পশ্চিমা বিশ্ব প্রায়ই মনে করে, পৃথিবীর সবচেয়ে নৈতিক ও মহৎ সভ্যতা তারাই। কিন্তু বাস্তবে তারা নিজেদেরই এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনার মধ্যে আটকে রেখেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক সভাপতি কিশোর মাহবুবানি এমনটাই মনে করেন।
গাদ্দাফিকে হত্যার ঘটনা থেকে শুরু করে গাজায় নীরব থাকা এবং ইউক্রেনে পুতিনের আগ্রাসনের পেছনে আংশিকভাবে প্ররোচনা জুগিয়েছে এমন নীতিগত অবস্থান পর্যন্ত নানা কারণে পশ্চিমা বিশ্ব বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন ও আস্থা হারিয়েছে।
এই আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে পশ্চিমকে বেরিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় একসময় তারা এমন এক বিশ্বের প্রতি নির্দেশ জারি করে যাবে, যে বিশ্ব আর তাদের কথা শুনতেই প্রস্তুত নয়।
আমাদের পৃথিবী নানা বিভাজনে বিভক্ত। তবে সবচেয়ে বড় বিভাজনটি সম্ভবত পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বিশ্বের বাকি অংশের। বিশ্বের মাত্র ১২ শতাংশ মানুষ পশ্চিমে বাস করে। বাকি ৮৮ শতাংশ মানুষের বসবাস পশ্চিমের বাইরে।
পশ্চিমা বিশ্ব নিজের দিকে তাকালে যে ছবিটি দেখতে পায়, তা বেশ উজ্জ্বল। তাদের দৃষ্টিতে, তারাই পৃথিবীর সবচেয়ে মহৎ ও নৈতিক সভ্যতা। নিজেদের নাগরিকদের দেখভাল করার পাশাপাশি তারা উদারতা ও নিঃস্বার্থতার সঙ্গে গোটা পৃথিবীকে আরও সুন্দর করে তোলার চেষ্টা করে।
কিন্তু বিশ্বের বাকি অংশের চোখে পশ্চিমের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের কাছে পশ্চিম এমন এক সহিংস সভ্যতা, যারা যুদ্ধের ক্ষেত্রে খুব সহজেই অস্ত্রের আশ্রয় নেয়। সাম্প্রতিক কয়েক দশকে অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে অন্য যেকোনো সভ্যতার তুলনায় পশ্চিমই বেশি নিরপরাধ মানুষের প্রাণ কেড়েছে। তাহলে সত্যটা কোথায়?
দুঃখজনক হলেও সত্য, তথ্য-উপাত্তের সামনে এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর বিশ্ব আশা করেছিল, এবার শান্তির সুফল মিলবে। কিন্তু তার বদলে পশ্চিম একের পর এক সামরিক অভিযানে জড়িয়ে পড়েছে। আর সেসব অভিযানের পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের ‘কস্ট অব ওয়ার প্রজেক্ট’-এর হিসাব বলছে, ২০০১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৯/১১-পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে সরাসরি সহিংসতার শিকার হয়ে অন্তত ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। এর বাইরে যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাবে আরও ৩৬ থেকে ৩৮ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। রোগ, অপুষ্টি ও এ ধরনের অন্যান্য কারণে তাদের প্রাণ গেছে। এসব যুদ্ধের অনেকগুলোর সূচনা হয়েছিল পশ্চিমা বিশ্বের হাত ধরে।
মজার বিষয় হলো, যে সভ্যতা বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও আত্মসমালোচনাকে এত গুরুত্ব দেয় বলে দাবি করে, সেই পশ্চিমেই একের পর এক হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে তারা কীভাবে এবং কেন এতটা ভুল পথে গেল, তা নিয়ে খুব একটা আত্মসমালোচনা দেখা যায় না।
আফগানিস্তানে পশ্চিমা হস্তক্ষেপের শুরুটা অবশ্য আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে বৈধ ও যুক্তিসংগত ছিল। ২০০১ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৩৮৬ নম্বর প্রস্তাবের ভিত্তিতেই এই হস্তক্ষেপের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। আল-কায়েদার সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়া তালেবান সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর অবশ্য আফগানিস্তান থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসবে, সে বিষয়ে পশ্চিমের কোনো সুস্পষ্ট কৌশল ছিল না।
ফলে তারা আফগানিস্তানে থেকে গেল আরও ২০ বছর। শেষ পর্যন্ত যে তালেবান সরকারের হাত থেকে আফগান জনগণকে মুক্ত করার কথা বলে এই অভিযান শুরু হয়েছিল, দুই দশক পর সেই জনগণকেই আবার তালেবান সরকারের অধীনে ফিরিয়ে দিয়ে পশ্চিম সেখান থেকে চলে গেল। এই ২০ বছরে যুদ্ধে নিহত পশ্চিমা ও অন্যান্য দেশের সৈন্যদের কথা বাদ দিলেও এক লাখের বেশি আফগান বেসামরিক মানুষ নিহত বা আহত হয়েছে। অথচ এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের জন্য পশ্চিমে কাউকেই জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়নি।
আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপের বিপরীতে ২০০৩ সালের মার্চে ইরাকে যে আক্রমণ চালানো হয়েছিল, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে তা ছিল অবৈধ। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান সাহসের সঙ্গে একে অবৈধ বলে ঘোষণা করেছিলেন। সত্য কথাটি বলার কারণে বুশ প্রশাসনের তীব্র চাপ ও বিরোধিতারও শিকার হয়েছিলেন তিনি।
ইরাকের ক্ষেত্রেও একটি অবৈধ যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারায়। তবু এর জন্যও কাউকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়নি। এমনকি পশ্চিমা জনমতও শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেনে নিয়েছে যে যুদ্ধটি ছিল অবৈধ এবং অপ্রয়োজনীয়।
লিবিয়ায় পশ্চিমের ব্যর্থ হস্তক্ষেপের পর তাদের প্রতিক্রিয়ায় নিষ্ঠুর উদাসীনতার প্রকাশ ঘটেছে আরও স্পষ্টভাবে। ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর গাদ্দাফি নিহত হওয়ার পর তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন গর্বের সঙ্গে বলেছিলেন, “আমরা এলাম, দেখলাম, আর সে মারা গেল।”
অথচ গাদ্দাফি জীবিত থাকাকালে অধিকাংশ লিবীয় মোটামুটি স্বচ্ছন্দ জীবনযাপন করত। বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশক থেকে দেশটিতে তুলনামূলক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল। সে সময় দেশে কোনো যুদ্ধ বা বড় ধরনের সংঘাত ছিল না। রাষ্ট্রের কাছ থেকেও লিবিয়ার প্রতিটি পরিবার ব্যাপক সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক সুবিধা পেত।
১৯৯০ সালে লিবিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন ছিল ৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫ বিলিয়ন ডলারে। একই বছরে লিবিয়ার মাথাপিছু জিডিপি ছিল ১১ হাজার ৬০০ ডলার, যা আফ্রিকার মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার ১০ বছর পর, ২০২০ সালে দেশটির জিডিপি কমে দাঁড়ায় ৪৭ বিলিয়ন ডলারে। মাথাপিছু জিডিপিও নেমে আসে ৬ হাজার ৭০০ ডলারে।
লাখ লাখ সাধারণ লিবীয় নাগরিক একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল জীবন থেকে এমন এক দুর্বিষহ বাস্তবতায় নিক্ষিপ্ত হয়েছে, যাকে নরক ছাড়া আর কিছু বলা কঠিন। তাদের কাছে পশ্চিম কখনো দুঃখপ্রকাশ করেনি।
নিরপরাধ মানুষের ওপর পশ্চিমা হস্তক্ষেপের যে ভয়াবহ মানবিক মূল্য চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার প্রতি এই নির্মম উদাসীনতা পশ্চিমা বিশ্ব নিজেদের স্বভাবতই নৈতিক ও মহৎ সভ্যতা বলে যে বিশ্বাস পোষণ করে, তাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে। শুধু তা-ই নয়, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার করার সময় পশ্চিম যে স্পষ্ট দ্বৈত মানদণ্ড প্রয়োগ করেছে, তাতেও তাদের নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের দাবি আরও ক্ষয় হয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে পশ্চিম বলে এসেছে, নির্যাতন একটি ঘৃণ্য অপরাধ এবং একাধিক মানবাধিকার সনদে তা নিষিদ্ধ। ১৯৮৪ সালের ১০ ডিসেম্বর গৃহীত জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদকেও পশ্চিম মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখেছিল। ১৯৮৮ সালের মে মাসে সনদটি অনুমোদনের জন্য মার্কিন সিনেটে পাঠানোর সময় প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান বলেছিলেন, এর মাধ্যমে নির্যাতনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট হবে। তাঁর ভাষায়, নির্যাতন একটি “ঘৃণ্য প্রথা”, যা দুঃখজনকভাবে তখনও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচলিত ছিল।
কিন্তু বুশ প্রশাসন যখন গুয়ান্তানামো বে-তে আধুনিক যুগের কোনো উন্নত দেশের মধ্যে প্রথমবারের মতো নির্যাতনের প্রথা পুনঃপ্রবর্তন করল, তখন ইউরোপের একসময়ের মানবাধিকার রক্ষাকর্তারা শুধু বুশ প্রশাসনের নিন্দা করেই থেমে থাকেনি। বরং তারা বিভিন্ন ‘রেন্ডিশন’ কর্মসূচির মাধ্যমে এই নির্যাতনে সহায়তা করেছে। এসব কর্মসূচির আওতায় মানুষকে অপহরণ করে এমন সব দেশে পাঠানো হতো, যেখানে তাদের নির্যাতন বা নিপীড়নের শিকার হওয়ার আশঙ্কা ছিল প্রবল।
ইউক্রেন ও গাজায় নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিক্রিয়ার পার্থক্য মানবাধিকারের ক্ষেত্রে তাদের দ্বৈত মানদণ্ডকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ইউক্রেনে নিরপরাধ মানুষ কিংবা শিশু নিহত হলে অনেক পশ্চিমা নেতা যথার্থভাবেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
২০২৫ সালের আগস্টে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় কিয়েভের বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত এবং নিরপরাধ মানুষ নিহত হওয়ার পর ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন বলেন, “রাশিয়ার অবিরাম বোমাবর্ষণের আরেকটি রাত বেসামরিক অবকাঠামোয় আঘাত হেনেছে এবং নিরপরাধ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।”
তৎকালীন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতিবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজা কালাস বলেন, “রাশিয়া আবারও ইচ্ছাকৃতভাবে ইউক্রেনের বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যা করেছে।”
২০২৪ সালের জুলাইয়ে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কিয়েভের ওখমাতদিত শিশু হাসপাতালের শিশুসহ বেশ কয়েকজন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই হামলাকে “রাশিয়ার নৃশংসতার এক ভয়াবহ স্মারক” হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, রাশিয়া “ইউক্রেনের বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।”
একই হামলার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার নিরপরাধ শিশুদের ওপর হামলাকে “সবচেয়ে জঘন্য কর্মকাণ্ডগুলোর একটি” বলে অভিহিত করেন। পশ্চিমা নেতারা মোটের ওপর এসব হত্যাকাণ্ডকে নৃশংসতা ও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু গাজা সংঘাতে যখন এর চেয়েও অনেক বেশি নিরপরাধ মানুষ, যার মধ্যে অসংখ্য শিশুও ছিল, নিহত হলো, তখন সেই একই পশ্চিমা নেতাদের বড় একটি অংশ গাজার ব্যাপারে প্রায় নীরবই রইলেন।
গাজার মতো আর কোনো ঘটনা পশ্চিমা বিশ্বের নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে এতটা ক্ষতিগ্রস্ত করেনি। আধুনিক মোবাইল ফোন এখন সবার হাতে পৌঁছে যাওয়ায় গাজায় লাখ লাখ নিরপরাধ ফিলিস্তিনি মানুষের দুর্ভোগ আমরা নিজের চোখেই দেখেছি। একই দৃশ্য বিশ্বের পশ্চিমের বাইরের ৮৮ শতাংশ মানুষও দেখেছে। তারা গাজা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের সেই প্রবল নীরবতাও প্রত্যক্ষ করেছে।
ভারতীয় ঔপন্যাসিক এবং The World After Gaza বইয়ের লেখক পঙ্কজ মিশ্র ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বলেছিলেন, “গাজা আমেরিকান প্রতিষ্ঠান, পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাকে এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যা এর আগে কোনো যুদ্ধ বা সংঘাত পারেনি।”
বুকার পুরস্কারজয়ী ভারতীয় ঔপন্যাসিক অরুন্ধতী রায় আরও কঠোর ভাষায় বলেছেন, “গাজায় ধ্বংসস্তূপের নিচে শুধু ফিলিস্তিনিদের মৃতদেহ পড়ে নেই, সেখানে পড়ে আছে পশ্চিমা উদার গণতন্ত্রের মৃতদেহও।”
পশ্চিমের বৈদেশিক হস্তক্ষেপ ও নীতিগুলো যতই বিপর্যয় ডেকে আনুক, পশ্চিমের অনেক প্রভাবশালী চিন্তাবিদ ও রাজনীতিক নিজেদের এই সান্ত্বনা দেন যে, অন্তত নিজেদের দেশের সমাজব্যবস্থা এখনো বিশ্বের সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে।
২০২২ সালের ১৩ অক্টোবর তৎকালীন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতিবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ জোসেপ বোরেল বলেছিলেন, “ইউরোপ একটি বাগান। আমরা এই বাগান গড়ে তুলেছি। এখানে সবকিছুই ঠিকঠাক চলছে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামাজিক সংহতির এমন সমন্বয় মানবজাতি আর কোথাও গড়ে তুলতে পারেনি। … বিশ্বের বাকি অংশের অধিকাংশই একটি জঙ্গল। আর সেই জঙ্গল একদিন এই বাগানে ঢুকে পড়তে পারে।”
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আধুনিক ও উন্নত পশ্চিমা সমাজে বসবাসকারী মানুষ এখনো গ্লোবাল সাউথের মানুষের তুলনায় উন্নত জীবনযাত্রার সুযোগ ভোগ করেন। পশ্চিমের বর্তমান প্রজন্ম মূলত তাদের পূর্বপুরুষদের নেওয়া দূরদর্শী ও কার্যকর জননীতির সুফল পাচ্ছে। কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তারা কী রেখে যাচ্ছে?
ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি একই রকম স্বচ্ছন্দ জীবনযাপন করতে পারবে? নাকি তাদের জীবনযাত্রার মান ধীরে ধীরে কমতে থাকবে?
বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, পশ্চিমের অধিকাংশ মানুষই মনে করেন না যে তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিরা তাদের মতো ভালো জীবনযাপন করতে পারবে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা যায়, ইউরোপের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ৭৫ শতাংশের বেশি মানুষ মনে করেন, তাদের সন্তানরা আর্থিকভাবে তাদের বাবা-মায়ের চেয়ে খারাপ অবস্থায় থাকবে।
বাস্তবতা হলো, পশ্চিমের বড় একটি জনগোষ্ঠীর জীবন ইতিমধ্যেই আগের চেয়ে ভালো হওয়ার বদলে খারাপ হয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন জানায়, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫.৫ শতাংশ পরিবার তাদের প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর মতো যথেষ্ট আয় করতে পারেনি। ২০১৪ সালের পর থেকে প্রায় প্রতিবছরই ৪০ শতাংশের বেশি মার্কিন পরিবারকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, মানুষের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয় আর কখনোই সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে না। তথ্য-উপাত্ত দেখায়, ১৯৭৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনশীলতা প্রায় দ্বিগুণ হলেও গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি বেড়েছে মাত্র ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ উৎপাদনশীলতা বাড়ার সুফল মূলত পুঁজির মালিক ও সর্বোচ্চ আয়ের মানুষদের কাছেই গেছে। এর ফলে সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণি দুর্বল হয়েছে, অথচ সাধারণ মানুষের আয় সেভাবে বাড়েনি।
অ্যাঙ্গাস ডিটন ও অ্যান কেস তাঁদের Deaths of Despair বইয়ে দেখিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবয়সী শ্বেতাঙ্গ, হিস্পানিক নন এমন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের “হতাশাজনিত মৃত্যুর” মহামারি দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মাদক সেবনের অতিরিক্ত মাত্রায় মৃত্যু, আত্মহত্যা এবং অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে মৃত্যু। তাঁরা লিখেছেন, ১৯৯০ সালে ৪৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী শ্বেতাঙ্গ নারী ও পুরুষদের মধ্যে প্রতি এক লাখে হতাশাজনিত মৃত্যুর হার ছিল ৩০ জন। ২০১৭ সালে সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৯২ জনে।
১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০১৬-১৭ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যেই ৪৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী শ্বেতাঙ্গদের আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর হার বেড়েছে। দুটি অঙ্গরাজ্য ছাড়া সব অঙ্গরাজ্যেই অ্যালকোহলজনিত লিভার রোগে মৃত্যুর হার বেড়েছে। আর প্রতিটি অঙ্গরাজ্যেই মাদকের অতিরিক্ত ব্যবহারে মৃত্যুর হার বৃদ্ধি পেয়েছে।
পশ্চিমা বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ তাদের বৈদেশিক ভূরাজনৈতিক ব্যর্থতার সঙ্গে নিজেদের সমাজে ছড়িয়ে পড়া এই হতাশার কোনো সম্পর্ক দেখতে পান না। কিন্তু বাস্তবে দুটির মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বৈদেশিক হস্তক্ষেপে যে অর্থ ও সম্পদ নষ্ট হয়েছে, সেগুলো নিজেদের জনগণের কল্যাণে আরও ভালোভাবে কাজে লাগানো যেত।
ইরাক যুদ্ধের প্রসঙ্গে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎস লিখেছেন, “যুদ্ধের পেছনে খরচ হওয়া অর্থের মাত্র এক-ষষ্ঠাংশ খরচ করেই যুক্তরাষ্ট্র তার সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগামী অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের জন্য আর্থিকভাবে স্থিতিশীল রাখতে পারত। এর জন্য সুবিধা কমানো বা জনগণের ওপর অতিরিক্ত কর চাপানোরও প্রয়োজন হতো না।”
পশ্চিমের কিছু চিন্তাশীল মানুষ হয়তো এখন পর্যন্ত আলোচনার যুক্তিগুলোর সঙ্গে একমত হতে পারেন। তাঁরা স্বীকার করতে পারেন যে, গ্লোবাল সাউথে পশ্চিমের অনেক হস্তক্ষেপই ছিল অপ্রয়োজনীয় এবং শেষ পর্যন্ত তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে এনেছে। কিন্তু ইউক্রেনের যুদ্ধও যে পশ্চিমের ভূরাজনৈতিক ব্যর্থতার একটি দৃষ্টান্ত, এই কথার সঙ্গে তাঁরা কোনোভাবেই একমত হবেন না।
রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ যে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ছিল, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের প্রাণহানির জন্য রাশিয়ার নিন্দা করা উচিত।
তবে ইউক্রেনে আক্রমণের পর পশ্চিম যখন রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল, তখন তারা একটি বিষয় খেয়াল করল না। বিশ্বের ৮৫ শতাংশ মানুষ তাদের সঙ্গে নিষেধাজ্ঞায় যোগ দেয়নি। কেন?
এর কারণ কি গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর নৈতিক অবস্থানের দুর্বলতা? নাকি এর পেছনে ছিল তাদের নিজস্ব ভূরাজনৈতিক হিসাব?
ব্রাজিল, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। এর অর্থ এই নয় যে তারা রাশিয়ার আক্রমণকে সমর্থন করেছে। বরং এর মধ্য দিয়ে তারা পশ্চিমের সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে যে ইউক্রেনের যুদ্ধ ছিল সম্পূর্ণ “উসকানিবিহীন” এবং এই যুদ্ধের জন্য একমাত্র রাশিয়াই দায়ী।
ইউক্রেনের যুদ্ধকে বর্ণনা করতে পশ্চিমা নেতাদের এতবার “উসকানিবিহীন” শব্দটি ব্যবহার করা সত্যিই বিস্ময় জাগায়। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছিলেন, “রুশ সামরিক বাহিনী কোনো উসকানি, কোনো যুক্তিসংগত কারণ এবং কোনো প্রয়োজন ছাড়াই ইউক্রেনের জনগণের ওপর নির্মম হামলা শুরু করেছে।”
প্রায় একই সময়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন রাশিয়ার পদক্ষেপকে “একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ইউরোপীয় দেশের ওপর নির্মম ও উসকানিবিহীন হামলা” বলে অভিহিত করেন। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বলেন, “আজ আমরা এমন এক পৃথিবীতে ঘুম থেকে উঠেছি, যা আগের মতো নেই। রাশিয়া ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বের ওপর নির্মম ও উসকানিবিহীন হামলা চালিয়েছে।” জি-৭-এর নেতারাও যৌথভাবে রাশিয়ার পদক্ষেপকে “ইউক্রেনের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ওপর এই উসকানিবিহীন ও সম্পূর্ণ অন্যায় হামলা” বলে বর্ণনা করেন।
পশ্চিমা এসব নেতা হয়তো বুঝতে পারেননি, ইউক্রেনের যুদ্ধকে বারবার “উসকানিবিহীন” বলে বর্ণনা করার মধ্য দিয়ে তাঁরা আসলে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর রাজনৈতিক উপলব্ধিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। এর মধ্যে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার মতো চিন্তাশীল নেতারাও রয়েছেন।
২০২২ সালের মে মাসে লুলা যুদ্ধটি নিয়ে তুলনামূলকভাবে ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বলেছিলেন, “পুতিনের ইউক্রেনে আক্রমণ করা উচিত হয়নি। কিন্তু শুধু পুতিনই দায়ী নন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও দায়ী। ইউক্রেনে আক্রমণের কারণ কী ছিল? ন্যাটো? তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বলা উচিত ছিল, ‘ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দেবে না।’ তাহলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যেত।”
সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক ঘটনাগুলো নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব ও বিশ্বের বাকি অংশের দৃষ্টিভঙ্গির এই বিশাল ব্যবধান একই সঙ্গে বিস্ময়কর এবং পরস্পরবিরোধী। তাত্ত্বিকভাবে পৃথিবী এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংযুক্ত। মানুষের হাতে আজ যত তথ্য পৌঁছে যাচ্ছে, মানব ইতিহাসের আর কোনো সময়েই তা এত বেশি ছিল না। এমনকি একটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমেও আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি তথ্য জানতে পারি।
তারপরও একই ঘটনা চোখের সামনে ঘটতে দেখেও পশ্চিমা বিশ্ব এবং বিশ্বের বাকি অংশ যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বাস্তবতায় বসবাস করছে। আরও বিস্ময়কর হলো, পশ্চিমের অধিকাংশ নেতা ও বিশ্লেষক যেন বুঝতেই পারছেন না যে বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন ও আস্থা তারা হারিয়ে ফেলেছেন।
এই কারণেই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের কথাগুলো গ্লোবাল সাউথে এতটা সাড়া ফেলেছিল। ২০২২ সালের জুনে তিনি বলেছিলেন, “ইউরোপকে কোনো একসময় এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে যে ইউরোপের সমস্যাগুলোই শুধু বিশ্বের সমস্যা, কিন্তু বিশ্বের সমস্যাগুলো ইউরোপের সমস্যা নয়।”
এর এক বছর পর, ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎস স্বীকার করেন যে জয়শঙ্করের কথায় “যুক্তি আছে”। লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলোর কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “সম্মিলিতভাবে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রথমেই আমাদের এসব দেশের স্বার্থ ও উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।”
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে মতপার্থক্য যতই বাড়ুক, চীনকে নিয়ে তাদের উদ্বেগের জায়গাটি একই থাকবে। তারা কোনো না কোনোভাবে চীনকে বিচ্ছিন্ন করা এবং তার অগ্রযাত্রা থামানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু তারা যখন এমন উদ্যোগ নেবে, তখন দেখবে বিশ্বের বাকি দেশগুলো তাদের কথায় কান না দিয়ে চীনের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক ও যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। ফলে চীনকে বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বই বাকি বিশ্ব থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।
পশ্চিমা বিশ্ব যে বিশ্বের বাকি অংশকে হারিয়েছে, এই বাস্তবতা স্বীকার করতে তাদের অনীহাই তাদের আত্মপ্রবঞ্চনার প্রকাশ। পশ্চিম এখনো বিশ্বাস করে যেতে চায় যে পৃথিবীর সবচেয়ে নৈতিক ও মহৎ সভ্যতা তারাই। এই আত্মপ্রবঞ্চনা যত দীর্ঘ হবে, ততই পশ্চিমা বিশ্বকে এমন এক নিঃসঙ্গ ও আত্মমগ্ন সভ্যতা হিসেবে দেখা হবে, যে নিজের নিয়েই ব্যস্ত। বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাকে কীভাবে দেখে, সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই।
পশ্চিম ও বিশ্বের বাকি অংশের মধ্যে এই দূরত্ব যদি দ্রুত এবং কার্যকরভাবে কমিয়ে আনা না যায়, তাহলে পৃথিবী আরও অনিশ্চিত ও সংকটপূর্ণ সময়ের দিকে এগিয়ে যাবে।