ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াতে ইসলামীর নারী প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। এ ক্ষেত্রে দলটি প্রার্থী বাছাইয়ে পরিবারতন্ত্র বা ব্যক্তিগত প্রভাবকে কোনো গুরুত্ব দেয়নি। তারা যোগ্যতা ও সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। এর ফলে বর্তমানে দলটির নির্বাচিত কোনো এমপির স্ত্রী-কন্যা বা পরিবারের কেউ সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন পায়নি। অথচ সরকারি দল বিএনপি ও তাদের শরিকদের এমপি মন্ত্রীদের স্ত্রী-কন্যা ও আত্মীয়স্বজনরা সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনয়ন পাওয়ার লবিং তদবিরে ব্যস্ত। শুধু তাই নয়, ইতোমধ্যে মন্ত্রী এমপিদের স্ত্রী-পুত্র-কন্যা বা আত্মীয়স্বজনকে ক্রিকেট বোর্ড, ব্যাংকসহ অন্যান্য সংস্থায় পুনর্বাসন করা হয়েছে এবং হচ্ছে। এ অবস্থায় জামায়াতে ইসলামীর পরিবারতন্ত্র থেকে মুক্ত হওয়ার এমন উদ্যোগ রাজনৈতিক অঙ্গনসহ দেশের সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী মনোনয়নকে কেন্দ্র করে জামায়াত সম্ভাব্য প্রার্থীদের যোগ্যতা, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা মূল্যায়ন করছে। চূড়ান্ত তালিকা দলীয় পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের পর চূড়ান্ত করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহে তা প্রকাশ করা হবে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ মে এই নির্বাচন হবে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট পাবে ১৩টি আসন। এর মধ্যে এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ জোটের অন্য শরিকরা কত আসন পাবে, সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ নিয়ে জোটের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। জামায়াত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন নিয়ে দলীয় প্রস্তুতি শুরু হয়। মার্চ মাসব্যাপী প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করে জামায়াত। দলের মহিলা বিভাগের কাছ থেকে একটি তালিকা নেয়া হয়। এছাড়া কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সব স্তরে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলে।
জামায়াতের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি অধ্যাপিকা নুরুন নেসা সিদ্দিকা বলেন, নারীরা দলের আমির হতে না পারলেও দলের এবং দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দিতে পারবে। সে বিবেচনায় মহিলা বিভাগ থেকে ১২ জনের একটি তালিকা জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সেটি অনুমোদন হয়েছে, এটুকু তারা জানতে পেরেছেন।
জামায়াতের ইসলামী সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা মো. আব্দুল হালিম বলেন, আমরা নারী নেতৃত্বকে সর্বাধিক গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করি। তাই সংরক্ষিত নারী আসনে শুধু নামসর্বস্ব বা পরিবার-নির্ভর মনোনয়ন দিতে চাই না। জামায়াত এমন নারী প্রার্থী নির্বাচন করতে চায় বা করেছে, যারা সংসদে গিয়ে নারী সমাজ ও জনগণের পক্ষে, দেশের পক্ষে কার্যকরভাবে কথা বলতে ও ভূমিকা রাখতে পারবেন।
দলীয় সূত্রমতে, মহিলা বিভাগের কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীলদের মধ্য থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তবে জামায়াতের যেসব কেন্দ্রীয় নেতা এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের পরিবারের কাউকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি। এর মানে হলো, এক পরিবার থেকে দুজন সংসদ সদস্য হতে পারবেন না এমন নীতিতে দলটি অটল ছিল। তবে জোটের শরিক দল এনসিপির সাথে আলোচনা করে সম্ভাব্য নারী প্রার্থীদের তালিকায় হয়তো কিছুটা সংযোজন-বিয়োজন হওয়ার সম্ভাবনা আছে, সে জন্য আগেভাগেই তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে না।
জামায়াতের সূত্রগুলো জানিয়েছে, সংরক্ষিত আসনের জন্য তৃণমূল পর্যন্ত মতামত নেয়া হয়েছে। মহিলা বিভাগ থেকে একটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন মানদ- বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল, শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকাকেন্দ্রিক প্রতিনিধিত্বের কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম, এমন যোগ্য প্রার্থীদের বিবেচনা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দল পরিচালনার যোগ্যতা, দলীয় পদকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এর সঙ্গে সততা, অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি দলের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন; যোগ্যতার সঙ্গে আইন প্রণয়ন ও জনগণের অধিকার বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন, এমন প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য নারী প্রার্থীদের তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তারা হলেন, কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি অধ্যাপিকা নুরুন নেসা সিদ্দিকা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সাবেক এমপি ডা. আমিনা বেগম রহমান, সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য শাহান আরা বেগম এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মহিলা বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি ব্যারিস্টার সাবিকুন্নাহার মুন্নী। এছাড়া সাঈদা রুম্মান, মার্জিয়া বেগম, খন্দকার আয়েশা খাতুন,, কাজী মারিয়া ইসলাম বেবি, ডা. শিরিন আক্তার রুনা, তানহা আজমি ও কানিজ ফাতেমা।
সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াত জোট পাচ্ছে ১৩টি আসন। নিয়ম অনুযায়ী, জামায়াত ১২টি ও এনসিপি ১টি আসন পেতে যাচ্ছে। তবে এনসিপি আরো একটি আসন দাবি করছে জামায়াতের কাছে। এনসিপি সূত্র বলছে, সংরক্ষিত নারী আসনের বিষয়ে সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতের সঙ্গে কিছুটা আলোচনা হয়েছিল। এনসিপি দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন ও যুগ্ম সদস্য সচিব মাহমুদা আলমকে সংসদে দেখতে চায়। এনসিপির বাইরে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে, জোটের এমন এক-দুটি দল সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী দিতে চায়। তবে জামায়াতের একটি সূত্র বলছে, এবার জামায়াত ও এনসিপির বাইরে অন্য কোনো দলকে সংরক্ষিত আসনের জন্য বিবেচনা করার সম্ভাবনা কম।
এ বিষয়ে ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জামায়াত জোটের ১৩টি আসনের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বণ্টন কী হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত আলোচনা করা হয়নি। অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। জোটের যারা সংসদে আছে, যে দলের যেটুকু প্রাপ্য, সেটা নিশ্চিত করা হবে। সেই দৃষ্টিকোন থেকে জামায়াতের ১২টি ও এনসিপির ১টি, এখন পর্যন্ত আলোচনা এই পর্যায়েই আছে। তবে এ বিষয়ে বিরোধী দলের নেতা ও জামায়াতের আমির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।