ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত আসনের বিপরীতে বিএনপি পাচ্ছে ৩৬টি সংরক্ষিত নারী আসন। এই স্বল্প সংখ্যক আসনে মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ করছেন সহ¯্রাধিক প্রার্থী। ইতোমধ্যে মনোনয়ন ফরম উত্তোলন করেছেন তিন হাজারের বেশি এবং গতকাল সোমবার রাত পর্যন্ত জমা দিয়েছেন ৭৫০ জন। যেখানে রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নারী নেত্রী, মহিলা দলের নেত্রী, ছাত্রদলের বর্তমান ও সাবেক নেত্রী এবং বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার বিএনপি ও মহিলা দল নেত্রীরা। এর পাশাপাশি মন্ত্রী-এমপি ও বিএনপি নেতাদের স্ত্রী, কন্যা ও বোনসহ পরিবারের সদস্যরাও মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। মনোনয়ন প্রত্যাশীরা চূড়ান্ত মনোনয়ন পেতে অতীতের আন্দোলনে ভূমিকা, দলীয় আনুগত্য ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জীবনবৃত্তান্ত তৈরি করে নীতিনির্ধারণী নেতাদের কাছে পাঠাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ দলের সিনিয়র নেতা ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সাক্ষাৎ করে মনোনয়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের প্রত্যাশা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেমন এক পরিবার এক এমপি নীতি গ্রহণ করেছিল বিএনপি। সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নের ক্ষেত্রেও যেন সেই একই নীতি অনুসরণ করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক মনোনয়নপ্রার্থী বলেন, বিগত ১৭ বছর ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অসংখ্য নেতাকর্মী জেল-জুলুম, হামলা-মামলা, গুম-খুনে অনেকেই নির্যাতিত হয়েছেন, অনেকে ঘর-বাড়ি ছাড়া হয়েছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। তাই যত বেশি সংখ্যক নেতাকর্মীকে মূল্যায়ন করা যায়, দলের জন্য ততই ভালো। তাই এক পরিবার এক এমপি যে নীতি জাতীয় নির্বাচনে অনুসরণ করা হয়েছে সেটি যেন এখানেও মেনে চলা হয়Ñ সেই দাবি জানান তারা।
তারা আরো বলেন, যেহেতু অনেকে এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন, তাই তাদের পরিবার থেকেই আবার এমপি করা হলে সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়বে। অন্যদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়বে। আবার দলে ত্যাগী নেতাকর্মীদের তো সংকটও নেই। সেই দিকটিও দলের নীতিনির্ধারকরা ভেবে দেখবেন বলেও প্রত্যাশা তাদের। সাবেক ছাত্রদল নেত্রী ও মরহুম স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি শফিউল বারী বাবুর সহধর্মিণী বীথিকা বিনতে হোসাইন বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশীদার হতে চান তিনি। বীথিকা বলেন, আমি বিশ্বাস করি এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপি আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগীদের যথাযথ মূল্যায়ন করবে। পাশাপাশি মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেবে।
তিনি আরো বলেন, অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামে নিজের ভূমিকা, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে দল সুযোগ দিলে আমিও সেই প্রক্রিয়ার একজন সহযোগী হতে চাই।
অর্পণ সংঘের মাধ্যমে গুম ও খুনের শিকার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন জানিয়ে সাবেক এই ছাত্রদল নেত্রী বলেন, জাতীয় সংসদে যাওয়ার সুযোগ পেলে আমি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নির্যাতিত পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করব এবং তাদের কথা সংসদে তুলে ধরব।
ইডেন কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি রেহানা আক্তার শিরিন বলেন, আমরা চাই দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে যারা জীবনবাজি রেখে রাজপথে লড়াই-সংগ্রাম করেছেন, শিক্ষিত, মার্জিত ও যোগ্যদেরই সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত করা হোক। কারণ কারা বিগত দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আন্দোলন করেছেন, তার নির্দেশনা মেনে দলের আদর্শের জায়গায় অটুট থেকে তা পালন করেছেন তা তিনি জানেন। যদিও ৫ আগস্টের পরবর্তী অনেক হাইব্রিড এবং সুবিধাভোগী দেখা যাচ্ছে, তবে আমাদের নেতা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আমাদের আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে তিনি দলের ত্যাগী, আদর্শের প্রশ্নে অটুট এবং প্রকৃত কর্মীদের মূল্যায়ন করবেন।
মনোনয়নপ্রত্যাশী ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য আরিফা সুলতানা রুমা বলেন, এমন সময় গেছে সাতজনের বেশি রাস্তায় আন্দোলনে ছিল না, এখন শুনছি সহ¯্রাধিক আবেদন জমা পড়েছে। আমরা জেল খেটেছি, জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছি, রিমান্ড খেটেছি, আন্দোলনের প্রতিটা কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছি। এখন দলের কাছে প্রত্যাশা, আমরা যারা মাঠে ছিলাম, তাদের যেন মূল্যায়ন করা হয়।
জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ বলেন, জাতীয় সংসদ হচ্ছে আইন প্রণয়নের জায়গা। তাই সেখানে লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে গড়ে ওঠা ত্যাগী এবং যোগ্য দু’টিরই সমন্বয় হতে হবে। যারা রাজপথে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং যোগ্য দলের হাইকমান্ড নিশ্চয়ই তাদের মূল্যায়ন করবে। তিনি আরো বলেন, ত্যাগী ও যোগ্যদের যদি মূল্যায়ন করা হয় তাহলে নেতাকর্মীরা উৎসাহী হবে।
গত বুধবার সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ২১ এপ্রিল। মনোনয়নপত্র বাছাই অনুষ্ঠিত হবে ২২ ও ২৩ এপ্রিল। বাছাই নিয়ে আপিল করা যাবে ২৬ এপ্রিল এবং তা নিষ্পত্তি হবে ২৭ ও ২৮ এপ্রিল। চূড়ান্ত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে ৩০ এপ্রিল এবং ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ মে।
ইসি জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আসন বণ্টনে বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াতে ইসলামী জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্ররা মিলে পাবে একটি আসন।
বিএনপি সূত্রেও জানা গেছে, এখন পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনের সময় যে নীতি মেনে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল যে, এক পরিবারের একজন সদস্যই মনোনয়ন পাবেন। সংরক্ষিত নারী আসনেও মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে সেই একই নিয়ম মেনে চলা হবে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী এক নেতা জানান, আমরা এখন পর্যন্ত আগের অবস্থানের কথাই জানি। জাতীয় নির্বাচনের সময় যেভাবে বলা হয়েছিল যে, এক পরিবার থেকে একজনই মনোনয়ন পাবেন, সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের ক্ষেত্রেও সেটি বহাল রয়েছে। তারপরও মনোনয়নপত্র জমা নেওয়া শেষ হলে পরবর্তীতে প্রার্থীদের আকাক্সক্ষা ও যোগ্যতা বিবেচনায় নিয়ে দলের সিনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত বোর্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, অতীতে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকাসহ শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কথা বলার দক্ষতা আছে; এমন নারী নেত্রীদের মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হবে। দলের যে পার্লামেন্টারি বোর্ড সেই বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবেন। সবকিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে।
পার্লামেন্টারি বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নেবেন সেই সিদ্ধান্তটা সবাইকে মান্য করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা (মনোনয়ন) আমি পেলাম না এবং ও পেল বলে এক ধরনের বিশ্রী পরিবেশ তৈরি করা এটা করা যাবে না। কারণ এই দলের জন্য অনেকে অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছেন, অনেক বেদনা পোহাতে হয়েছে।
এক পরিবার এক এমপি এই নীতি সংরক্ষিত নারী আসনের ক্ষেত্রে মানা হবে কি না জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব বলেন, মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও জমা নেওয়ার কাজ শেষ হয়েছে। এটি কি প্রক্রিয়ায় বাছাই বা চূড়ান্ত হবে সেটি দলের পার্লামেন্টারি বোর্ড সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে এবং শিগগিরই তা জানিয়ে দেওয়া হবে।
দলীয় সূত্রে আরো জানা যায়, সংরক্ষিত নারী আসনে নবীন ও প্রবীণদের সমন্বয় রাখা হবে। অভিজ্ঞ নেত্রীদের পাশাপাশি তুলনামূলক তরুণ, শিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় নারীদের একটি বড় অংশ সুযোগ পেতে পারেন। ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা নেত্রীদের সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া সমাজের বিভিন্ন পেশায় ‘পরিচিত’ মুখ থেকেও কয়েকজনকে মনোনয়নের জন্য বাছাই করা হতে পারে।
যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে- আফরোজা আব্বাস, সুলতানা আহমেদ, শিরীন সুলতানা, রাশেদা বেগম, রেহেনা আক্তার, শাম্মী আক্তার, হেলেন জেরিন খান, নাজমুন নাহার বেবী, আরিফা সুলতানা রুমা, সেলিনা হাফিজ, নুরুন্নাহার রেজা, সানজিদা ইসলাম, কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা ও বেবী নাজনীন, নিপুণ রায় চৌধুরী, নীলুফার চৌধুরী, বিলকিস ইসলাম, সৈয়দা আসিফা আশরাফী, রোখসানা খানম, আয়েশা সিদ্দিকা, নেওয়াজ হালিমা, ফরিদা ইয়াসমীন, সানসিলা জেবরিন, সাবিরা সুলতানা, চৌধুরী নাদিরা আক্তার, রুমা আক্তার, হাসনা জসিমউদ্দীন মওদুদ, সালিমা বেগম, শাকিলা ফারজানা, মাহমুদা হাবিবা, আসমা আজিজ, নেওয়াজ হালিমা আরলী, ফাহিমা নাসরিন, নাসিমা আক্তার কল্পনা, বীথিকা বিনতে হোসাইন, রেহানা আক্তার শিরিন, সানজিদা ইয়াসমিন তুলি, সিমকী ইমাম খান প্রমুখ।
প্রাণ ফিরেছে নয়াপল্টনে : জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় থেকেই বিএনপির নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালিত হতো গুলশানকেন্দ্রিক। ফলে নেতাকর্মীরাও নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছেড়ে ভিড় জমান সেই এলাকাতেই। আর নয়াপল্টনের প্রাণভোমরা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও নির্বাচনের কয়েক দিন আগে অসুস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন অসুস্থতার কারণে তিনিও নয়াপল্টনের কার্যালয়ে আসতে পারেননি। ফলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি হয়ে পড়ে একপ্রকার জনমানবশূন্য। যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কিছু সংখ্যক নেতাকর্মী ছাড়া বিএনপি নেতাকর্মীদের দেখা পাওয়া যেত না কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। তবে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন ফরম বিতরণকে কেন্দ্র করে গত শুক্রবার থেকে নয়াপল্টন কার্যালয়ে ধারাবাহিকভাবে বসছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। আর তাতেই যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে নয়াপল্টন। সকাল থেকে রাত অবধি কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু করে নয়াপল্টন এলাকা ফের জমে উঠেছে। নেতাকর্মীদের ভিড়ে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে ওই এলাকা।
যুবদল নেতা মেহবুব মাসুম শান্ত বলেন, নির্বাচনের পর থেকে নয়াপল্টন অফিসে অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ছাড়া অন্যদের তেমন দেখা পাওয়া যায়নি। তবে গত তিন দিন ধরে নেতাকর্মীদের সারাক্ষণই গম গম করছে কেন্দ্রীয় কার্যালয়। বিশেষ করে মনোনয়ন ফরম উত্তোলন ও জমা দিতে দলে দলে আসেন নেতাকর্মীরা। এছাড়া বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী কার্যালয়ে অবস্থান করায় দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও আগের মতো আসেন, আড্ডা দেন। যেন ফের প্রাণ ফিরেছে নয়াপল্টনে।