচ দেব, ডিজেল সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষি অফিস থেকে ডিজেলের প্রত্যয়ন নিয়ে পাম্পে গেলেও কখনো কখনো ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার শ্রীপতিপাড়ার কৃষক আব্দুল মান্নান বলেন, ‘শ্যালো মেশিনে সেচ দিয়ে সাড়ে পাঁচ বিঘা জমিতে সুবর্ণ লতা, এক বিঘায় জিরা ও ১০ কাঠা জমিতে ধান চাষ করছি। কিন্তু  প্রয়োজনমতো সার এবং সময়মতো ডিজেল না পেয়ে ধানের উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
 
’ একই গ্রামের কৃষক আব্দুস সাত্তার তিন বিঘা জমিতে সুবর্ণ লতা ধানের চাষ করেছেন। তিনিও চাহিদা অনুযায়ী জমিতে সার দিতে পারেননি।

কৃষকরা জানান, ধানের জমিতে এখন তেমন সার ও পানি লাগবে না। এরই মধ্যে ধান কাটা শুরু করেছেন অনেক কৃষক। তবে কিছু জমিতে অল্প সার ও পানি দিতে হবে। রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলার কৃষকরা জমিতে পাট, ভুট্টা, পটোল, মরিচ, ঢেঁড়সসহ বিভিন্ন ফসল ও সবজি আবাদে ব্যস্ত রয়েছেন। ধান কেটে আবারও রোপা আমন চাষে হাত দেবেন। তবে এখনই তাঁরা সার ও ডিজেল সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন রয়েছেন। 

বাগমারা প্রতিনিধি রাশেদুল হক ফিরোজকে ওই উপজেলার সার ডিলার আকতারুল ইসলাম জানান, তাঁরা যে পরিমাণ বরাদ্দ পাচ্ছেন তা কৃষকের চাহিদার তুলনায় কম। তাই চাহিদা থাকলেও সার দিতে পারছেন না। তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘চলতি মাসে বরাদ্দ এসেছিল কম। আগামীতে বেশি বরাদ্দ এলে কৃষকরা চাহিদামতো পাবেন বলে আশা করছি।’ তানোর প্রতিনিধি টিপু সুলতান জানান, তানোরের ব্যবসায়ীচক্র এমওপি, টিএসপি ও ডিএপি সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সরকার নির্ধারিত দাম থেকে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করছে। এ ক্ষেত্রে দেওয়া হচ্ছে না  রসিদ। কেউ এসবের প্রতিবাদ করলে তাকে চাহিদামতো দেওয়া হচ্ছে না সার।

তানোর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর জানায়, খোলাবাজারে এমওপি এক হাজার টাকা, ডিএপি এক হাজার ৫০, টিএসপি এক হাজার ৩৫০ টাকা সরকার নির্ধারিত দাম বেঁধে দেওয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডিলাররা সংকট দেখিয়ে দ্বিগুণ দামে এসব সার বিক্রি করছেন। সার বিপণন নীতিমালা অনুযায়ী এক এলাকার সার অন্য এলাকায় বিক্রির কোনো সুযোগ নেই।

পুরো উপজেলায় ৯ জন বিসিআইসি (বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন) ডিলার নিযুক্ত রয়েছেন। এসব ডিলার ফায়েজ ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে সার পেয়ে থাকেন। কিন্তু ফায়েজ ট্রেডিং সিরিয়ালের অজুহাতে এ মাসের শুরু থেকে সার সরবরাহ বিলম্বিত করছে। সেখান থেকে এ মাসে সার পাননি তানোরের ডিলাররা। এ সুযোগে বিএডিসি ডিলাররা বেশি দামে সার বিক্রি করছেন বলে কৃষকরা জানিয়েছেন। আমশো গ্রামের কৃষক ফারুক (দিপু) বলেন,  আমাদের তানোর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বে (ডিলার) নাসির উদ্দীনের কাছে ডিএপি পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন সার পাননি। কিন্তু বাইরে থেকে ডিএপি সার  অতিরিক্ত এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। তানোরের গোল্লাপাড়ার কৃষক আজগর আলী বলেন, বাইরে থেকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে।

সার সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে গত ১৮ এপ্রিল তানোর উপজেলা হলরুমে রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান তানোর উপজেলার বিসিআইসি ও বিএডিসি ডিলারদের সঙ্গে মতবিনিময়ে সার নিয়ে সংকট সৃষ্টি না করার বিষয়ে কৃষি কর্মকর্তাসহ ডিলারদের খেয়াল রাখার কথা বলেন। তার পরও কোনো ফল হয়নি। তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহমেদ বলেন, সরকারিভাবে এবার টিএসপি ও এমওপি সারের বরাদ্দ কমিয়ে ডিএপি সারের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তাতে সারের সংকট হওয়ার কথা নয়। তবে কৃষকরা না বুঝে টিএসপি সারের প্রতি ঝুঁকছেন। আমরা কৃষকদের টিএসপির বদলে ডিএপি ব্যবহারে উৎসাহিত করছি। নিয়মিত বাজার তদারকি করা হচ্ছে। কোনো ডিলার বেশি দামে সার বিক্রি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দুর্গাপুর উপজেলার বাজে কলশিপুর গ্রামের কৃষক মো. জাহাঙ্গীর বলেন, বারবার চেষ্টা করেও পর্যাপ্ত ডিজেল সংগ্রহ করতে পারছি না। সেচের জন্য প্রায় ২০ লিটার ডিজেল লাগে, কিন্তু আমরা অর্ধেকও জোগাড় করতে পারছি না। মাঝেমধ্যে কয়েক দিন চেষ্টার পরও খালি হাতে ফিরতে হয়। ১০ লিটার ডিজেল সংগ্রহে পরিবহন খরচ হিসেবে অতিরিক্ত ৩০০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে।

বাঘমারা উপজেলার বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) একজন ডিলার হাফিজুর রহমান বলেন, ইউরিয়া সারের বরাদ্দ খুবই কম। এপ্রিল মাসে আমি মাত্র ৩৫ বস্তা টিএসপি এবং ১৫ বস্তা ডিএপি সার পেয়েছি। সাধারণ কৃষকদের হাতে সার পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী বরাদ্দকৃত সারের বড় অংশ নিয়ে নেয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক সাবিনা বেগম বলেন, বোরো চাষের সময় কৃষকদের অতিরিক্ত সার ব্যবহারের প্রবণতার কারণেই মূলত এ সংকট তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, অনেক কৃষক নির্ধারিতের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি সার প্রয়োগ করছেন। যেখানে নির্দেশিকায় ৩০ থেকে ৩৫ কেজি সার ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে, সেখানে কেউ কেউ ১০০ কেজি পর্যন্ত ব্যবহার করছেন। নওগাঁ প্রতিনিধি ফরিদুল করিম জানান, নওগাঁ জেলায় ইরি-বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। অন্যান্য ফসল চাষের জন্য জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য ডিজেল সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। ধান কাটা শেষ হলে মাঠে যখন নতুন ধান চাষ শুরু হবে, তখন সারের চাহিদা বাড়বে। নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হুমায়রা মণ্ডল কালের কণ্ঠকে বলেন, আমাদের কাছে সার মজুদ রয়েছে। নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার শালবাড়ী গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান ও হাজীনগর ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল মালেক তোতা জানান, এবার বোরো ধান চাষ করতে গিয়ে সারসংকটে বিপাকে পড়েছিলেন। বেশি দামে কখনো কখনো সার কিনতে হয়েছে তাঁকে। কখনো টাকা দিয়েও মেলেনি সার। ফলে কিছু জমিতে ধান ভালো হয়নি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জাকির হোসেন পিংকু জানান, ফসল চাষ করতে গিয়ে ডিজেল সংকটে পড়ছেন কৃষকরা।

দক্ষিণ-পশ্চিমে পাটের আবাদে সারসংকটের শঙ্কা : দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের  ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও মাগুরায় পাট আবাদে সার সংকটের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাট চাষের মৌসুম শুরু হলেও এসব জেলার অধিকাংশ কৃষক এখন পর্যন্ত তাঁদের প্রয়োজনীয় সার পাননি। এতে করে চলতি মৌসুমে পাট উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কৃষি বিভাগ বলছে, পাট চাষের জন্য নির্ধারিত সময়ে ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সার প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে কিছু এলাকায় ইউরিয়া সার পাওয়া গেলেও টিএসপি ও এমওপি সার একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পাটের জমিতে সঠিক সময়ে সার প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। গতকাল  ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও মাগুরা জেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সার কিনতে গিয়ে তাঁদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে অনেক সময় ডিলারের কাছ থেকে সার না পেয়ে খালি হাতে বাড়িতে ফিরে যেতে হচ্ছে। আবার অধিকাংশ সারের ডিলার তাঁদের দোকান বন্ধ করে রেখে দিয়েছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে ঝিনাইদহ জেলায় ২০ হাজার ২২৭ হেক্টর, মাগুরা জেলায় ৩৪ হাজার ৩৯০ হেক্টর, কুষ্টিয়া জেলায় ৪১ হাজার ৫৬৩ হেক্টর ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় আট হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হচ্ছে।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার চাপড়ির কৃষক নজিবুর রহমান বলেন, ডিলারের কাছে গেলে অল্প কিছু ইউরিয়া সার দিচ্ছে। শুধু ইউরিয়া সার দিয়ে তো পাট চাষ করা সম্ভব না। টিএসপি ও এমওপি সার একদমই দিচ্ছে না। তাহলে এবার কিভাবে পাটের চাষ করব।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরাঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক আলমগীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, পাট আবাদের জন্য পর্যাপ্ত ইউরিয়া সারের বরাদ্দ রয়েছে। তবে দেশের চলমান পরিস্থিতিতে আমাদের বেশ কিছু সার কারখানা বন্ধ রয়েছে। ফলে টিএসপি ও এমওপি সারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা আমাদের মজুদ নেই। বিকল্প পন্থায় ওই দুই জাতের সার দেশে এনে পাটচাষিদের জন্য দেয়া হবে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ডিজেল পাচ্ছেন না কৃষকরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও ফসলি ক্ষেতের জন্য ডিজেল পাচ্ছেন না তাঁরা। মাগুরার রামনগরের কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, পাম্পে গাড়ি আসছে নিয়মিত, তবে গাড়িতে কোনো তেল থাকছে না। মধ্যস্বত্বভোগীরা আগেই পাম্প মালিকদের কাছ থেকে জ্বালানি নিয়ে মজুদ করছে। পরে ওই জ্বালানি কালোবাজারে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করছে। আমরা গরিব মানুষ। বেশি দাম দিয়ে তেল কেনার মতো সামর্থ্য নেই।