দেশের উচ্চশিক্ষা দেখভাল করা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ( ইউজিসি ) বিলুপ্ত হচ্ছে । এর বদলে ‘ বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন ' গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার । এই কমিশন উপযুক্ত মানদণ্ড ঠিক করে ওই মানদণ্ডের ভিত্তিতে তিন বছর পরপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাঙ্কিং প্রকাশ করবে । কমিশনের ক্ষমতা চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদমর্যাদা বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে খসড়ায় ।
বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন অধ্যাদেশ , ২০২৫ - এর খসড়া থেকে এসব তথ্য জানা গেছে । শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ গত বছরের ১০ ডিসেম্বর খসড়া অধ্যাদেশ প্রকাশ করে । পরবর্তী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে মতামত দেওয়ার জন্য খসড়াটি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে ।
খসড়া অধ্যাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিং নির্ধারণের বিষয়ে বলা হয়েছে , বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাঙ্কিং নির্ধারণের জন্য উপযুক্ত মানদণ্ড নিরূপণ করবে কমিশন । একই সঙ্গে মানদণ্ডের ভিত্তিতে তিন বছর পরপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাঙ্কিং নির্ধারণ করে জনসমক্ষে প্রকাশ করবে । র্যাঙ্কিংয়ে নিচের সারিতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশেষ তদারকির আওতায় আনা হবে ।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ( ইউজিসি ) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ১৯৭৩ সালে । বর্তমানে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৬ টি ( কয়েকটির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়নি) । বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১১৬ টি । এর মধ্যে বিভিন্ন অভিযোগে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে ।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড . মো . সাইদুর রহমান বলেন , ' দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নে উচ্চশিক্ষা কমিশন প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে । আশা করছি , এই কমিশন হলে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নের কাজে গতি আসবে । ' খসড়া অধ্যাদেশে ইউজিসির তুলনায় উচ্চশিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদমর্যাদা বাড়ানো হয়েছে । কমিশনের চেয়ারম্যান মন্ত্রীর পদমর্যাদা এবং সে অনুযায়ী বেতন - ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ - সুবিধা পাবেন । চেয়ারম্যান কমিশনের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন । তাঁর অনুপস্থিতিতে জ্যেষ্ঠতম কমিশনার সাময়িকভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন । কমিশনের কমিশনারদের পদমর্যাদা হবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতির সমমানের । বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ওপরের পদে থাকবেন ।
খসড়া অনুযায়ী , উচ্চশিক্ষা কমিশন হবে একটি একক সংবিধিবদ্ধ সংস্থা ।
কমিশন স্থাবর ও অস্থাবর , উভয় ধরনের সম্পত্তি অর্জন , অধিকারে রাখা ও হস্তান্তর করতে পারবে । কমিশনের নিজস্ব পতাকা থাকবে । কমিশন স্বীয় নামে মামলা করতে পারবে এবং কমিশনের বিরুদ্ধেও মামলা করা যাবে । এই কমিশন প্রতিষ্ঠিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিলুপ্ত হবে এবং এর স্থলে বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন প্রতিষ্ঠিত হবে । কমিশনের প্রধান কার্যালয় থাকবে ঢাকায় । প্রয়োজনে বিভাগীয় পর্যায়ে আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপন করা যাবে । কমিশনের গঠন বিষয়ে খসড়া অধ্যাদেশে বলা হয়েছে , একজন চেয়ারম্যান , আটজন কমিশনার এবং ১০ জন খণ্ডকালীন সদস্য নিয়ে উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠিত হবে । চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিয়োগ পাবেন । খণ্ডকালীন সদস্য হবেন সরকার মনোনীত তিনজন — শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব , পরিকল্পনা কমিশনের একজন সদস্য এবং সচিব পদমর্যাদার নিচে নন অর্থ মন্ত্রণালয়ের এমন একজন প্রতিনিধি । এ ছাড়া কমিশন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ভিত্তিতে মনোনীত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের মধ্যে থেকে তিনজন , বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী সনদপ্রাপ্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের মধ্য থেকে দুজন এবং যেসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খণ্ডকালীন সদস্য মনোনীত হননি , সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রথিতযশা অধ্যাপকদের মধ্যে থেকে কমিশন মনোনীত দুজন অধ্যাপক থাকবেন । খসড়ায় বলা হয়েছে , সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নির্ধারিত শর্তে চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা চার বছর মেয়াদের জন্য নিয়োগ পাবেন । তাঁরা প্রত্যেকে দ্বিতীয় মেয়াদে পুনর্নিয়োগের পারবেন ।
জন্য বিবেচিত হতে চেয়ারম্যান হতে হলে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতিমান পিএইচডিধারী বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ হতে হবে । বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতার কমপক্ষে ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে , যার মধ্যে অধ্যাপক হিসেবে ন্যূনতম ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে ।
খসড়া অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে , একাডেমিক বিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন কার্যক্রম মূল্যায়ন এবং চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা নিরূপণের জন্য উচ্চশিক্ষা কমিশন যখন প্রয়োজন মনে করবে , তখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিদর্শন করবে । কমিশন যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব তলব ও মূল্যায়ন করতে পারবে । কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণ হলে কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কিংবা কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে তদন্ত করতে পারবে । কমিশনের কোনো সুপারিশ বা নির্দেশ যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে অনুসরণ ও প্রতিপালনে ব্যর্থ হয় , তাহলে কমিশন ওই ব্যর্থতার বিষয়টি বিবেচনা করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকূলে বরাদ্দকৃত অর্থছাড় স্থগিত করতে পারবে । দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড . হাফিজুর রহমান বলেন , ‘ কেন উচ্চশিক্ষা কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হবে , এ বিষয়টি আগে পরিষ্কার হতে হবে । কারণ , আমরা দেখছি বিভিন্ন কারণে বর্তমান ইউজিসি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছে না । আশা করছি , শক্তিশালী উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠিত হবে , যার মাধ্যমে দেশের উচ্চশিক্ষায় শৃঙ্খলা আসবে । '