Image description

তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে বলতাম, “আমার সম্পাদক।” সাংবাদিকতা জীবনের একটা বড় সময় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে কাজ করার সুবাদে তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে একটু-আধটু জেনেছি। আগাগোড়া সাংবাদিক বলতে যা বোঝায়, তা-ই ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

হঠাৎ করে মৃত্যু সংবাদ শুনে মনে হলো, বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় আরও অনেকটা দিন তার দরকার ছিল। সাংবাদিকতাকে আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল। তবে তিনি যেটা দিয়ে গেছেন, তা কম নয়। একটি প্রতিষ্ঠানকে তিনি ‘সূত্র’ থেকে মুক্ত করেছিলেন।

খবরে সাংবাদিকরা প্রায়ই লেখেন, ‘সূত্র জানায়’। পুরো খবরে সংশ্লিষ্ট কারও বক্তব্য না দিয়ে খবর প্রকাশ অহরহ হচ্ছে। ‘সংশ্লিষ্ট সূত্র’, ‘দায়িত্বশীল সূত্র’, ‘গুরুত্বপূর্ণ সূত্র’–এসব শব্দ আকছারই লেখা হয়। তৌফিক ইমরোজ খালিদী দেশের প্রথম ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজের দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ‘সূত্র’ বাদ দিলেন। অর্থাৎ, কোন সূত্রে জানা গেছে, সেটা না লিখলে খবর প্রকাশ হবে না–নীতি ঠিক করলেন। সেই নীতিতে অবিচল ছিলেন। কারও বক্তব্য না থাকলে খবর ছাপা হতো না। কত খবর যে আমরা আগে দিতে পারিনি। রাগও হতো। ‘সূত্র জানায়’ লিখে বিডিনিউজ হাতেগোনা কিছু সংবাদ প্রকাশ করেছে। ২০ বছরের ৪০টি হবে কি না সন্দেহ! কিন্তু সেটার জন্য কতরকমের ফ্যাক্টচেকের মধ্যে যেতে হয়েছে, তা আমরা যারা কাজ করেছি তারা জানি। তবুও শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো বক্তব্যের জন্য। দিন শেষে দেখা যেত বিডিনিউজই ঠিক।

একটি সংবাদমাধ্যমকে পাঠকের কাছে আস্থাশীল জায়গায় বছরের পর বছর ধরে রাখার যে কাজ তৌফিক ভাই করেছেন, তা অতুলনীয়। আমি সবসময় সাংবাদিকতাকে সারাজীবন শেখার কাজ হিসেবে দেখি। মনে করি, সাংবাদিকতা একবারে শেখা যায় না। এটা নিয়ত ক্রিয়াশীল কাজ। শিখতে শিখতে এগোতে হয়। সেই শেখার একটা বড় স্কুল আমার কাছে ছিল বিডিনিউজ। আর সেই স্কুলের হেড মাস্টার ছিলেন সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

২০১৪ সালের দিকের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। দেশের বড় বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জমি দখলের নথি হাতে এল। নিউজ লিখলাম। সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য নিয়ে খবর লিখে নিউজ এডিটরকে জমা দিলাম। তৌফিক ভাই শুনলেন সেই নিউজের কথা। নিজে পড়লেন। জিজ্ঞেস করলেন, সব প্রমাণ আছে কি না। নিশ্চিত করলাম তাকে। নিউজ প্রকাশিত হলো। এর দুদিন পর রিপোর্টার্স মিটিং। এ কথা ও কথায় বললেন, যাদের নিয়ে নিউজ হয়েছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যে প্রতিষ্ঠান, তাদের কাছে বিডিনিউজ বিজ্ঞাপন বাবদ বড় অঙ্কের টাকা পায়। আদালত-সংশ্লিষ্ট একটা খবরে তাদের নাম থাকায় বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেয়। বাকি টাকা দেয়নি। দীর্ঘদিন পর আবার ব্যবসায়িক আলোচনা শুরু হয়েছিল। কিন্তু আমার করা নিউজের জন্য হয়তো সেটা আর এগোবে না। শুনে, আমি প্রতিবর্ত ক্রিয়া থেকেই বলে উঠেছিলাম, “আমি জানতাম না।”

শুনে তৌফিক ভাই ধমকে উঠলেন। বললেন, “তুমি রিপোর্টার। তোমার তো সেলস অ্যান্ড মার্কেটিংয়ের কথা জানার কথা নয়। এসব কথা যেন আর না শুনি। আমার প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টার নিউজ পেয়েছে। সেই নিউজে কোনো কমতি নেই। যথাযথ প্রমাণ আছে। সবার বক্তব্য আছে। কিছু টাকার জন্য যদি সেই নিউজ না প্রকাশ করি, তাহলে আমি তোমার কাছে কী জবাব দেব?” সেইদিন মনে মনে কথাটা বলেছিলাম, “আমার সম্পাদক।”

অন্য আরেকটি কথা মনে পড়ছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে কাজ করার জন্য কক্সবাজারে গিয়েছিলাম। সেখানে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে অন্য আরও কিছু খবর পাই। তার মধ্যে মাদক কারবার নিয়েও কিছু ঘটনা ছিল। রাজনীতিক, সরকারি কর্মচারী, সাংবাদিকসহ অনেকেই মাদক করবারে জড়িত বলে গোয়েন্দা সংস্থার কিছু তদন্ত প্রতিবেদন হাতে আসে। সেগুলো নিয়েও খবর প্রকাশ হয়। ঢাকায় ফেরার পর তৌফিক ভাই যখন শুনলেন, স্থানীয় সাংবাদিকরাও মাদক কারবারে জড়িত, তখন জানতে চাইলেন, এই নিউজটা আলাদা করে কেন করিনি? আমি বলেছিলাম, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নিউজ করব? স্পষ্ট করে বলেছিলেন, “নিজের ঘরে সমস্যা রেখে অন্যের সমস্যা নিয়ে কথা বলা কি ঠিক?” আমি আর কোনো কথা না বলে খবরটা লিখি।

আরও একটা কথা সবসময় মনে থাকবে। এক জায়গা থেকে একটি নিউজ পেলাম। সেটা সংক্রান্ত কাগজও পেলাম। কিন্তু নিউজটা আমি লিখলে একটি শক্তিশালী মহলের রোষাণলে পড়ার আশঙ্কা ছিল। তৌফিক ভাই সব শুনে বললেন, নিউজটা তিনি লিখবেন। তাই করলেন। লেখার পর আমাকে দিয়ে বললেন, প্রাথমিক সম্পাদনা যেন আমিই করি। শুনে আমি ইতস্তত করা শুরু করলে তিনি বললেন, “তোমাকেই করতে হবে। তুমি এনেছ। তুমিই পড়ো। দেখ আমি ঠিক লিখেছি কি না?” এরপরে আর কথা হয় না।

 

আওয়ামী লীগের আমলে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা হলো। তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হলো। সমস্যায় পড়ল বিডিনিউজ। আমরা কর্মীরা ঠিকমতো বেতন-ভাতা পাচ্ছিলাম না। তৌফিক ভাই চাইলেই ওই সময় আপস করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা করেননি। আইনি পথে সব মেকাবিলা করেছেন। আর আমাদের সাহস দিতেন। দেখতাম তখন, বেতন দেওয়ার জন্য কী পরিমাণ দুশ্চিন্তা তিনি করেছেন। কিন্তু সাংবাদিকতার নীতি থেকে এক বিন্দু সরেননি। সহকর্মীদের নিয়ে দিনের পর দিন কঠোর সংগ্রাম করেছেন। বার্তাকক্ষে এসে সাহসও দিয়েছেন সবসময়। ওই সময় তৌফিক ভাই একটা কথাই বলতেন, “কষ্ট করছি সবাইকে নিয়ে। দরকার হলে আরও করব। কিন্তু সাংবাদিকতা থেকে সরব না।”

বিডিনিউজ নিয়ে নানা সময় নানা কথা হতো। নানা ট্যাগ লাগানো হতো। তৌফিক ভাই জনসমক্ষে একটাই কথা বলতেন, “আমরা নিরপেক্ষ নই। আমাদের প্রচণ্ড পক্ষপাতিত্ব আছে, একাত্তরের প্রতি। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি।” বিডিনিউজ সবসময় সেই জায়গায় নিজেকে ধরে রেখেছে। সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি সবসময় একাত্তর নিয়ে সংবেদনশীল ছিল। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অবিচল আস্থা রাখা তৌফিক ইমরোজ খালিদী, সাংবাদিকদের তৌফিক ভাইকে অতল শ্রদ্ধা!

কাজী সাজিদুল হক: জ্যেষ্ঠ যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, চরচা