ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ঈদে ফের সরব তৃণমূলের রাজনীতি। এ সময় জেলা-উপজেলা ও গ্রাম-গঞ্জের চায়ের দোকান, হাটবাজার পাড়া-মহল্লা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের রেশ না কাটতেই শুরু হয়েছে স্থানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচনের তোড়জোড়। ফলে ঈদের টানা ছুটিকে কাজে লাগাতে সক্রিয় হয়ে পৃষ্ঠা ওঠেন স্থানীয় সরকারের সম্ভাব্য প্রার্থীরা।
ঈদ উদ্যাপনের জন্য রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহর ছেড়ে গ্রামের আপন ঠিকানায় গেছে লাখ লাখ মানুষ। তবে এই আনন্দ যাত্রার ভেতরে নীরবে জমে উঠেছে স্থানীয় রাজনীতি। সরকার গঠনের পর ক্ষমতাসীন দল তাদের এক মাসের সাফল্য তুলে ধরতে চেয়েছে, আর বিরোধী দল ছিল জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক নিয়োগের ইস্যুকে কেন্দ্র করে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, তৃণমূলের রাজনীতির এমন তৎপরতা আমার দৃষ্টিতে তেমন পড়েনি। তবে এ ধরনের তৎপরতা যদি থেকে থাকে তা স্বাভাবিক। প্রায় অনুরূপ মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জনমনে ব্যাপক আগ্রহ আছে এবং এই নির্বাচন নিয়ে যে কোনো ধরনের তৎপরতা থাকাটা স্বাভাবিক। তবে সাংবিধানিক সুরক্ষার জন্য দ্রুত এই নির্বাচন দেয়া প্রয়োজন। ক্ষমতাসীন বিএনপি সঠিক সময়ে এই নির্বাচন দিতে ব্যর্থ হলে সংবিধান লঙ্ঘিত হওয়ার পাশাপাশি তাদের ৩১ দফা কর্মসূচিও ভুলুণ্ঠিত হবে।
সরজমিনে দেখা যায়, ঈদ উপলক্ষে অনুদান বিতরণ, দরিদ্রদের সহায়তা, ঈদ উপহার প্রদান এবং ঈদ পুনর্মিলনীসহ বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন এই তৃণমূল রাজনীতির অংশ হয়ে উঠেছে। সব দলের নেতারাই এ সব কার্যক্রমের মাধ্যমে তৃণমূলের মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবের আদর্শ তুলে ধরছে এবং জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
গত ১২ই মার্চ প্রথম অধিবেশনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয় নতুন সংসদের। অন্যদিকে, প্রথমবারের মতো শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। সঙ্গে আছে ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্র ও তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ ১১ দলীয় জোট।
এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই এসেছে ঈদুল ফিতর। ফলে এটি কেবল ধর্মীয় উৎসবের সীমায় আবদ্ধ থাকেনি; বরং তা পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন ও জনসংযোগের এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হয়ে। ক্ষমতাসীন বিএনপি তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রাথমিক অগ্রগতি তুলে ধরতে মাঠে নেমেছে। দলের সংসদ সদস্য ও স্থানীয় নেতারা ঈদ উপলক্ষে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে জনগণের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি সরকারের এক মাসের কর্মকাণ্ড তুলে ধরছেন। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং খাল খনন কর্মসূচির মতো উদ্যোগগুলোকে সামনে এনে তারা বোঝাতে চাইছেন, নতুন সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে।
সরকারি দলের নেতারা বিভিন্ন ঈদগাহ্ ময়দান, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এ সব বিষয় তুলে ধরছেন। সংসদ অধিবেশন শেষে সংসদ সদস্যদের অধিকাংশই ছুটে গেছেন নিজ নির্বাচনী এলাকায়। তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে এই সরকার শুধু ক্ষমতায় আসার জন্য নয়, বরং রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে।
অপরদিকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ঈদের সময়টিকে কাজে লাগিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে জনমত তৈরির চেষ্টা করছেন। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াতের ৬৮ জন সংসদ সদস্য, এনসিপি’র ছয়জন এবং দুই খেলাফত মজলিসের তিনজন সংসদ সদস্য নিজ নিজ এলাকায় সক্রিয় ছিলেন। পিছিয়ে ছিলেন না তাদের জোটের অন্য দলগুলোর নেতারাও।
অন্যদিকে, ঈদের এই সময়টিতে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে তুলেছে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনও। সামনে সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীরা এখন থেকেই সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে শোভা পাচ্ছে তাদের পোস্টার ও ব্যানার। অনেকে ঈদের শুভেচ্ছার মাধ্যমে নিজেদের পরিচিতি বাড়াচ্ছেন, আবার কেউ সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে জনগণের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছেন।
এদিকে, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি বিরোধী রাজনীতির মাঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এসব নিয়োগের মাধ্যমে সরকার স্থানীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। ফলে এই বিষয়টিও এখন ঈদ আড্ডা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবের আদর্শ তুলে ধরছে এবং জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, বিএনপি নেতারা এসব সমালোচনার জবাবে বলছেন, সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা দেশের অর্থনীতি ও কৃষি খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
সব মিলিয়ে এবারের ঈদ শুধুই আনন্দ-উৎসবের নয়, এটি হয়ে উঠেছিল রাজনীতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। মানুষের ঘরে ফেরা, পারিবারিক মিলন আর সামাজিক বন্ধনের পাশাপাশি তৃণমূলে নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠছে রাজনৈতিক সমীকরণ। সরকারি দলের উন্নয়ন প্রচেষ্টা আর বিরোধী দলের চাপ সৃষ্টির রাজনীতি- এই দুইয়ের টানাপড়েন ঈদ পরবর্তী সংসদ ও রাজপথ আরও সরগরম হয়ে উঠবে- এমন সম্ভাবনাই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।