Image description
ছুটির মধ্যে ১৯ মার্চ দখলে নেওয়া হয় ১৯ কাঠার বাড়িটি

ঈদের ছুটিতে ফাঁকা রাজধানীতে পুলিশের মদদে অভিজাত এলাকা গুলশানে একটি বাড়িতে ভাঙচুর, লুটপাটের পর দখলের ঘটনা নিয়ে তোলপাড় চলছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে পুলিশের উপস্থিতিতে বাসিন্দাদের বের করে দিয়ে গুলশান-১ নম্বর এলাকার ১২৭ নম্বর রোডের ১৫ নম্বর বাড়িটি দখলে নেয় একদল লোক। এ নিয়ে গত শনিবার কালবেলা অনলাইনে খবর প্রকাশিত হলে তোলপাড় শুরু হয়।

বাড়ি মালিকের অভিযোগ, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান জোনের সহকারী কমিশনার আলী আহমেদ মাসুদের উপস্থিতিতে এবং তার মদদে দখলের এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের সামনেই এ ঘটনা ঘটলেও উল্টো ভুক্তভোগীদেরই হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। পুলিশ যার পক্ষ নিয়েছে সিআইডির তদন্তে তিনি প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত। তার দুই নামে দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) রয়েছে।

যদিও কালবেলা অনলাইনে খবর প্রকাশের পর গত সোমবার গুলশান জোনের সহকারী কমিশনার আলী আহমেদ মাসুদকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে ডিএমপির এইচআরডি বিভাগে সহকারী পুলিশ কমিশনার (ট্রেনিং) পদে বদলি করা হয়েছে। পুলিশের এ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ার পর ওই রাতেই দখলদাররা বাড়িটি ছেড়ে চলে যায়। গতকাল মঙ্গলবার ওই বাড়িতে গিয়ে তাদের কাউকে দেখা যায়নি। তবে সেখানে আনসার সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।

কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, গুলশান-১-এর ১২৭ নম্বর রোডের ১৫ নম্বর বাড়িটি ১৯ কাঠা ১৩ ছটাক জায়গার ওপর অবস্থিত। ২০১৩ সালের শেষের দিকে আব্দুল আজিজ খান নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে পুরোনো ভবনসহ সম্পত্তিটি কেনে মেসার্স মুন ইন্টারন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস। ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাবাসসুম আরেফিন রহমান, তার ডাক নাম মুন। ভবনটিতে তার বোনসহ অন্য স্বজনরা বসবাস করে আসছিলেন। বাড়িটির ওপর আদালতের ইনজাংশন রয়েছে।

তাবাসসুম আরেফিন রহমান কালবেলাকে বলেন, দখলদাররা সরে গেলেও মঙ্গলবার (গতকাল) বিকেল পর্যন্ত তারা নিজেদের সম্পত্তিতে প্রবেশ করতে পারেননি। গুলশান থানার ওসির নির্দেশে আনসার সদস্যরা তাদের সেখানে ঢুকতে দিচ্ছে না। যদিও ২০১৩ সালের পর থেকে সেখানে ব্যবসায়িক কাজ ও তার স্বজনরা বসবাস করে আসছিলেন।

ঈদের ছুটিতে যেভাবে বাড়িটি দখলের চেষ্টা হয়েছিল: গত বৃহস্পতিবার প্রতিদিনের মতোই বাড়িটিতে অবস্থান করছিলেন মুনের ফুফাতো বোন বেসরকারি একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ইভা। তিনি জানান, ওইদিন দুপুর ১২টার দিকে বাড়িটিতে ১০ থেকে ১২ জনের একটি গ্রুপ জোর করে ঢুকে পড়ে। তারা ভাঙচুর ও হামলা চালাতে থাকে। এক পর্যায়ে সেখানে বাড়িটির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদের বের করে দেওয়া হয়। তখন বাড়ির গেটে পুলিশের উপস্থিতি দেখা গেছে। এক পর্যায়ে তাদেরও বের করে দেওয়া হয়।

তিনি জানান, হামলাকারীরা তার আলমারিতে থাকা প্রায় ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকার স্বর্ণালংকার এবং দেড় লাখ টাকা নগদ নিয়ে যায়। এ সময় তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়।

বাড়িটির ম্যানেজার আবু সিকদার কালবেলাকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ বাড়ি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছিল। গত বৃহস্পতিবারের আগেও এখানে হামলা হয়েছে। তিনি জানান, প্রথম ঘটনা ঘটে গত ১ মার্চ বিকেলে। তিনি বাড়ির মালিকের নির্দেশে বাউন্ডারি নির্মাণের কাজ করাচ্ছিলেন। এ সময় ইসমাইল নামে এক ব্যক্তি ও তার সঙ্গে থাকা ২০ থেকে ২৫ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি বাসায় জোর করে প্রবেশ করে কাজ বন্ধ করার জন্য হুমকি দেয়। না করলে তারা ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। এরপর ওই ঘটনায় গুলশান থানায় মামলাও করা হয়।

ওই মামলার এজাহারে বলা হয়, হামলাকারীরা ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে এবং তা না দিলে বাড়ির সব কাজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়। একই সঙ্গে সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের প্রাণনাশের ভয় দেখানো হয়। পরে স্থানীয়রা এগিয়ে এলে অভিযুক্তরা চলে যায়। তবে যাওয়ার সময়ও তারা প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যায়।

একই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার পুলিশের ‘সহযোগিতায়’ ফের বাড়িটিতে হামলা চালিয়ে ও লুটপাট করে দখলে নিয়েছিল ইউসুফ ও তার সহযোগীরা। এ ঘটনাতেও থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

ওই ঘটনার পর সম্পত্তিটির মালিক তাবাসসুম আরেফিন মুন এবং তার কর্মচারী মো. হাসান থানায় যান। থানায় যাওয়ার পর তাদেরই উল্টো নাজেহাল করা হয় বলে অভিযোগ করেন মুন। তিনি কালবেলাকে বলেন, পুলিশের উপস্থিতিতে সন্ত্রাসীরা তার সম্পত্তিতে অবস্থান করছে। গুলশান জোনের এসির সহযোগিতায় গুলশানের মতো জায়গায় এমন ঘটনা ঘটল। তবে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে কথা বলে তিনি ফের আনসার মোতায়েন করেছেন।

তিনি জানান, গণমাধ্যমে খবর আসার পর দখলদাররা গত সোমবার রাতে পালিয়ে গেছে। খবর পেয়ে তারা বাড়ির ভেতরে ঢুকতে চাইলে আনসার সদস্যরা গুলশান থানার ওসির নির্দেশের কথা বলে বাড়িতে ঢুকতে দিচ্ছে না।

জানতে চাইলে গুলশান থানার ওসি রাকিবুল হাসান কালবেলাকে বলেন, বাড়িটি নিয়ে দুপক্ষের মালিকানা দাবি রয়েছে। এজন্য তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে সেখানে কোনো পক্ষকেই ঢুকতে দিচ্ছেন না। উভয়পক্ষকে দেওয়ানি আদালতে মীমাংসা করে আসতে বলা হয়েছে। সেটি না হওয়া পর্যন্ত পুলিশ সেখানে কাউকে ঢুকতে দেবে না।

অবশ্য কালবেলার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন তথ্য। কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০১৩ সালে ওই বাড়িটি আজিজ খানের কাছ থেকে কেনার পর তাবাসসুম আরেফিন রহমান মুনের স্বজনরা সেখানে ভোগদখল করে আসছেন। তারা নিয়মমতো খাজনাও পরিশোধ করছেন।

ভুয়া আজিজ খান সাজিয়ে বাড়িটি দখলের চেষ্টা: কাগজপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, মো. ইউসুফ নামে এক ব্যক্তি অন্য এক ব্যক্তিকে আব্দুল আজিজ খান সাজিয়ে জাল কাগজপত্র তৈরি করে দীর্ঘ বছর ধরেই বাড়িটি দখলের চেষ্টা করে আসছিলেন। এ নিয়ে মামলা হলেও দখলদার ব্যক্তি যে ভুয়া আব্দুল আজিজ খান, তা পুলিশের তদন্তেই বেরিয়ে আসে। ২০২২ সালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি ভুয়া আজিজ খান এবং ইউসুফের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিটও দেয়। সেই মামলার বিচার চলমান রয়েছে। তবে এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার গুলশান জোনের সহকারী কমিশনার আলী আহমেদ মাসুদের মদদে সেই গ্রুপটাই ফের দখল কাণ্ড করে।

তাবাসুসম আরেফিন রহমানের একজন কর্মী মো. হাসান বলেন, মো. ইউসুফ নামে এক ব্যক্তি জাল কাগজপত্র তৈরি করে বাড়িটি দখলের চেষ্টা করেছেন। বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর তিনি এবং তার স্যার (মুন) থানায় অভিযোগ করতে গেলে উল্টো তাদের হুমকি দেন এসি মাসুদ। আমাদের কাগজপত্র নাকি ভুয়া। এমনকি তিনি আমাদের হাজতে পাঠানোর ভয়ও দেখান। আমাদের বাসা ভাঙচুর করেছে, লুটপাট করেছে, আমি গিয়েছি থানায় অভিযোগ করতে, অথচ আমাকে বলেছে, হাজতে ভরে দেবে। জমির কাগজ চেক করার পর বলে এগুলো ভুয়াও হতে পারে।

অবশ্য বদলি হওয়ার আগে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের গুলশান জোনের সহকারী কমিশনার আলী আহমেদ মাসুদ কালবেলাকে বলেছিলেন, ভাঙচুরের সময় আমি উপস্থিত ছিলাম কি না, সেটার ভিডিও ফুটেজ বের করেন। আমি ছিলাম কী ছিলাম না, সেটা ফুটেজ দেখলেই বোঝা যাবে। দুপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশের এ কর্মকর্তা নিজের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন। ঘটনার পর মামলা করতে চাইলেও তা না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, মামলা তো নেবে থানা ওসি।

কে এই ভুয়া মালিক আব্দুল আজিজ খান: পুলিশের দেওয়া চার্জশিট ও বিভিন্ন নথি থেকে দেখা যায়, আব্দুল আজিজ খান নামে যে ব্যক্তি গুলশানের ওই বাড়িটির মালিকানা দাবি করে দখলের চেষ্টা করছেন, তার প্রকৃত নাম মো. হানিফ হাওলাদার। তার বাবার নাম মৃত আব্দুল গফুর হাওলাদার এবং মা মৃত হামিদা বেগম। তার স্থায়ী ঠিকানা বরগুনার বেতাগীতে। তিনি ভাটারায় একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। ভাটারার আরেক বাসিন্দা মো. ইউসুফ তাকে গুলশানের ওই বাড়িটির মালিক সাজিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন জাল কাগজ বানিয়েছেন। এ দুজন মিলে ধানমন্ডির বাসিন্দা জিল্লুর রহমানের নামে বাড়িটির দলিল তৈরি করেছেন! প্রকৃত পক্ষে মো. ইউসুফ ভাটারা এলাকায় জমির ব্যবসায় জড়িত। এ তিনজনের বিরুদ্ধেই জালিয়াতির অভিযোগে সিআইডি আদালতে চার্জশিট দিয়েছে।

অন্যদিকে, মুন ইন্টারন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাবাসসুম আরেফিন রহমান মুন যে আব্দুল আজিজ খানের কাছ থেকে সম্পত্তিটি কিনেছেন, তার বাড়ি ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জের খানহাটি গ্রামে। তার বাবার নাম মৃত আব্দুল মোন্নাফ খান এবং মায়ের নাম মৃত আকলিমা বেগম। আসল আজিজ খান ২০১৫ সালে মারা গেছেন।