Image description
 

জাতির জীবনে কিছু সময় আসে, যখন ব্যালটের কালি ইতিহাসের কালির সঙ্গে মিশে যায়। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬—সে রকমই এক দিন। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, টানাপোড়েন, ভয় ও দমনের স্মৃতি পেরিয়ে জনগণ আবারও তাদের অধিকার প্রয়োগ করেছে দৃঢ় হাতে, উঁচু কণ্ঠে নয়—নীরব প্রত্যয়ে। এই বিজয় কোনো দলের একক গৌরব নয়; এটি জনগণের অর্পিত আমানত। আমি আন্তরিক অভিনন্দন জানাই দেশনায়ক তারেক রহমান এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-কে। তবে একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই—জনগণের নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট কখনো উল্লাসের নয়, এটি গভীর দায়িত্বের। বিজয় দম্ভের নয়, সেবার প্রস্তুতির নাম।

ভোটের চিহ্ন নয়, আত্মমর্যাদার পুনর্জাগরণ : এই ভোট ছিল কেবল ব্যালট বাক্সে একটি প্রতীক চিহ্নিত করা নয়; এটি ছিল দীর্ঘ হতাশার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ, গণতন্ত্রে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার এবং ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদী ঘোষণা। বহু বছরের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও বঞ্চনার পর মানুষ যখন স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে, তখন তা জাতির আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের সমতুল্য হয়ে ওঠে। এই বিজয় তাই একটি রাজনৈতিক দলের সাফল্য নয়—এটি জনগণের প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ। মানুষ পরিবর্তন চায়, কিন্তু অরাজক পরিবর্তন নয়; তারা চায় প্রাতিষ্ঠানিক ও ন্যায়ভিত্তিক পরিবর্তন। তারা দেখতে চায়—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক, প্রশাসন জবাবদিহিমূলক হোক, বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষ হোক, এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হোক। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার মানে শুধু নির্বাচন নয়; মানে প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, সাংবিধানিক ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। নির্বাচনের মাধ্যমে একটি দরজা খুলেছে—এখন সেই দরজা দিয়ে সুশাসনের পথে হাঁটা নতুন সরকারের দায়িত্ব।

বিরোধী থেকে শাসক: প্রকৃত পরীক্ষার শুরু :

বিরোধী অবস্থানে থাকা তুলনামূলক সহজ; ক্ষমতায় থেকে প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন। জনগণ এখন প্রতিশ্রুতি নয়, ফলাফল দেখতে চায়। তারা দেখতে চায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আস্থার সুরক্ষা। জনগণ যে বিশ্বাস নিয়ে ভোট দিয়েছে, সেই বিশ্বাস ভঙ্গ হলে হতাশা আরও গভীর হবে। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিচক্ষণতা, ভাষণে সংযম, নীতিতে দৃঢ়তা এবং কাজে স্বচ্ছতা অপরিহার্য। রাষ্ট্র পরিচালনা প্রতিহিংসার নয়, পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। নতুন সরকারকে মনে রাখতে হবে—তারা শুধু দলের জন্য নয়, ১৮ কোটি মানুষের জন্য সরকার গঠন করছে। নেতৃত্বের এই পর্যায়ে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তারেক রহমানকে জাতীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। দল পরিচালনা এক বিষয়, কিন্তু জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন দায়িত্ব।

 

শহীদ জিয়ার রাষ্ট্রদর্শন: শৃঙ্খলা, উৎপাদন ও আত্মনির্ভরতা:

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক বিশেষ অধ্যায়ের নাম। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিতে তিনি “উৎপাদন বৃদ্ধি”, “স্বনির্ভরতা” ও “গ্রামীণ উন্নয়ন”-কে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। তাঁর সময়েই কৃষিতে সেচ সম্প্রসারণ, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ ত্বরান্বিত হয়।

তিনি বারবার বলেছেন রাজনীতি হবে জনগণের কল্যাণের হাতিয়ার, ব্যক্তিস্বার্থের নয়। দল গঠনের সময় তিনি যে ১৯ দফা কর্মসূচি দেন, সেখানে ছিল দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, প্রশাসনিক সংস্কার, বহুদলীয় গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রতিশ্রুতি। শহীদ জিয়াউর রহমান এর মূল শিক্ষা ছিল রাষ্ট্রের শক্তি আসে জনগণের অংশগ্রহণ থেকে। তাই তিনি স্থানীয় সরকার কাঠামোকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেন। আজকের প্রেক্ষাপটে সেই শিক্ষা আরও প্রাসঙ্গিক। কেন্দ্রিকরণ নয়, বিকেন্দ্রীকরণই হতে পারে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি।

দেশমাতা খালেদা জিয়ার শিক্ষা: সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা : সাবেক প্রধানমন্ত্রী আপসহীন নেত্রী দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক প্রতীকী নাম। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি বহুবার বলেছেন—“গণতন্ত্রের বিকল্প গণতন্ত্রই।” বিরোধী মত দমনে নয়, রাজনৈতিক সহাবস্থানে তিনি বিশ্বাস করতেন। তাঁর শাসনামলে মেয়েদের শিক্ষা বিস্তার, উপবৃত্তি কর্মসূচি, প্রাথমিক শিক্ষায় লিঙ্গসমতা অর্জন এবং অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছিল। দেশমাতা খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের বড় শিক্ষা হলো—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু জনগণের ভালোবাসা স্থায়ী। দমন-পীড়ন সত্ত্বেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে না যাওয়ার দৃঢ়তা নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নৈতিক পাঠ।

তারেক রহমানের উপদেশ: সংস্কার, জবাবদিহি ও নতুন প্রজন্মের অংশীদারিত্ব : দেশনায়ক তারেক রহমান সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোতে বারবার যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন, তার মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। প্রশাসনের জবাবদিহি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা। তরুণদের অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন ভবিষ্যতে যেন আর কেউ স্বৈরাচার হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা দরকার। অর্থাৎ ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে হবে। আজ দেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, বেকারত্ব বৃদ্ধি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের উপরে অবস্থান করছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা তিনি একটি সময়সীমাবদ্ধ অর্থনৈতিক রোডম্যাপ দেবেন। নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙা। ব্যাংকিং কমিশন গঠন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস। এসএমই খাতে সহজ ঋণ। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতিতে আস্থা ফিরবে।

সংস্কার শুরু হোক নিজ দল থেকে : সংস্কারের প্রথম ধাপ শুরু হতে হবে নিজ দল থেকেই। দলীয় নেতাকর্মীদের শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও নৈতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সহিংসতা, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা থাকতে হবে—প্রশাসন, রাজনীতি, ব্যবসা বা যেকোনো খাতে। যদি দলীয় পরিচয় দুর্নীতির ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, তবে জনগণের আস্থা মুহূর্তেই ভেঙে পড়বে। জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলন প্রমাণ করেছে—বাংলাদেশের মানুষ ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরতন্ত্র মেনে নেবে না। অতীতের অপরাধগুলোর নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করতে হবে, তবে বিচার হবে আইনের শাসনের ভিত্তিতে, প্রতিহিংসার নয়।

মব কালচার: নতুন রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত : 

নতুন বাংলাদেশের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো ‘মব কালচার’—আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা। গণপিটুনি বা উসকানিমূলক সহিংসতা শুধু মানবাধিকারের লঙ্ঘন নয়; এটি রাষ্ট্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে।

মানুষ তখন আইন হাতে নেয়, যখন তারা মনে করে অপরাধী পার পেয়ে যাবে। তাই বিচারব্যবস্থাকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করতে হবে। রাজপথের বিচার বন্ধ করে আদালতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অধিকাংশ মব সহিংসতা শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব থেকে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ফ্যাক্ট-চেকিং ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মীয় উপাসনালয় ও স্থানীয় নেতৃত্বকে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে।

অর্থনীতি: প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবতা : সাধারণ মানুষের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রত্যাশা হলো দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। মূল্যস্ফীতি যদি নিম্ন ও মধ্যবিত্তকে দিশেহারা করে, তবে রাজনৈতিক সাফল্য অর্থহীন হয়ে পড়ে। নিত্যপণ্যের বাজারে অদৃশ্য সিন্ডিকেট ভাঙা, কার্যকর বাজার মনিটরিং এবং স্বল্পমূল্যে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ আদায়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এখন সময়ের দাবি। একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী বাংলাদেশ ব্যাংক এবং প্রয়োজনে ব্যাংকিং কমিশন গঠন করে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস নিশ্চিতকরণ এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণ ও প্রণোদনা দিলে কর্মসংস্থান দ্রুত বাড়বে।

তরুণ সমাজ: নতুন বাংলাদেশের স্থপতি : জুলাই আন্দোলনের প্রাণশক্তি ছিল তরুণ সমাজ। তারা প্রমাণ করেছে, পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি তারুণ্য। কিন্তু আন্দোলনের চেতনা যদি নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত না হয়, তবে সেই শক্তি হতাশায় রূপ নিতে পারে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার বড় অংশ কর্মক্ষম তরুণ। অথচ শিক্ষিত বেকারত্ব একটি বড় বাস্তবতা। তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টিই হবে রাষ্ট্রের প্রথম অগ্রাধিকার। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে বিনিয়োগ, গবেষণা ও উদ্ভাবনে প্রণোদনা—এসব উদ্যোগ তরুণদের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে। শিক্ষাঙ্গনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা সময়ের দাবি। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো হতে হবে জ্ঞানচর্চার স্বাধীন ক্ষেত্র, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু সহিংসতার স্থান থাকবে না। তরুণদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সম্পৃক্ত করা গেলে তারা কেবল দর্শক নয়, অংশীদার হবে। হতাশা নয়, সম্ভাবনাই হবে তাদের প্রেরণা।

প্রশাসন ও বিচার: প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির পুনর্গঠন : দশকব্যাপী অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে দলীয়করণ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে। প্রশাসনে ‘সার্ভিস রুলস’ কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। বদলি বা পদোন্নতিতে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, মেধা ও যোগ্যতাই হোক একমাত্র মানদণ্ড। সব সরকারি সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সহজতর করলে দুর্নীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতির জন্য পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের ওপর আস্থা ফিরে পাবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা মানে—রাজপথের বিচার নয়, আদালতের শ্রেষ্ঠত্ব নিশ্চিত করা।

জাতীয় ঐক্য: সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন : বিভাজনের রাজনীতি নয়, সমন্বয়ের রাজনীতি দরকার। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার মনোভাব নয়, গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সংসদে কার্যকর বিরোধীদল, গঠনমূলক সমালোচনা এবং সহনশীল আচরণই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। নেতৃত্ব মানে কেবল বক্তৃতা নয়; নেতৃত্ব মানে দিকনির্দেশনা। নেতৃত্ব মানে সংকটকালে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া, প্রয়োজনে আপস করা, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে আপসহীন থাকা। দেশনায়ক তারেক রহমান যদি সত্যিই নতুন বাংলাদেশের রূপকার হতে চান, তবে তাঁকে একটি সুস্পষ্ট ও সময়সীমাবদ্ধ রোডম্যাপ জাতির সামনে উপস্থাপন করতে হবে—অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংস্কার, প্রশাসনিক জবাবদিহি, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং শক্তিশালী জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে।

পররাষ্ট্রনীতি: কৌশলগত ভারসাম্যের পথ : আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এখন গুরুত্বপূর্ণ। “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”—এই নীতিকে বাস্তব কৌশলে রূপ দিতে হবে। বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কোনো একটি দেশের ওপর অতিনির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা নীতি ও আধুনিকায়ন—সবই জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। জাতীয় স্বার্থে আপসের সুযোগ নেই, তবে অপ্রয়োজনীয় বৈরিতাও কাম্য নয়।

দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য শিক্ষণীয় বার্তা : বিএনপির প্রতিটি স্তরের নেতাকর্মীদের মনে রাখতে হবে দল মানে দায়িত্ব। ক্ষমতা মানে সেবা। রাজনীতি মানে নৈতিকতা। যদি দলীয় পরিচয় দুর্নীতির ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, তবে জনগণের আস্থা মুহূর্তেই ভেঙে পড়বে। তাই সংস্কার শুরু হোক নিজ দল থেকে। শহীদ জিয়া শিখিয়েছেন শৃঙ্খলা, দেশমাতা খালেদা জিয়া শিখিয়েছেন সহনশীলতা, আর তারেক রহমান আহ্বান জানাচ্ছেন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের। এই তিন ধারার সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র।

ইতিহাসের রায় : ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কর্মই স্থায়ী। কেউ ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে ইতিহাসের আবর্জনায় নিক্ষিপ্ত হন, আবার কেউ সৎ ও নিবেদিত কর্মের মাধ্যমে সম্মানিত হয়ে থাকেন।

আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের ইতিহাস। জনগণ তাদের আস্থা দিয়েছে। এখন সেই আস্থা রক্ষা করার সময়। অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন, ন্যায়বিচার, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল, মর্যাদাপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হবে প্রকৃত সাফল্য। বিজয় ছিল সূচনা। ইতিহাস রচিত হবে সেবার মাধ্যমে। দম্ভ নয়—সেবার মানসিকতাই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার মূলমন্ত্র।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

জুবাইয়া বিন্তে কবির