আজকের লেখাটি দীর্ঘ হবে আগাম জানিয়ে পাঠকদের কাছেও আগাম ক্ষমা চেয়ে রাখছি। ডিসেম্বরের ১৮ তারিখ রাত ৯টায় সিঙ্গাপুর থেকে টেলিফোনে ওসমান হাদির মৃত্যুসংবাদ জানিয়েছিলেন ওর বড় ভাই ওমর বিন হাদি। সেই শোকের সংবাদ পেয়ে আমার তাৎক্ষণিকভাবে মনে হয়েছিল এর প্রতিক্রিয়ায় জনগণ আবেগতাড়িত হয়ে বিশৃঙ্খল ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এই আশঙ্কা নিয়ে সরকারের উপদেষ্টা মোস্তফা ফারুকীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা হলো। আমি তখন পত্রিকা অফিস থেকে বাসায় ফিরে গিয়েছি।
গুলশান থেকে আবার কারওয়ান বাজারের অফিসে ফিরতে সময় লাগত। তাছাড়া আমার গাড়ির চালকও নিজ বাড়িতে চলে গিয়েছিল। বুড়ো বয়সে অত রাতে একেবারে একা গাড়ি চালানো নিরাপদ নয়। তাই বাসা থেকেই সহকর্মী আলফাজ আনামের কাছে ফোন করে দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছিলাম। সেই বক্তব্য আমার দেশ অনলাইনে রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে আপলোড করা হয়েছিল। আমার কথায় অবশ্য তেমন কোনো কাজ হয়নি। কিছু মূর্খ, অতি উৎসাহী ব্যক্তির উসকানিতে সুযোগসন্ধানীরা তাদের দুষ্কর্মের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে বিপদে ফেলেছে।
রাত ১টার দিকে খবর পেলাম প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার আক্রান্ত হয়েছে। মাত্র শ-দুয়েক অপরাধপ্রবণ ব্যক্তির এই চরম নিন্দনীয় হঠকারী আচরণ শহীদ ওসমান হাদির ন্যায্য সংগ্রামের ভয়ানক অবমাননা বলেই আমি মনে করি। এই মূর্খরা তাদের হঠকারিতার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ে হাদির অবিস্মরণীয় বিজয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সরকার কেন এই আক্রমণ থামাতে পারেনি সে-ও এক রহস্য।
সেই রাতে বেশ কয়েকজন উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলে একজন সম্পাদক এবং নাগরিক হিসেবে আমার বিরক্তি ও হতাশার কথা তাদের বলেছিলাম। ভূরাজনীতি সম্পর্কে অসচেতন শ্রেণির অমার্জনীয় অবিমৃশ্যকারিতা জুলাই বিপ্লবের পর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের ভারতপন্থি ও ইসলামবিদ্বেষীদের ফ্যাসিস্ট জামানার বয়ান নিয়ে জনসমক্ষে হাজির হওয়ার মোক্ষম সুযোগ করে দিয়েছে। জনরোষের আতঙ্কে এরা এতদিন আড়ালে আবডালেই ছিল। জালিমের সেই সব সহযোগী এখন মজলুমের চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে।
দাবি করা হচ্ছে, বাংলাদেশে গণমাধ্যমের ওপর এমন আক্রমণ এর আগে নাকি কখনো ঘটেনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ভুয়া দাবি প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় জনমতের চাপে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম তার পত্রিকায় ভুল স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। অবশ্য মাহফুজ আনাম এ-জাতীয় ভুল স্বীকার আগেও করেছেন। এক-এগারো সরকারের সময় ডিজিএফআই সরবরাহকৃত মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের জন্য তার প্রিয় নেত্রী, দানব গণহত্যাকারী, শেখ হাসিনার কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, সেই সময় প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার প্রধানত বিএনপি এবং জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালালেও মাহফুজ আনাম আজ পর্যন্ত তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করেননি।
উলটো প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান সম্প্রতি বিএনপির এক অনুষ্ঠানে গিয়ে তাদের তখনকার বিএনপিবিরোধী সংবাদ প্রচারকে যথাযথ দাবি করে এসেছেন। দলটির নেতারাও মতিউর রহমানের বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ করেছেন বলে আমার জানা নেই। অথচ একই ব্যক্তি ইসলাম ধর্মে আঘাত করার অপরাধে এক-এগারোর জামানায় বায়তুল মোকাররমের খতিব মরহুম উবায়দুল হকের কাছে উপস্থিত হয়ে হাঁটু স্পর্শ করে মাফ চেয়েছিলেন। বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে এসব সুশীলের ক্ষমা চাওয়া এবং ফণা তোলার সিলসিলা দেখে আসছেন। যা-ই হোক, প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারে নিন্দনীয় হামলার ঘটনা নিয়ে মাহফুজ আনামের প্রচারণা যে সম্পূর্ণ মিথ্যা, সেটা প্রমাণের জন্য খানিকটা অতীত ঘাঁটা দরকার।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ৫৪ বছরে প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারে হামলার আগে গণমাধ্যম আক্রান্ত হওয়ার এক ডজন ঘটনার অতি সংক্ষিপ্ত বিবরণী পাঠকদের অবগতির জন্য নিচে দিলাম :
১. ১৯৭২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক মওলানা ভাসানীর সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘হক কথা’ নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং সম্পাদক ইরফানুল বারীকে গ্রেপ্তার।
২. ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ মুজিববাদী সন্ত্রাসী এবং রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকার ছাপাখানা আক্রমণ, ধ্বংসসাধন, ড. আফতাবকে শারীরিক আক্রমণ এবং সম্পাদক কবি আল মাহমুদকে তার বাসা থেকে গ্রেপ্তার।
৩. ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় বাকশাল সরকারের চারটি সরকারি মুখপত্র ছাড়া সব মিডিয়া নিষিদ্ধের নির্দেশ।
৪. ১৯৮৮ সালে জেনারেল এরশাদ কর্তৃক সাপ্তাহিক যায়যায়দিন বন্ধ ঘোষণা, সম্পাদক শফিক রেহমানকে দেশ থেকে বহিষ্কার এবং বিবিসির তৎকালীন সংবাদদাতা আতাউস সামাদকে গ্রেপ্তার।
৫. ২০১০ সালের ১ জুন আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ, শত শত পুলিশ ও র্যাব সদস্য দিয়ে পত্রিকা অফিস ভাঙচুর এবং সম্পাদককে গ্রেপ্তার।
৬. ২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের নেতাদের নির্দেশে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে সন্ত্রাসীদের নয়া দিগন্ত পত্রিকায় হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং লুটপাট।
৭. ২০১৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি একই শাহবাগিদের নির্দেশে আমার দেশ চট্টগ্রাম অফিসে পুলিশ পাহারায় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের আক্রমণ, ভাঙচুর, লুটপাট এবং সাংবাদিকদের নির্যাতন।
৮. ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল আমার দেশ-এর ছাপাখানা এবং অফিসে পুলিশ ও র্যাবের অভিযান, সম্পাদককে গ্রেপ্তার, প্রেসের যন্ত্রপাতি ও মালামাল ধ্বংস এবং লুটপাট।
৯. ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা গণহত্যার সংবাদ প্রচারের অপরাধে দিগন্ত টেলিভিশন এবং ইসলামিক টেলিভিশনের সম্প্রচার ফ্যাসিস্ট সরকার কর্তৃক বন্ধ।
১০. ২০১৪ সালের ৩১ অক্টোবর আমার দেশ অফিসে এক রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডে সব কমপিউটার, সার্ভার এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি ভস্মীভূত। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দাবি করেছিল যে, আমার দেশ কর্তৃপক্ষই নাকি ইন্স্যুরেন্সের টাকা পাওয়ার জন্য নিজেরাই অফিসে আগুন দিয়েছিল। কিন্তু আমার দেশ অফিসের যে কোনো ইন্স্যুরেন্সই ছিল না সেটা ফ্যাসিস্ট লুটেরারা জানত না। সেই রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডে সবকিছু পুড়ে যাওয়ার সময় আমি জেলে বন্দি ছিলাম।
১১. ২০১৮ সালের ২২ জুলাই কুষ্টিয়ার আদালতে মামলার হাজিরা দিতে গিয়ে পুলিশের যোগসাজশে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলায় আমি শুধু আহতই হইনি, ন্যূনতম চিকিৎসাও আমার ভাগ্যে জোটেনি। এখন অবশ্য আরেকটি বড় দলের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকটিভিস্টদের কাছ থেকে একই পরিণতির হুমকি পাচ্ছি।
১২. ২০১৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর দৈনিক সংগ্রাম অফিসে পুলিশ প্রহরায় আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের হামলা এবং দেশের সবচেয়ে প্রবীণ সম্পাদক আবুল আসাদকে শারীরিকভাবে হামলা ও গ্রেপ্তার।
এ দেশের সুশীলরা সব সরকারের আমলে বিশেষ আনুকূল্য পেয়ে থাকেন। প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারে ন্যক্কারজনক হামলার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বৃহস্পতিবার রাতের ব্যর্থতার পর সরকার অপরাধীদের ধরতে উদ্যোগী হয়েছে। বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন অপরাধী ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারও হয়েছে। অন্যদিকে সুশীল সমাজের সব চিহ্নিত রথী-মহারথী প্রত্যাশা অনুযায়ী একজোট হয়েছেন। এদের সঙ্গে বিদেশি কূটনৈতিক মহলের বরাবরই বিশেষ প্রীতির সম্পর্ক।
পশ্চিমা বিশ্বের বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রদূত পত্রিকা অফিসে এসে সহমর্মিতা জানিয়েছেন। যে দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা সুশীলদের পাশে অধিক মাত্রায় দৃশ্যমান হচ্ছেন, সেসব দেশের ইসলামোফোবিয়ার ইতিহাস রয়েছে। ইউরোপের একটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত তো রীতিমতো ফ্যাসিস্ট সরকারের ‘ফ্রেন্ড, ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড’-এর ভূমিকা পালন করে বিপ্লবের পর বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিয়েছেন। এই বিশেষ দেশগুলোর কূটনীতিকদের কাছে বাংলাদেশে প্রথম আলো গোষ্ঠী ছাড়া আর কোনো মিডিয়ার কোনো ধরনের অধিকার নেই।
পত্রিকা দুটির বিশাল রাজনৈতিক সমর্থনও চোখে পড়ার মতো। বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি, তাদের মহাসচিবকে একাধিক প্রতিবাদ অনুষ্ঠানে পাঠিয়ে সমর্থন ব্যক্ত করেছে। সেসব প্রতিবাদ সভায় বিএনপি মহাসচিব জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন। প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারের অতীতের কার্যক্রম বিবেচনা করলে বিএনপির এই উদারতা ও মহত্ত্ব একাধারে বিস্ময়কর এবং প্রশংসনীয়। তরুণ জুলাই বিপ্লবীদের রাজনৈতিক দল, এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলামসহ কয়েকজন নেতা মতিউর রহমানদের পক্ষে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন।
অধিকাংশ বাম ঘরানার দল বরাবরের মতোই সমগোত্রীয় প্রথম আলোর পাশে দাঁড়িয়েছে। অন্যান্য ছোটখাটো দলও পত্রিকায় হামলার নিন্দা করতে কোনো কার্পণ্য করেনি। প্রথম আলো সমর্থক ইউটিউবার এবং সোশ্যাল মিডিয়ার লোকজন হামলার জন্য ইসলামপন্থিদের সরাসরি এবং জামায়াতে ইসলামীকে পরোক্ষভাবে দায়ী করায় ধারণা করছি, এই দলটির পক্ষে পত্রিকা অফিসে গিয়ে সহমর্মিতা জানানোর সুযোগ ছিল না। কিন্তু, তারাও আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যক্কারজনক ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। অর্থাৎ, বাম ও ডানের সব রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। দলমত-নির্বিশেষে সাংবাদিক শ্রেণিও অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে মিডিয়ার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে। বাংলাদেশের মিডিয়ার ব্রাহ্মণরাই একমাত্র এই ধরনের ঈর্ষণীয় সৌভাগ্য নিয়ে জন্মেছেন।
আমাদের মতো নমশূদ্র মিডিয়ার শুধু মহান আল্লাহতায়ালার অপার করুণার ওপর ভরসা করে সব আমলেই একাকী নিঃসঙ্গ লড়াই করে যেতে হয়। সেদিন দেশের এক স্বনামধন্য সম্পাদক আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে আমি, নমশূদ্র থেকে ব্রাহ্মণে প্রমোশন চাই কি না। প্রস্তাব করলে তারা নাকি বিবেচনা করবেন। আমি তাকে জানিয়ে দিয়েছি, যতদিন আমার নেতৃত্বে আমার দেশ চলবে, ততদিন পত্রিকাটি দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ, খেটে খাওয়া মানুষের কণ্ঠস্বর হয়েই থাকবে। মিডিয়ায় প্রবেশের পর থেকে ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে যে লড়াই শুরু করেছি, সেটি চলমান থাকবে। বাঙালি মুসলমানের অধিকার এবং দেশের স্বাধীনতা আমার কাছে সবার ওপরে। আমি আদর্শ অনুসরণ করি, কোনো দলকে নয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন প্রকার মেরূকরণ দেখতে পাচ্ছি। আজ পর্যন্ত সর্ববিচারে, প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রনায়ক, শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপিকে যে সুশীল গোষ্ঠী সর্বদা দক্ষিণপন্থি এবং ক্যান্টনমেন্টে সৃষ্ট বলে নেতিবাচকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তারাই এখন দিল্লি থেকে আপা ও নেত্রীর প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় সাময়িকভাবে বিএনপির কাঁধে নিরাপত্তার জন্য সওয়ার হয়েছেন। কবির সুমনের গান গেয়ে যারা মৃত্যুর পরেও আকুলভাবে আপাকে চেয়েছিলেন, অপ্রত্যাশিতভাবে আপা কোনো দিন সত্যিই ফিরলে তার কোলে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য এরা অপেক্ষায় থাকবেন। গ্রামের সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা আবু সাঈদ ও ওসমান হাদিদের ফ্যাসিবাদ এবং আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বাধীনতার আইকনে পরিণত হওয়াকে ব্রাহ্মণ সুশীল শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো কিছুতেই যেন মেনে নিতে পারছে না।
পাদটীকা : বিএনপির এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং দলটির বাম ও শাহবাগি ঘরানার ‘থিংক ট্যাংকের’ এক প্রভাবশালী সদস্য প্রথম আলোতে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আমার দেশকে দায়ী করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তাদের সমর্থক কেউ কেউ বিষয়টিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলছেন। কারো বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে যে পড়ে, সেটি আমার জানা ছিল না। তাহলে তো শফিক রেহমান এবং আমার বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার পুত্রকে আমেরিকায় অপহরণ ও হত্যার ষড়যন্ত্রের নির্লজ্জ মিথ্যা অভিযোগও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল। প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারে বেগম জিয়া ও তারেক রহমানসহ বিএনপির ডজন ডজন নেতার বিরুদ্ধে প্রকাশিত কল্পকাহিনিও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল।
পত্রিকার প্রচারে আলেমদের জঙ্গি বানিয়ে গুমযোগ্য করে তোলাও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল। জুলাইযোদ্ধাদের সন্ত্রাসী আখ্যা দেওয়াও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ছিল। বাংলাদেশের আইনে এমন মতপ্রকাশে স্বাধীনতা কাউকে দেওয়া হয়নি। কোনো ব্যক্তির সমালোচনার সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন তুলনীয় নয়। যাই হোক, আমরা গত সপ্তাহের রবিবার সেই নিন্দনীয় মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সিএমএম আদালতে যথাযথ আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। বর্তমান সরকারের উপদেষ্টারাও অবগত আছেন যে ওই রাতের উচ্ছৃঙ্খলতায় আমি কতখানি ক্ষুব্ধ ছিলাম এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কতটা কাজ করেছি। তাদের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সময়মতো আদালতেও অনুরোধ জানাব।
মামলায় একজন অভিযুক্ত নাকি দাবি করেছেন, তিনি আমার মালয়েশিয়ায় বছরখানেক নির্বাসনকালে কাগজপত্র পেতে সাহায্য করেছিলেন। খবরটি জেনে বিস্মিত হয়েছি। প্রকৃত ঘটনা হলো, মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে এক তরুণ গাঁটের পয়সা খরচ করে আমাকে দেখতে গিয়েছিলেন। তিনি তখন কুয়ালালামপুরে তার জেলার একজন ম্যানপাওয়ার ব্যবসায়ীর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তারা বোধ হয় গ্রাম সম্পর্কের আত্মীয়। প্রাথমিকভাবে সেই ব্যবসায়ী আমাকে সাহায্য করেছিলেন। সাহায্যটা একতরফা ছিল না।
বাজারদরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি পারিশ্রমিক আমি তাকে দিয়েছিলাম। অবশ্য সেই কাগজপত্রের ওপর আমার মাত্র মাস দু-এক নির্ভর করতে হয়েছিল। এরপর আমি ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি কোর্সে ভর্তি হলে দেশটিতে অবস্থান-সংক্রান্ত সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। একই ব্যবসায়ী আমার করা মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিসহ অনেক বাংলাদেশিকেই কাগজ পেতে সহযোগিতা করে থাকেন। সেটা তার ব্যবসা। কেউ কেউ সেই উপকার হয়তো কোনো প্রতিদান ছাড়া গ্রহণ করে থাকতে পারেন। কিন্তু, আমার ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন ছিল। পরিচিতরা জানেন যে, ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ আলোচনা করার মতো নিম্ন রুচি আমার নেই।
আমি কঠিন সমালোচনা করলেও কখনো শালীনতার সীমা অতিক্রম করি না। নইলে অভিযুক্ত ব্যক্তিটি যে দলের আশ্রয়ে বর্তমানে আছেন, সেই দলের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা যারা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সরকারি চেয়ারে বসার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের অনেকেরই উদ্বিগ্ন বোধ করার কথা ছিল। বিশ্বস্ত সূত্রে আরো জেনেছি, সুশীল-কুশীলবরাও তাদের দিল্লির প্রভুর পরামর্শ অনুযায়ী আমার দেশ-এর বিরুদ্ধে সংগোপনে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত করছেন। তারা দেশি-বিদেশি মহলের সঙ্গে নানা রকম শলাপরামর্শ করছেন। এসব ইসলামোফোবিক, দেশবিরোধীদের মোকাবিলা করতে আমরা সদা প্রস্তুত থাকি। তাদের সবার অপকর্মের প্রমাণও একে একে সংগ্রহ করা হচ্ছে। ভারতপন্থিরা হয়তো আওয়ামী ফ্যাসিবাদ ও ভারতীয় হেজেমনির বিরুদ্ধে আমার দেশ-এর দীর্ঘ সংগ্রামের কথা বিস্মৃত হয়েছেন।