দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোট গ্রহণের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। শেষ মুহূর্তের কাজও এগিয়ে চলছে দ্রুতগতিতে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাও নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন কয়েকজন। স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে ভোট প্রার্থনা করতে যাচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। নানামুখী আলোচনা-সমালোচনার ভেতর দিয়ে সভা-সমাবেশ করছেন তারা। দেশের অনেক জায়গায় নিজ নিজ দলের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে দলীয় প্রধানরাও সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন। যেখান থেকে চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। যা বেশ উত্তাপ ছড়াচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মারামারি, হানাহানির ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। এতে নেতাকর্মীর মৃত্যুও হয়েছে। ফলে এসব জায়গায় দিন দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। অনেক ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে ততই এসব জায়গায় ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। অনেক দলের পক্ষ থেকে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। মানুষের মনে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করছে। এ ধরনের অস্থিরতা নির্বাচনী সুষ্ঠু পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। তাই ভোটকেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে এখনি নির্বাচন কমিশনকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেশের যেসব আসনে ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে। গণতান্ত্রিক পরিবেশে ভোটাররা যেন তাদের পছন্দমতো প্রার্থীদের নির্ভয়ে ভোট দিতে পারে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সেই ব্যবস্থা করে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র রক্ষার এ নির্বাচন যেন কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। পেশিশক্তি বা আধিপত্য বিস্তারকারীদের বিরুদ্ধে গ্রহণ করতে হবে জিরো টলারেন্স নীতি।
এক সময় এদেশের মানুষ ভোটকে উৎসব হিসেবে মনে করতো। সময়ের পরিবর্তনে সেই জায়গা অনেকটা ম্লান হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে এ দেশে ভোট নিয়ে মানুষের মাতামাতি করতে দেখা যায়নি। ক্ষমতাচ্যুত আ. লীগ সরকারের আমলে বেশকিছু পাতানো ভোট মানুষের এই আগ্রহের জায়গাটা নষ্ট করে দিয়েছিল। মানুষের মনে সেই আগের মতো স্বতঃস্ফূর্ত আমেজ বহুদিন ধরে লক্ষ্য করা যায়নি। তবে সর্বশেষ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানুষের মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। স্বাধীন মতো সভা-সমাবেশ করতে পারায় নির্বাচনী একটি আমেজ বিরাজ করছে দেশজুড়ে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই নির্বাচনী উৎসব যাতে আর কখনো হারিয়ে না যায় জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন সারাদেশে মোট ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করেছে। এরমধ্যে ৮ হাজার ৭৪৬টি ভোটকেন্দ্রকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। সবথেকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র চিহ্নিত হয়েছে রাজধানীতে। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় প্রায় সাড়ে ২৬ শতাংশ ভোটকেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া সারাদেশের অনান্য বিভাগেও এ তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। যেখানে প্রতিটি আসনেই কম-বেশি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক আধিপত্য এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে উত্তেজনার মাত্রার ওপর নির্ভর করেই মূলত এসব ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনিটরিং এবং ভোটকেন্দ্রের সার্বিক পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে নির্বাচন কমিশনকে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। এরজন্য সরকারের সহযোগিতা আরও বেশি প্রয়োজন।
অবশ্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিরাপত্তার স্বার্থে নতুন নতুন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যা নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে অনেকটা আশার আলো দেখাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। যেহেতু বড় অংকের একটি বরাদ্দ দিয়ে এ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে; সেহেতু এগুলো যেন ঠিকমতো নির্বাচন পূর্ববর্তী এবং নির্বাচনের দিন ভোট গ্রহণ শুরু থেকে ভোট গণনা শেষ হওয়া পর্যন্ত ঠিকমতো কাজ করে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ইউনিফর্মে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যা নিরাপত্তায় আরও বেশি কাজ দেবে বলে আশা করা যায়। এছাড়া উপকূলীয় ও দুর্গম এলাকার কেন্দ্রগুলোতে কোস্টগার্ড ও বিজিবি ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি করবে। এগুলো ঠিকমতো করতে পারলে ভোটকেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। নির্বাচনী দায়িত্বে যে সকল পুলিশ ও আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবে, তারা যেন দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আরও বেশি খেয়াল রাখতে হবে। ঝুঁঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের জন্য সবসময় মোবাইল টিম প্রস্তুত রাখতে হবে। নির্বাচনের আগে থেকেই এসব কেন্দ্রে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অস্ত্রের মহড়া ও ব্যবহার যাতে না হয়, সে দিকেও তাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। জুলাই বিপ্লবের সময় খোয়া যাওয়া অস্ত্র সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের অন্যতম অন্তরায় হিসেবে কাজ করতে পারে। তাই নির্বাচনকালীন সহিংসতা রোধে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর দেশব্যাপী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। নির্বাচন পূর্ববর্তী সহিংসতাগুলো কঠোরভাবে দমন করা না গেলে নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রগুলোতে সহিংসতা আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে। এতে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। সব মিলিয়ে রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের বিভাগীয় শহর এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে এবং নিরাপদে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সেই ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার বিকল্প নেই।
লেখক : রিয়াদ হোসেন