Image description

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান বলছেন, জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী অনেকের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা করা হয়েছে। মাসের পর মাস জামিন না দিয়ে আটকে রাখার ঘটনা ঘটছে। বিএনপির নেতৃত্বে গঠন হতে যাওয়া নতুন সরকারের এ ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ বিষয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন তুলেছে। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এতে উন্নতি হবে না। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় নির্বাচনকে হয়তো পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলক বলা যাবে না, কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ এ বাস্তবতা মেনে নিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক শিক্ষক রওনক জাহান বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি একাই ২০৯টি আসন পাওয়ার (আরও দুটি আসনে বিএনপি বেসরকারিভাবে জিতেছে, তবে আদালতের নিষেধাজ্ঞায় নির্বাচন কমিশন ফল প্রকাশ করেনি) বিষয়টি অনেকের কাছে অবাক করার মতো। কারণ, ভোটের আগে জামায়াতের উত্থান অনেক বেশি হবে বলে মনে করা হচ্ছিল। জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করার মতো অবস্থানে যেতে না পারলেও তাদের ফল ভালো হয়েছে।

তিনি বলেন, জামায়াত এর আগে কখনোই ১৮টির বেশি আসন পায়নি। এবার পেয়েছে ৬৮টি। অতীতে তারা দেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ভালো করত। এবার নতুন কিছু অঞ্চলে জামায়াত শক্তিশালী অবস্থান জানান দিয়েছে। তার মধ্যে একটি রাজধানী ঢাকা। সব মিলিয়ে বলা যায়, জামায়াত একটি বড় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। ১৮ মাস ধরে অনেক ‘মব সহিংসতার’ মধ্যে মানুষ ধরে নিয়েছিলেন, স্থিতিশীলতার স্বার্থে নির্বাচিত সরকার দরকার।

দৈনিক প্রথম আলোতে 'জয়ীরা সব নিয়ে নেবে, এই চর্চা যেন না থাকে' শিরোনামে প্রকাশিত এক উপসম্পাদকীয়তে রওনক জাহান এসব কথা বলেন। তার লেখাটি আজ শনিবার (১৪ই ফেব্রুয়ারি) প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে তিনি বলেন, গঠন হতে যাওয়া নতুন বিএনপির সরকারকেও মানুষের প্রত্যাশার চাপে পড়তে হবে।

গত ৩০শে ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে এক আলোচনায় কি-নোট স্পিকার হিসেবে অংশ নিয়ে রওনক জাহান বলেন, নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা কোনো সমাধান নয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে উন্মুক্তভাবে প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত। মধ্য বামপন্থী মানুষদের প্রতিনিধিত্ব কীভাবে হবে, এটা এখন একটা প্রশ্ন।

ওই আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে গণতান্ত্রিক উত্তরণের যে প্রক্রিয়া চলছে, সেখানে অনেক বেশি অনিশ্চয়তা রয়েছে। বাংলাদেশ হওয়ার পর আমরা অন্তত তিনটি ট্রানজিশন পিরিয়ড (উত্তরণকাল) দেখেছি। এগুলো হলো ১৯৯০, ২০০৮ ও ২০২৪। কিন্তু গণতন্ত্রকে কনসলিডেট (সংহত) করার ক্ষেত্রে আমাদের রেকর্ড অসাধারণ নয়। এমনকি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতারাও অল্প সময়ের মধ্যেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠেন। এমন নয় যে এটা শুধু গত ১৬ বছরেই ঘটেছে; বরং আমাদের দেশের শুরু থেকেই এটা ঘটেছে।

বর্তমানে যে গণতান্ত্রিক উত্তরণের আশা করা হচ্ছে, সেখানে অনিশ্চয়তার কারণগুলো উল্লেখ করেন রওনক জাহান। তার মতে, মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো ভালোভাবে সংগঠিত নয়। একটি প্রধান দল আওয়ামী লীগ এ মুহূর্তে বাইরে আছে। ১৬ বছর রাজনৈতিক নিপীড়ন মোকাবিলা করা বিএনপিও সেভাবে সংগঠিত নয়। ফলে গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়াটিতে অনেক বেশি অনিশ্চয়তা রয়েছে। এটা মানুষের মধ্যে অনেক উদ্বেগও তৈরি করছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো রওনক জাহান আজ শনিবারের প্রথম আলোর উপসম্পাদকীয়তে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কিংবা রিকনসিলিয়েশন কমিশন করবে। তারা যেন এ বিষয়ে মনোযোগ দেয়। প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করা এবং সবাইকে নিয়ে চলার জন্য এই কমিশন দরকার। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অনেকের বিরুদ্ধে ঢালাও মামলা করা হয়েছে। মাসের পর মাস জামিন না দিয়ে আটকে রাখার ঘটনা ঘটছে।

তিনি লেখেন, এ ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ বিষয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন তুলেছে। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এতে উন্নতি হবে না এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী যে নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেখানে সবার মানবাধিকার নিশ্চিত করা দরকার।

তিনি বলেন, জামায়াতের প্রতি প্রত্যাশা হলো, তারা সংসদে এবং সংসদীয় কমিটিগুলোতে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবে। কথায় কথায় রাজপথে নেমে সরকার ফেলে দেওয়ার হুমকির বদলে তারা গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে এবং সংসদকে কার্যকর করবে।

সবশেষে তিনি বলেন, নতুন সরকারকে সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে জোর দিতে হবে। কারণ, এটা গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। সংগঠন করার স্বাধীনতা, সমালোচনার স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সহনশীলতা (টলারেন্স) ছাড়া গণতন্ত্র টেকে না, টেকানো যায় না।