Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। তবে নির্বাচন-পরবর্তী মাঠের রাজনীতিতে দলটিতে কিছুটা ‘স্থবিরতা’ দেখা দিয়েছে। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের বেশির ভাগই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের অনেকে দলের প্রধান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন।

আবার অনেক নেতাকে করা হয়েছে প্রশাসক। ফলে মাঠের রাজনীতিতে এক ধরনের নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে। আবার রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকায় দলের নেতাকর্মীদের অনেকে ঝিমিয়ে পড়েছেন। এই পরিস্থিতিতে দলের অনেকে বলেছেন, ঈদের ছুটিতে দলের নেতাদের মধ্যে সাংগঠনিক বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হতে পারে।

দলের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, নির্বাচনী ধকল কাটিয়ে উঠতে একটু সময় লাগছে। তবে শিগগিরই দলের পুনর্গঠনকাজ শুরু হবে। সাংগঠনিক গতিশীলতা আনতে দলের কমিটিগুলো ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছে হাইকমান্ড। শিগগিরই এই পরিকল্পনা দৃশ্যমান হবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

বিএনপি নেতারা জানান, দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর কমিটি দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ। তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্বে রয়েছে স্থবিরতা। ফলে সংগঠনগুলোতে নতুন নেতৃত্ব আনার জোর দাবি রয়েছে। দলের হাইকমান্ডও এই বিষয়ে অবগত আছেন। ঈদের পর পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া শুরু হবে। এ ছাড়া শিগগিরই দলের জাতীয় কাউন্সিলও অনুষ্ঠিত হবে।

আরেকটি সূত্র জানায়, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমে জেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। এরপর দলের প্রতিটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণগুলোর নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি যেসব সংগঠনের কমিটির মেয়াদ আছে, সেগুলোর নেতৃত্ব ও কমিটিতে পরিবর্তন আনা হবে। এরপর জেলা, মহানগর কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।

জানতে চাইলে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। এবার দলের জাতীয় কাউন্সিল হবে খুবই জাঁকজমকপূর্ণ। নিশ্চয়ই এই পরিকল্পনা মাথায় নিয়েই এগোচ্ছেন দলের চেয়ারম্যান।’

বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী আমিনুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাত্র তো নির্বাচন শেষ হলো। আমাদের যেটা নির্দেশনা আছে, আমরা যেহেতু জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করেছি, সেহেতু নিজ নিজ এলাকায় আমাদের যাঁরা নেতাকর্মী রয়েছেন, তাঁরা যেন সাধারণ জনগণের প্রতিনিধি হয়ে এলাকার যেসব সমস্যা, সেগুলো লোকাল এমপি বা প্রতিনিধিদের জানানো এবং সমস্যার সমাধান করা। এভাবেই একটা নির্দেশনা দেওয়া আছে।’

তিনি বলেন, ‘দল পুনর্গঠন করা হচ্ছে সম্পূর্ণ দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। আমাদের পার্টির হাইকমান্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।’

বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা বলছেন, দল ও সংগঠনের নেতারা এমপি-মন্ত্রী হওয়ায় সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রমে কিছুটা ছন্দঃপতন হয়েছে। তাই এখনই সংগঠন নিয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। কারণ একসঙ্গে দল ও সরকারের দায়িত্ব পালন করা কঠিন। বিশেষ করে মাঠের রাজনীতি ধরে রাখতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে গতিশীল রাখতে সার্বক্ষণিক নেতৃত্ব দরকার।

সর্বশেষ বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের মার্চে। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পর পর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও এর মধ্যে এক দশক পার হয়ে গেছে। তবে এই সময়ে নির্বাহী কমিটিতে একাধিকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। স্থায়ী কমিটিতেও করা হয়েছে পদায়ন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কেউ কেউ পদোন্নতি পেয়েছেন, আবার কেউ দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন।

গত বছর ৩০ ডিসেম্বর তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণে দলের চেয়ারম্যানের পদ শূন্য হয়। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত থেকে পূর্ণ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তারেক রহমান। প্রথমবার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেন তারেক রহমান এবং তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা নির্বাচিত হন তিনি।

সরকার পরিচালনায় তাঁকে ব্যস্ত সময় কাটাতে হচ্ছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যদের বেশির ভাগই মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। সংসদের স্পিকার হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি নিয়ে স্পিকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। ফলে স্থায়ী কমিটিতেও একাধিক পদ শূন্য। নির্বাহী কমিটিতেও অনেক পদ খালি আছে। এ অবস্থায় দলের নেতাকর্মীরা প্রত্যাশা করছেন, দল পুনর্গঠন করা হলে নির্বাহী কমিটিতেও কিছু পরিবর্তন আসবে।

অঙ্গসংগঠনগুলোর কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ : বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বেশির ভাগ কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। এসব সংগঠনের বেশ কয়েকজন এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে নেতাকর্মীরা মনে করছেন, তাঁরা আর সংগঠনে থাকছেন না। এ ছাড়া নির্বাচনের পর অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ পদ পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন অনেক নেতা। এরই মধ্যে তাঁরা লবিং শুরু করেছেন, কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগও রাখছেন। অনেকে আবার ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নিজেদের ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা তুলে ধরছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেসবের প্রচারও চালাচ্ছেন।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগে আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী যুবদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। এরপর দেড় বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম নয়ন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

সংগঠনের কমিটি পুর্নগঠন প্রসঙ্গে যুবদল ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক শরীফ উদ্দিন জুয়েল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আলোচনা আছে, বিএনপির অঙ্গদলগুলোর পুনর্গঠনকাজ অচিরেই শুরু হবে। দলের নীতিনির্ধারকদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে কবে নাগাদ এই প্রক্রিয়া শুরু হবে।’

তিনি বলেন, ‘রমজানে আমরা প্রধানমন্ত্রী নির্দেশিত সামাজিক কমসূচিগুলো পালন করে যাচ্ছি। বলা যায়, এটাও রাজনীতিরই অংশ।’

এদিকে স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, কৃষক দল, মহিলা দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, তাঁতিদল, জাসাস, শ্রমিক দল ও মৎস্যজীবী দলের কমিটিও মেয়াদোত্তীর্ণ। স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী এবং সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান—দুজনই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। রাজীব আহসান বর্তমানে সরকারের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান বলেন, ‘দলের সব কটি সংগঠনই পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা আছে। হয়তো ঈদের পর কার্যক্রম শুরু হবে।’

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে হাসান জাফির তুহিনকে সভাপতি এবং শহিদুল ইসলাম বাবুলকে সাধারণ সম্পাদক করে কৃষক দলের কমিটি গঠন করা হয়। তিন বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে। শহিদুল ইসলাম বাবুল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সংসদ সদস্য।

২০২৪ সালের মার্চে রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি ও নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে। বিগত ছাত্রসংসদ নির্বাচনগুলোতে ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ব্যাপক ভরাডুবি হয়। ফলে সংগঠনটি পুনর্গঠনের দাবি উঠেছে অনেক আগেই।

ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কমিটি পুনর্গঠন নিয়ে আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।’

সংগঠন পুনর্গঠন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, ‘আমাদের চেয়ারম্যান সাহেব (তারেক রহমান) জানেন কবে নাগাদ কমিটি গঠন করা হবে। তিনি যখন চাইবেন, তখনই কমিটি হবে।’

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে আফরোজা আব্বাসকে সভাপতি ও সুলতানা আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে মহিলা দলের কমিটি ঘোষণা করা হয়। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পর পর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও ১০ বছর একই কমিটি দিয়ে চলছে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে মুক্তিযোদ্ধা দলের কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে ইশতিয়াক আজিজ উলফাত সভাপতি ও সাদেক খান সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। তিন বছর পর পর সংগঠনটির নতুন কমিটি হওয়ার কথা থাকলেও এক যুগের বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে।

২০১৪ সালের এপ্রিলে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলে আনোয়ার হোসাইন ও নূরুল ইসলাম খান নাসিমের নেতৃত্বে সংগঠনটির কমিটি গঠিত হয়। ২০১৬ সালে কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও নতুন করে আর কোনো কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রফিকুল ইসলাম মাহতাবকে আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা আব্দুর রহিমকে সদস্যসচিব করে মৎস্যজীবী দলের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে মারা যান রফিকুল ইসলাম। পরে ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির কমিটি বিলুপ্ত করে বিএনপি। এরপর আর কোনো কমিটি হয়নি।

২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আবুল কালাম আজাদকে আহ্বায়ক ও মো. মজিবুর রহমানকে সদস্যসচিব করে মৎস্যজীবী দলের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। তিন বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয় ২০২২ সালে।

২০২১ সালের নভেম্বরে হেলাল খানকে আহ্বায়ক ও জাকির হোসেন রোকনকে সদস্যসচিব করে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) কমিটি ঘোষণা করা হয়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কমিটির মেয়াদ তিন বছর হলেও ওই কমিটি প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলছে।