যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর গত ডিসেম্বরে দেশে ফেরেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে যাচ্ছে বলে সরকারি গেজেটে ইঙ্গিত মিলেছে, যা তাঁকে দেশের সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছে। কিন্ত তারেক রহমানের এই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যাত্রা খুব নিষ্কণ্টক হবেনা। মার্কিন গণমাধ্যম টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্লেষণে নতুন সরকারের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের কথা উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি আগের সরকারের আমলে গুমের অভিযোগ দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এসব প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা, সিভিল সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর জনআস্থা পুনর্গঠন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। অতীতে ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসার পর সহিংসতার অভিজ্ঞতাও সামনে রয়েছে। এ অবস্থায় প্রতিহিংসা এড়িয়ে জাতীয় ঐক্যের ওপর জোর দিচ্ছেন তারেক রহমান।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ তৈরি করেছে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও যুব বেকারত্ব ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে রয়েছে। প্রায় চার কোটির বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যে বসবাস করছে। নির্বাচনী প্রচারে নারীদের ভাতা ও অভাবী পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি, যদিও এর অর্থায়ন নিয়ে প্রশ্ন আছে। পাশাপাশি ডিজিটাল অর্থনীতিতে তরুণ উদ্যোক্তাদের যুক্ত করা, ব্যাংকিং খাত উদারীকরণ এবং বিদেশগামী শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হলেও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক শুল্ক কমানোর সাম্প্রতিক সমঝোতাকে অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদিও বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে আরও আলোচনা চালিয়ে যেতে চায় বিএনপি।
নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যদিও বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় সরকার পরিচালনায় ইসলামপন্থিদের প্রভাব সীমিত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৃহত্তর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সব দলের ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন তারেক রহমান।
এদিকে ছাত্ররাজনীতিতে বিভাজন ও হতাশা বাড়ছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টি–র সঙ্গে জোট রাজনীতি এবং সংস্কার প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বিকল্প তৈরির দাবি এখনও প্রবল। এই প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র পুনর্গঠন এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ থাকার অঙ্গীকার করেছেন তারেক রহমান।