Image description
চাহিদামতো মিলছে না ১২ কেজির সিলিন্ডার। একা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়: ভোক্তা-অধিকার অধিদপ্তর সরকার সময়মতো ব্যবস্থা নেয়নি: এলপিজি ব্যবসায়ীরা

সরকারিভাবে দাম বাড়ানোর পরও রাজধানীসহ দেশে বেসরকারি খাতের এলপিজি বাজারে নৈরাজ্য বন্ধ হয়নি। সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০-৭০০ টাকা বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। বরং দাম বাড়ানোর পর সরবরাহব্যবস্থার সংকট আরও বেড়েছে। অনেকেই দোকানে গিয়ে গ্যাস পাচ্ছেন না। বিক্রেতারা পূর্বপরিচিত বা নিয়মিত গ্রাহক ছাড়া সিলিন্ডার বিক্রি করছেন না। বাড়তি দামেও প্রয়োজন ও সময়মতো মিলছে না গ্যাস। এমন পরিস্থিতিতে বাজার নজরদারির দায়িত্বে থাকা জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের (ডিএনসিআরপি) ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর দক্ষিণ কমলাপুর আইসিডি গেটের বিপরীতে একটি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে সিলিন্ডারের দাম জানতে চাইলে দোকানদার সিলিন্ডার নেই বলে জানান। তবে এ সময় পাশের চায়ের দোকানদারের কাছে সিলিন্ডার বিক্রি করেন তিনি। এ নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে দোকানদার বলেন, এ জন্য আগে অর্ডার করা ছিল। নাম জানতে চাইলে জবাব না দিয়ে দোকান বন্ধ করে বেরিয়ে যান তিনি।

চায়ের দোকানদার আলতাব হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একটা সিলিন্ডার অনেক বলে-কয়ে পেয়েছি। দাম এখনো বলেনি। তবে আগেই বলে দিয়েছে, ২ হাজার টাকার কম হবে না।’

রাজধানীর সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজার- সংলগ্ন ফুটপাতের ভাতের হোটেলের মালিক আওলাদ হোসেন জানালেন, এক সপ্তাহ ধরেই তিনি ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় কিনছেন। শান্তিনগরের একটি দোকান থেকে তাঁকে সিলিন্ডার দিয়ে যায়। গতকাল সিলিন্ডার চাইলে বলা হয় নাই। আওলাদ হোসেন বলেন, পরে রাতে নিজে দোকানে গিয়ে অনেক অনুরোধ করে ১ হাজার ৮০০ টাকায় একটা সিলিন্ডার এনেছেন।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি পর্যায় থেকে ১২ কেজির গ্যাসের সিলিন্ডার বলতে গেলে পাওয়াই যাচ্ছে না। যা মিলছে তার জন্য বাড়তি দাম রাখা হচ্ছে।

সিলিন্ডারের বাজারে এমন নৈরাজ্য চলছে ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে। সরবরাহের সংকটের কথা বলে বাড়তি দাম নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বাজার স্থিতিশীল করতে সরকারি সংস্থা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ৪ জানুয়ারি এলপিজির দাম বাড়িয়েছে। ভোক্তাপর্যায়ে কেজিতে প্রায় সাড়ে ৪ টাকা বাড়িয়ে চলতি জানুয়ারি মাসের জন্য ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। এ দাম গত ডিসেম্বরের চেয়ে ৫৩ টাকা বেশি। এর আগে ডিসেম্বরেও দাম ৩৮ টাকা বাড়ানো হয়। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসে ১২ কেজিতে দাম বেড়েছে ৯২ টাকা। এরপরও বাড়তি দামের নৈরাজ্য বন্ধ করা যাচ্ছে না। পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা এ পরিস্থিতি তৈরি করেছেন বলে দাবি আমদানিকারক ও সিলিন্ডার উৎপাদকদের।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, উৎপাদন পর্যায়ে বাড়তি দামের কোনো প্রমাণ নেই। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং সংস্থাগুলোকে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা বলছেন উৎপাদন পর্যায়ে তাঁরা নির্ধারিত দামেই পরিবেশকের কাছে বিক্রি করছেন। খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামের বিষয়ে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালাচ্ছে।

এদিকে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ডিএনসিআরপি) বলেছে, দায়িত্ব শুধু একার তাদের নয়, সরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, জেলা প্রশাসন ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়েরও রয়েছে। সবার সমন্বয় না হওয়ার কারণে বাজারে এর প্রভাব পড়ছে কম।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফারুক আহম্মেদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। প্রতিদিনই বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালিয়ে অপরাধী ধরে জরিমানা করছি। বিক্রেতাদের সচেতন করতে প্রচারণা চালাচ্ছি। তবে এর জন্য বিইআরসি, মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসকদেরও কাজ করতে হবে। আমাদের যদি তারা ডাকে তবে আমরা যাই। কিন্তু তাদের ডাকলে আমরা পাই না। যথাযথ সমন্বয় না হলে এত বড় বাজার আমাদের সামান্য লোকবল দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সমন্বয় করার দায়িত্ব মূলত মন্ত্রণালয়ের।’

ডিএনসিআরপি সাম্প্রতিক তিন দিনের অভিযানের তথ্য দিয়ে বলছে, ৪ থেকে ৬ জানুয়ারি এই তিন দিনে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন বাজারে এলপিজির দাম বেশি রাখা, বিক্রয়ের রসিদ না রাখা, অযৌক্তিক মজুতসহ নানা অপরাধে ৩২টি প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক জরিমানা করা হয়।

এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সভাপতি ও ডেলটা এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘জাহাজের ভাড়া বৃদ্ধি, জাহাজের সংকটসহ নানা কারণে চাহিদামতো এলপিজি আমদানি হচ্ছে না। আমরা গত আগস্টেই চিঠি দিয়ে সংকটের কথা জানিয়েছি সরকারকে। লোয়াবের পক্ষ থেকে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে এলপিজি আমদানির পরিমাণ বাড়াতে এবং বিতরণ ইউনিট সম্প্রসারণের অনুমতির জন্য আবেদন করা হয়। তবে এ বিষয়ে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এখন তার প্রভাব পড়ছে।’