Image description
মিন্টু বাহিনীর দাপট

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজশাহীর বাগমারার তাহেরপুরে ‘সিক্স স্টার’ নামে ভয়ংকর সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে উঠেছে। তাহেরপুর পৌর বিএনপির সভাপতি আ ন ম শামছুর রহমান মিন্টুর মদদে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী বাহিনীর হামলা থেকে বিএনপি এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরাও রক্ষা পাচ্ছে না। এ বাহিনীর চাঁদাবাজি, পুকুর, জমি ও হাটবাজার দখল এবং নির্যাতনে এলাকার মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে।

শনিবার ঈদের রাতে মিন্টু বাহিনী যুবলীগ ও ছাত্রলীগের তিন নেতাকর্মীর বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এর মধ্যে দুটি বাড়ির প্রায় সব আসবাবপত্র ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রকাশ্যে পিস্তল উঁচিয়ে এবং গলায় হাঁসুয়া ধরে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করা হয়েছে। রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত পৌরসভার নূরপুর মহল্লায় তিন বাড়িতে তাণ্ডব চলে। পাশের শ্রীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বাড়িতেও হামলা চালানো হয়। ১২ থেকে ১৫ জনের সশস্ত্র দল মাইক্রোবাসে তাহেরপুর ও শ্রীপুর ইউনিয়নের অলিগলিতে রাতভর মহড়া দেয়। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপি নেতা মিন্টু।

বাড়িঘর ভাঙচুর, লুট ও ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনায় যুবলীগ নেতা সোহেলের বাবা আবদুল গাফ্ফার রোববার বাগমারা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। জিডিতে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন-পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আশরাফুল পেয়াদা, পৌর কৃষক দলের সিনিয়র সহসভাপতি রাসেল ফরাসি, পৌর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সোহেল রানা, পৌর যুবদলের সদস্য জুয়েল রানা এবং তাহেরপুর কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাকিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মিন্টুর বাহিনী তাহেরপুর পৌরসভার হরিতলা মোড়ে যুবলীগ নেতা সোহেলের চেম্বার দখল করে নেয়। হামলার আগে সোহেলের চেম্বারে মিন্টু ও তার বাহিনীর সদস্যরা বৈঠক করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কৃষক দল নেতা রাসেল ফরাসি, ছাত্রদল নেতা সোহেল রানা, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আশরাফুল পেয়াদা, পৌরসভার পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শমসের আলী, সাত নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মজনু প্রমুখ।

নূরপুর মহল্লার নির্যাতিত আব্দুল গাফ্ফার বলেন, আশরাফুল পেয়াদা, রাসেল ও জুয়েল রানার নেতৃত্বে ১২ থেকে ১৪ জনের একটি সশস্ত্র দল বাড়িতে প্রবেশ করে খাট, টেবিল, আলমারি, টেলিভিশন, ফ্রিজ, এসিসহ বাড়ির প্রায় সব আসবাবপত্র ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। সোহেলকে না পেয়ে তারা চরম ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি করে। সন্ত্রাসীরা তার গলায় হাঁসুয়া ধরলে আড়াই লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার ও নগদ ৫৫ হাজার টাকা তাদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছি। দ্বিতীয় দফায় সন্ত্রাসীরা ছাত্রলীগ কর্মী ফরিদ ইসলামের বাড়িতে হামলা চালায়। গরু বিক্রির দুই লাখ টাকা তারা লুট করে। এরপর তারা ছাত্রলীগ কর্মী শামীম ওসমানের বাড়িতে ভাঙচুর চালায়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর যুবলীগ নেতা সোহেল রানা আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে শামীম ওসমান ও ফরিদ এলাকায় আছেন।

ঘটনার পর সোহেল রানা মোবাইল ফোনে কথা বলেন রাসেল ফরাসির সঙ্গে। তাদের কথোপকথনে উঠে আসে-সাবেক পৌর মেয়র মিন্টুর নির্দেশে বাড়িগুলো ভাঙচুর করা হয়েছে। এ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পৌর কৃষক দলের সিনিয়র সহসভাপতি রাসেল ফরাসি বলেন, তিনি কিছুই জানেন না। যুবলীগ নেতা সোহেলের সঙ্গে তার ফোনকল রেকর্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, সোহেলের সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক তাহেরপুরের বিএনপি এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা জানান, মিন্টুর নেতৃত্বাধীন সিক্স স্টার বাহিনীর সদস্যদের বেপরোয়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, ব্যাপক চাঁদাবাজি, পুকুর খনন এবং জমি ও দোকান দখলসহ নানা অপকর্মে সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। আর নিঃস্ব অবস্থা থেকে মিন্টু অর্ধশত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।

এদিকে, সব অভিযোগ অস্বীকার করে আ ন ম শামছুর রহমান মিন্টু বলেন, যুবলীগ নেতা সোহেলের চেম্বার দখলের অভিযোগ সঠিক নয়। হামলার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। আর হামলা হয়ে থাকলে এর সঙ্গে আমার কোনো যোগসূত্র নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খোঁজ নিলেই এর সত্যতা পাবে।

বাড়িঘরে হামলা ও লুটের ব্যাপারে বাগমারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইদুল আলম বলেন, কেউ জিডি করেছেন কিনা জানা নেই। জিডি হলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে ২৩ জানুয়ারি সেনাবাহিনীর আভিযানিক দল বাগমারায় অভিযান চালিয়ে আলোচিত ‘সিক্স স্টার’ বাহিনীর দুই সদস্য বাশার ও হালিমকে পয়েন্ট ২২ বোরের এয়ার রাইফেল ও একটি আধুনিক ওয়াকিটকিসহ আটক করে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না করে পুলিশ শুধু ৫৪ ধারায় সন্দেহমূলক গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠায়। ছুটির দিন হলেও এক ঘণ্টার নোটিশে বিশেষ আদালত বসিয়ে তাদের জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়। সন্ধ্যার মধ্যেই তারা নিজ এলাকায় ফেরেন।