Image description

ঈদে বাড়ি ফেরার আনন্দ ম্লান হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায়। ঈদের ছুটিতে ২০০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বাড়তি ছুটি ঘোষণা করে যাত্রা স্বস্তিদায়ক করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে না পারায় সড়কে স্বস্তির প্রতিফলন ঘটেনি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল ছুটি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। মহাসড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল, চালকের ক্লান্তি ও বেপরোয়া গতি-সব মিলিয়ে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘাটতিও দুর্ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে বড় কারণ হিসাবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা-এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।

এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক এবং যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, এবারের ঈদুল ফিতরের যাত্রায় চরম অব্যবস্থাপনা চোখে পড়েছে। বাসে ভাড়া নৈরাজ্য চললেও সরকার তা স্বীকার করেনি। কোনো বাস মালিককে শাস্তি দেওয়া হয়েছে-এমন ঘটনা জানা যায়নি। দুর্ঘটনাপ্রবণ জায়গাগুলোয় বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সেসব সমস্যা চিহ্নিত করে কোনো সমাধান করেনি।

তিনি বলেন, রেল দুর্ঘটনা, লাইনচ্যুত হওয়া এবং জামালপুরের ভাসমান ব্রিজ ভেঙে পড়া-সবই চরম দায়িত্ব অবহেলার চিত্র। গাড়ির বেপরোয়া গতি, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল এবং অদক্ষ চালকদের গাড়ি চালানোসহ নানা অব্যবস্থাপনার চিত্র হতে দেখা গেছে। এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। নইলে দেশে বিরাজমান সড়ক, নৌ ও রেলপথে দুর্ঘটনা কমবে না।

তিনি আরও জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেখা গেছে, পরিবহণচালক ও মালিকদের চাপের মধ্যে রাখা হয়েছিল। এতে পরিবহণ সেক্টরে নৈরাজ্য কম ছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সড়ক, নৌ ও রেলমন্ত্রী পরিবহণ সেক্টরসংশ্লিষ্টদের প্রতি বিশেষ দরদ প্রদর্শন করায় তারা আবার বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এ কারণে সর্বত্র গা-ছাড়া ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ যুগান্তরকে বলেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সরকারের ঈদের ছুটি বাড়ানো ইতিবাচক হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে না পারায় পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেনি। ঈদ আনন্দযাত্রা হলেও দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা এটিকে বিষাদযাত্রায় পরিণত করে তুলেছে। তিনি বলেন, অন্য বছরের তুলনায় এবারের ঈদুল ফিতরে সড়ক, নৌ ও রেলপথে বিশৃঙ্খলা বেশি চোখে পড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কমলাপুর থেকে কোনো যাত্রী ছাদে চড়তে পারত না। তবে এবার যাত্রীরা কমলাপুর থেকে ট্রেনের ছাদে উঠেছে। বগুড়ায় ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হওয়া এবং কুমিল্লায় গেটম্যান না থাকা চরম দায়িত্বে অবহেলার চিত্র ফুটে ওঠে। একই সঙ্গে সদরঘাটে ধাক্কাধাক্কি করে লঞ্চে উঠতে গিয়ে পানিতে পড়ে হতাহতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, বিগত বছরগুলোর অব্যবস্থাপনা প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বা সরকার কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

তিনি জানান, রেল-লঞ্চ ও সড়কপথে ব্যবস্থাপনা উন্নত করে প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। চরম খামখেয়ালিপনার প্রমাণ মিলছে এসব ঘটনায়। কুমিল্লায় গেটম্যানকে সাসপেন্ড করার কথা বলছে সরকার, অথচ তার চাকরিই নেই বলে জানা যাচ্ছে; কেননা তিনি একটি প্রকল্পের আওতায় চাকরি করতেন, বেশ আগে ওই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। লঞ্চ ও বাসের টার্মিনালের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে বাস রুট রেশনালাইজেশন এবং ব্রিজে ইলেকট্রনিক টোল সিস্টেম (ইটিএস) কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি সড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ পয়েন্টগুলো রিসার্চ করে তার সমাধান বের করতে হবে। নইলে ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরের সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহত ক্রমাগত বেড়েছে। দুর্ঘটনার চিত্র বিশ্লেষণ করে তারা বলছেন, অন্যবারের চেয়ে এবারের দুর্ঘটনা ও হতাহত বেশি হতে পারে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারের ঈদযাত্রায় সোমবার পর্যন্ত ২০১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এ সময়ে আহত হয়েছেন ৪২১ জন। অন্যদিকে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে এক সপ্তাহে দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৬২১ জন। তাদের মধ্যে ১৭৮ জন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এবং ৩১৫ জন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।

৯ বছরে ঈদুল ফিতরের যাতায়াতে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ৬৯২টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩ হাজার ৩৬ জন। আর আহত হয়েছেন ৮ হাজার ২৪৬ জন।

জানা যায়, ২০১৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে ১২১টি; এতে নিহত হন ১৮৬ জন এবং আহত ৭৪৬ জন। ২০১৭ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ২০৫টি, এতে নিহত হন ২৭৪ জন এবং আহত ৮৪৮ জন। ২০১৮ সালে ২৭৭টি দুর্ঘটনায় নিহত ৩৩৯ জন এবং আহত হন ১ হাজার ২৬৫ জন। ২০১৯ সালে ২৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ২৭৩ জন এবং আহত ৮৪৯ জন। ২০২০ সালে ঘটে ১৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৬৮, আহত ২৮৩ জন। ২০২১ সালে ৩১৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ৩২৩ এবং আহত ৬২২ জন। ২০২২ সালে দুর্ঘনা ঘটে ৩৭২টি, এতে নিহত হন ৪১৬ এবং আহত ৮৪৪ জন। ২০২৩ সালে ৩০৪টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৩২৮ জন এবং আহত ৫৬৫ জন। ২০২৪ সালে ৩৯৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন ৪০৭ জন, আহত ১ হাজার ৩৯৮ জন। ২০২৫ সালে ৩১৫টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৩২২ জন এবং আহত ৮২৬ জন।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, সড়ক, নৌ ও রেলপথের সমস্যা চিহ্নিত। সমাধানের পথও দায়িত্বপ্রাপ্তদের জানা রয়েছে। শুধু কাজটি হচ্ছে না। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা আন্তরিক হয়ে কাজগুলো করলে সড়ক, নৌ ও রেলপথের দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সড়ক, রেল ও নৌ উপদেষ্টাদের বিশৃঙ্খলা বিলোপে কঠোর নির্দেশনা ছিল। যে কারণে অনেকাংশে দুর্ঘটনা কম হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা ভয়ে ছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যোগাযোগ খাতের অংশীজনদের মধ্যে গা-ছাড়া ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। এ কারণে অব্যবস্থাপনা বাড়ছে। আর এ অব্যবস্থাপনায় দুর্ঘটনা ও হতাহত বেড়েছে।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে সড়ক পরিবহণ ও সেতু, নৌপথ ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের ব্যক্তিগত নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠালেও তিনি তাতে কোনো সাড়া দেননি।