Image description

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ঘোষিত আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতি বাতিল করে ভর্তি পরীক্ষার ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভরতি করানোর সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ ও সাধারণ সম্পাদক রায়হান উদ্দীন এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, এই  সিদ্ধান্ত কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয় — এটি শিক্ষাকে ক্রমাগত বাজারমুখী করে তোলার একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ। রাষ্ট্র গরিব মানুষের সন্তানের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি, মানসম্মত বিদ্যালয় ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ব্যবস্থা করতে পারেনি, এখন ভর্তি পরীক্ষার নামে শিক্ষাঙ্গনে বৈষম্যের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইছে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের শিক্ষা দেয় যখনই ভর্তি পরীক্ষা ছিল, তখনই কোচিং সেন্টারগুলো রমরমা ব্যবসা করেছে। শিক্ষামন্ত্রী বলছেন ‘কোচিং বাণিজ্যের কোনো সুযোগ থাকবে না’—কিন্তু এটি একটি ফাঁকা আশ্বাস। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা মানেই প্রস্তুতির চাপ, আর সেই চাপকে পুঁজি করেই কোচিং ব্যবসা গড়ে ওঠে। যে পরিবারের টাকা আছে, সে কোচিং কিনতে পারবে — যে পরিবার দারিদ্র্যের মধ্যে বাঁচে, তার সন্তান পিছিয়ে পড়বে। এটা শিক্ষার বেসরকারিকরণের প্রথম ধাপ। সারাদেশে বিশ হাজারেরও বেশি স্কুলে একযোগে ভর্তি পরীক্ষা পরিচালনা করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সরকারের নেই । 

যেখানে নজরদারি নেই, সেখানে অনিয়ম অনিবার্য। প্রশ্নফাঁস, তদবির, আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ভর্তি — এ দৃশ্য এই দেশ বহুবার দেখেছে। ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে দুর্নীতির নতুন দরজা খুলে যাবে, যা বন্ধ করার ক্ষমতা বা সদিচ্ছা এই সরকারের আছে বলে আমরা মনে করি না। পৃথিবীর অধিকাংশ উন্নত দেশে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হতে কোনো পরীক্ষা দিতে হয় না। 

শিশুবিকাশ বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছেন, ছোট বয়সে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা শিশুর মানসিক বিকাশে গভীর ক্ষত তৈরি করে। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া মানে একটি শিশুর কপালে ‘সে পারে না’ — এই তকমা লাগিয়ে দেওয়া। এই ট্রমা তার সারাজীবনের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করতে পারে। শিশুর শৈশব কেড়ে নিয়ে তাকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার দিকে ঠেলে দেয়া অমানবিক এবং প্রতিক্রিয়াশীল।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, লটারি পদ্ধতিও আমাদের কাছে কোনো আদর্শ সমাধান নয়। একটি ন্যায়সঙ্গত শিক্ষা ব্যবস্থায় লটারির প্রয়োজন হওয়ার কথাই নয়। লটারির প্রয়োজন পড়ে তখনই, যখন ভালো স্কুলের সংখ্যা অল্প এবং চাহিদা অনেক বেশি। কিন্তু সেই মূল সমস্যার সমাধান না করে ভর্তি পরীক্ষা চাপিয়ে দেওয়া হলো সংকটকে আড়াল করে বৈষম্যকে বৈধতা দেওয়া। এই নীতির সুবিধাভোগী হবে শহুরে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবার, যারা কোচিং কেনার সামর্থ্য রাখে। বঞ্চিত হবে প্রান্তিক, দরিদ্র ও গ্রামীণ পরিবারের কোটি কোটি শিশু।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট মনে করে, শিক্ষা সংকটের কার্যকর সমাধান হলো: সারাদেশে সমান মানের সরকারি বিদ্যালয় গড়ে তোলা, যাতে ভালো স্কুলের জন্য প্রতিযোগিতার প্রয়োজনই না থাকে, প্রশিক্ষিত ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং তাদের ন্যায্য বেতন নিশ্চিত করা, শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বাজেট বরাদ্দ ব্যাপকভাবে বাড়ানো এবং শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করা, প্রতিটি শিশুর নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে ভর্তির অধিকার নিশ্চিত করা।

অবিলম্বে ভর্তি পরীক্ষার এই সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করার এই নীতি থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। অন্যথায়, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট এই জনবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।