সরকার গঠনের পর এবার দল পুনর্গঠনে মনোযোগ দিয়েছে দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি। বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল হওয়ায় এর মধ্যে দলের অনেকে সরকারে চলে গেছেন। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপদেষ্টা হয়েছেন অনেকে। এ কারণে দলের কর্মকাণ্ডে কিছুটা ভাটা পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দলীয় কর্মকাণ্ড চাঙা করতে দল পুনর্গঠনের কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এজন্য দলীয় কাউন্সিল আয়োজনসহ অঙ্গসংগঠনগুলো পুনর্গঠন করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দলের দায়িত্বশীল নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তারা জানান, তিন বছর মেয়াদি কমিটি গঠনে সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। এ ছাড়া দলটির অঙ্গ ও সহযোগী ১১টি সংগঠনের মধ্যে ১০টি কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। দলীয় গঠনতন্ত্রে প্রতি তিন বছর পর নতুন কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দমননীতিসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন বিএনপি তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই দলের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা সংসদ সদস্য কিংবা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের বড় একটি অংশ সচিবালয় ও নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় বেশি সময় দিচ্ছেন। তাই সরকার গঠনের পর থেকেই দলীয় কার্যক্রম ধীরগতি দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন দলের নেতা-কর্মীরা। এতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতৃত্বের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই পদপ্রত্যাশী নেতা-কর্মীদের মধ্যেও বাড়ছে হতাশা। নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে দলীয় কাউন্সিল কবে অনুষ্ঠিত হবে? মেয়াদোত্তীর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতারা কাউন্সিল ছাড়া আর কতদিন এভাবে সংগঠন চালাবেন?
সংশ্লিষ্ট একাধিক নেতা জানান, সম্প্রতি তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করার পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার নির্দেশনা দেন। সূত্র মতে, সরকারের পাশাপাশি দলকে চাঙা রাখতে চান প্রধানমন্ত্রী। এজন্য সরকারের বাইরে দলকে শক্তিশালী করতে যাদের মন্ত্রী কিংবা এমপি করা যায়নি, তাদের দিয়ে দল পুনর্গঠন করতে চান তিনি। তারই অংশ হিসেবে গত শনিবার সন্ধ্যায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অফিস করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে অংশ নেওয়া এক বিএনপি নেতা বলেন, ‘সরকারের পাশাপাশি দলকে গতিশীল করতে মাঝেমধ্যে কার্যালয়ে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বিএনপির কাউন্সিল : বিএনপির গঠনতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও এক দশকেও তা হয়নি। তবে এ সময়ে নির্বাহী কমিটিতে একাধিকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। যুক্ত হয়েছে নতুন মুখ। কেউ পদোন্নতি পেয়েছেন, আবার কেউ দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন। দলীয় দায়িত্বশীল নেতারা জানান, চলতি বছরের শেষের দিকে দলের সপ্তম কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে। এজন্য দায়িত্বশীলদের ৮২টি সাংগঠনিক জেলা ও অধিভুক্ত উপজেলার মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এরআগে দলকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকগুলোতেও অধিকাংশ নেতা কাউন্সিল করার পক্ষে অভিমত দিয়েছেন। একই সঙ্গে কাউন্সিলের দিনক্ষণ ঘোষণার জন্য দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দায়িত্ব দিয়েছে স্থায়ী কমিটি। দায়িত্বশীলরা আভাস দিয়েছেন, এবার কাউন্সিলে থাকবে নতুন-নতুন চমক। পরিবর্তন হবে দলীয় গঠনতন্ত্রের কিছু ধারা-উপধারা। দীর্ঘ নয় বছর পর দলের কাউন্সিলে ১৬ বছর রাজপথে থাকা নেতাদের আমলনামা অনুসারে ভাগ্য নির্ধারণ হবে। যোগ্য, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করে নবরূপে সাজানো হবে বিএনপিকে। এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা সংগঠনের চলমান প্রক্রিয়া। তবে জাতীয় কাউন্সিল হলে সংগঠনটি নতুন নেতৃত্ব পায়। দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে থাকা ত্যাগী, সংগ্রামী, পরীক্ষিত নেতারাই সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদ পান। এতে ত্যাগীরা যেমন মূল্যায়িত হন, তেমনি সংগঠনও শক্তিশালী হয়। কাউন্সিলের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, স্বৈরাচারী সরকারের সীমাহীন নির্যাতনে বিএনপি তখন স্বাভাবিক দলীয় কর্মকাণ্ড চালাতে পারেনি। তাই উদ্যোগ নেওয়ার পরও দলের জাতীয় কাউন্সিল করা সম্ভব হয়নি। এখন রাজনীতির পরিবেশ এসেছে। তাই দলের জাতীয় কাউন্সিলও হবে। এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপির কাউন্সিল এই বছরের মধ্যেই। এখনো আমরা সময় নির্ধারণ করিনি। দলের কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপির কার্যক্রম ছোটখাটোভাবে চলছে। এক মাসে সরকার গঠন করতে সময় লেগেছে। দলের লোক বেশির ভাগই সরকারে চলে গেছেন। সেই জায়গাগুলোতে সময় লাগবে। এটা বিচ্ছিন্ন ব্যাপার না। এটা আলাদা করে দেখা যাবে না। সরকার তার কাজ করবে, দল তার কাজ করবে।
অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন : বিএনপির ১১টি সংগঠনের মধ্যে ১০টিরই মেয়াদোত্তীর্ণ। ফলে এসব কমিটিগুলোই দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। তাই সংগঠনকে শক্তিশালী করতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো পুনর্গঠনের চিন্তা করছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সাম্প্রতিক এক স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে দ্রুত সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের নির্দেশনা দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখানে সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় দলীয় নেতারা সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন। তাদের মতে, দুর্বল সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে নির্বাচনে গেলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো সুযোগ নিতে পারে। তাই নির্বাচন সামনে রেখে মূল দল ও অঙ্গসংগঠনগুলোকে নতুন নেতৃত্বে পুনর্গঠন করাই এখন বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ। জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, কৃষক দল, তাঁতীদল, মৎস্যজীবী দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, জাসাস ও ওলামা দল- এই ৯টি হলো বিএনপির অঙ্গসংগঠন। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও শ্রমিক দল বিএনপির সহযোগী সংগঠন। তবে এসব সংগঠনের অধিকাংশেরই পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র নেই। প্রায় ৪৭ বছরেও ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র তৈরি হয়নি।
বিএনপির প্রধান অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদল। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগে আবদুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। দেড় বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো তাদের পক্ষে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন ভোলা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, কৃষক দল, মহিলা দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, তাঁতীদল, জাসাস, শ্রমিক দল ও মৎস্যজীবী দলের কমিটিও মেয়াদোত্তীর্ণ। স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী এবং সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান দুজনই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। রাজীব আহসান বর্তমানে সরকারের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে হাসান জাফির তুহিনকে সভাপতি এবং শহিদুল ইসলাম বাবুলকে সাধারণ সম্পাদক করে কৃষক দলের কমিটি গঠন করা হয়। তিন বছর মেয়াদি এ কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে। শহিদুল ইসলামও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। ২০২৪ সালের মার্চে রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি ও নাছির উদ্দিন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। এ কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোয় সংগঠনের ভরাডুবি স্পষ্ট। ফলে সংগঠনটিকে পুনর্গঠনের দাবি উঠেছে অনেক আগেই।
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে আফরোজা আব্বাসকে সভাপতি ও সুলতানা আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে মহিলা দলের কমিটি ঘোষণা করা হয়। ১০ বছর একই কমিটি দিয়ে চলছে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে মুক্তিযোদ্ধা দলের কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে ইশতিয়াক আজিজ উলফাত সভাপতি ও সাদেক খান সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এক যুগের বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। ২০১৪ সালের এপ্রিলে শ্রমিক দলের সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলে আনোয়ার হোসাইন ও নূরুল ইসলাম খান নাসিমের নেতৃত্বে সংগঠনটির কমিটি গঠিত হয়। ২০১৬ সালে কমিটির মেয়াদ শেষ হয়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রফিকুল ইসলাম মাহতাবকে আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা আবদুর রহিমকে সদস্য সচিব করে মৎস্যজীবী দলের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে মারা যান রফিকুল ইসলাম। পরে ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির কমিটি বিলুপ্ত করে বিএনপি। এরপর আর কোনো কমিটি হয়নি।
২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আবুল কালাম আজাদকে আহ্বায়ক ও মো. মজিবুর রহমানকে সদস্য সচিব করে তাঁতীদলের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। তিন বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ ২০২২ সালে শেষ হয়।
২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ড. মামুন আহমেদ ও হেলাল খানের নেতৃত্বাধীন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর হেলাল খানকে আহ্বায়ক ও জাকির হোসেন রোকনকে সদস্য সচিব করে ২০২১ সালের নভেম্বরে ৭১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কমিটির মেয়াদ তিন বছর হলেও ওই কমিটি প্রায় ৫ বছর পার করছে।