দিল্লির কোথাও একটি করমর্দন অপেক্ষা করছে। এখনো সেই করমর্দনের সঙ্গে কোনো নির্ধারিত তারিখ, সম্মত সফরসূচি কিংবা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নিশ্চিত হয়নি। এই লেখা প্রকাশের সময় ভারত ও বাংলাদেশ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর নিয়ে আলোচনা করছে। আলোচনায় নভেম্বর মাসের কয়েকটি সম্ভাব্য তারিখও রয়েছে। তবে দুই পক্ষই জানিয়েছে, এ সফরের জন্য রাজনৈতিক পরিবেশ অনুকূল হতে হবে। আমন্ত্রণ খোলা রয়েছে, কিন্তু সফর এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ও বাংলাদেশের দুই নেতার মধ্যে একটি করমর্দন নিছক আলোকচিত্রের চেয়েও অনেক বেশি তাৎপর্য বহন করবে। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যাবে, ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস, বাণিজ্য ও অত্যন্ত দীর্ঘ অভিন্ন সীমান্তের বন্ধনে আবদ্ধ দুই প্রতিবেশী গভীর অবিশ্বাসের একটি অধ্যায় পেরিয়ে বাস্তবসম্মত সম্পর্ক পুনর্গঠন শুরু করতে পারে কি না।
বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আবির্ভাব একটি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। সেটি সম্পর্কের মোড় ঘোরানো মুহূর্তে পরিণত হবে কি না, তা আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে বেশি নির্ভর করবে দুই সরকার কী নিয়ে আলোচনা করতে, দর-কষাকষি করতে এবং বাস্তবে কী অর্জন করতে প্রস্তুত, তার ওপর।
নির্বাসন থেকে প্রত্যাবর্তন
বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রায় ১৭ বছর লন্ডনে বসবাস করেছেন। যে দেশের রাজনীতি তার জীবনকে গড়ে তুলেছে, সেই দেশ থেকে তিনি ছিলেন দূরে। ২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন ঘটে, তারপর ২০২৫ সালের ২৫শে ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরে আসেন তারেক রহমান। তার প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জন্য গভীর আবেগের একটি মুহূর্ত। দলটি প্রতিষ্ঠা করেছেন তার পিতা, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। পরে দলটির নেতৃত্ব দেন তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের সময়টি ছিল অসাধারণ। রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা একটি দেশে ফিরেছেন তারেক রহমান। তখন প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে, অর্থনীতি গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন এবং জনসাধারণের প্রত্যাশা তুঙ্গে। দেশে ফেরার কয়েক দিন পরই মারা যান বেগম খালেদা জিয়া। তার জানাজায় ঢাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে এবং বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বিশাল, তবে জটিলও। তার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তার মা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতায় পরিণত হয়েছেন। তাদের উত্তরাধিকার বিএনপি’র ভেতরে তারেক রহমানকে শক্তিশালী ভিত্তি দিয়েছে। একই সঙ্গে বংশানুক্রমিক রাজনীতি, তার নিজের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বিরোধী দলে থাকার সময় তাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের কারণে তিনি সমালোচনার মুখেও পড়েছেন। লন্ডনে কাটানো বছরগুলো তারেক রহমানের ব্যক্তিগত জীবনের অপেক্ষাকৃত আড়ালে থাকা একটি দিক তুলে ধরে। দীর্ঘ নির্বাসনের সময় তিনি দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের কিংস্টনে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমাকে নিয়ে বসবাস করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতিদিনের কোলাহল থেকে দূরে তার জীবনযাপনের ধরন ছিল তুলনামূলক শান্ত। রিচমন্ড পার্কের সবুজ বিস্তৃত পথ ধরে হাঁটা এবং ইতিহাসের বই পড়া ছিল তার পছন্দের কাজগুলোর মধ্যে।
টাইম সাময়িকীকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তাকে স্বল্পভাষী ও অন্তর্মুখী হিসেবে দেখা গেছে। সেখানে তিনি বাংলাদেশের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ এবং জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেছেন। বিদেশে কাটানো বছরগুলো তাকে জীবনের বড় একটি অংশজুড়ে চলা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে দূরত্ব তৈরি করার সুযোগও দিয়েছিল। বৃটেনে সাধারণ জীবনের স্বাধীনতা, বিশেষ করে সার্বক্ষণিক সরকারি দায়িত্বের চাপ ছাড়াই হাঁটাচলার সুযোগের কথা তিনি বলেছেন। দেশে ফিরে তিনি আবার রাজনৈতিক মঞ্চে এসেছেন। তবে একই সঙ্গে তাকে এমন এক জীবনে প্রবেশ করতে হয়েছে, যা নিরাপত্তা, দায়িত্ব ও জনসাধারণের প্রত্যাশা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এখন প্রশ্ন হলো, নির্বাসনে অর্জিত দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের শাসন পরিচালনার কাজে কীভাবে প্রতিফলিত হবে।
২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিশ্চিত বিজয় অর্জন করে। ১৭ই ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। তার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় পালাবদল সম্পন্ন করেছে। একই সঙ্গে তার কাঁধে দায়িত্বও পুরোপুরি এসে পড়েছে। এখন আর শুধু ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দলের নেতৃত্ব দেয়া তার কাজ নয়; বরং বিভক্ত একটি দেশ পরিচালনা করাই তার প্রধান দায়িত্ব।
দিল্লির বার্তা
ভারতের পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলো এসেছে ব্যক্তিগত শোকের একটি মুহূর্তে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় এসেছিলেন। সফরকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে ব্যক্তিগত শোকবার্তা হস্তান্তর করেন। ড. জয়শঙ্কর আশা প্রকাশ করেন, বেগম খালেদা জিয়ার ‘দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ’ দুই প্রতিবেশীর অংশীদারিত্বের বিকাশে পথ দেখাবে। সাক্ষাৎটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি ঘটে। ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান, তার দেশত্যাগের পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী প্রশাসন এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে, যেটিকে ব্যাপকভাবে নয়াদিল্লির সঙ্গে আগের তুলনায় কম ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হয়। নিরাপত্তা, প্রকাশ্য বক্তব্য এবং দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাশা নিয়ে উত্তেজনার কারণে সম্পর্কের অগ্রগতি কঠিন হয়ে পড়ে। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারতের পক্ষ থেকে আসা কূটনৈতিক সৌজন্যগুলোর মধ্যে পার্থক্যটি স্পষ্ট করা জরুরি। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন। আর ড. জয়শঙ্কর ঢাকায় গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। দু’টি ঘটনাই ভারতের আনুষ্ঠানিক শোক প্রকাশের অংশ।
নির্বাচনের পরও ভারতের যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। বিএনপির বিজয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং তার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রকাশ্য বার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।’
দুই দেশের বহুমুখী সম্পর্ক জোরদার এবং অভিন্ন উন্নয়ন লক্ষ্য এগিয়ে নিতে তারেক রহমানের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি। এই বক্তব্য দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার পথ তৈরি করেছে, তবে তাতে এমন কোনো ইঙ্গিত দেয়া হয়নি যে প্রতিবেশীদের মধ্যকার কঠিন সমস্যাগুলো মিটে গেছে। একই সঙ্গে নেতাদের ব্যক্তিগত সখ্যের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক বৈধতা ও অভিন্ন স্বার্থের প্রেক্ষাপটে সম্পর্কটিকে তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্ব জুড়ে অভিনন্দন
তারেক রহমানের বিজয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা অভিনন্দন জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিএনপি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, আঞ্চলিক সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা এগিয়ে নিতে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী ওয়াশিংটন। চীনও নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়েছে এবং নতুন প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। এসব বার্তা ইঙ্গিত দিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বশক্তি ও আঞ্চলিক অংশীদাররা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তারেক রহমানের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই আগ্রহ যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি চাপও বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশের প্রয়োজন বিনিয়োগ, রপ্তানি বাজার, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান। একই সঙ্গে কোনো একটি বহিরাগত অংশীদারের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজস্ব স্বার্থ অনুসরণের সুযোগও প্রয়োজন। নির্বাচনের আগে দেয়া সাক্ষাৎকারগুলোতে তারেক রহমান একদিকে বিনিয়োগ আকর্ষণ, অন্যদিকে কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এড়িয়ে চলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। নয়াদিল্লি, বেইজিং, ওয়াশিংটনসহ অন্যান্য রাজধানীতে তার এই ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি তার নিজস্ব অগ্রাধিকারের ভিত্তিতেই পরিচালিত হবে। ভৌগোলিক নৈকট্য রাজনৈতিক সমন্বয় নিশ্চিত করে- ভারতের এমন ধারণা করা উচিত নয়। একইভাবে, সবচেয়ে বড় প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের বাস্তবতাও ঢাকার উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ভারতের প্রতি তারেক রহমানের অবস্থান বিচার করা উচিত তার সরকার কী করেছে, শুধু কী বলেছে তার ভিত্তিতে নয়। বাংলাদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামকে নয়াদিল্লিতে হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্ককে বাস্তব গুরুত্ব দেয়ার ইঙ্গিত বহন করে। অন্যদিকে বিএনপি’র ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ছাড়াই বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রতিশ্রুতি ভারসাম্য রক্ষার নীতির দিকে ইঙ্গিত করে, একক পক্ষের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে একীভূত হওয়ার দিকে নয়। এই ভারসাম্য তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থানের মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলোকে ধারণ করতে পারে কি না, সেটিই হবে প্রকৃত পরীক্ষা।
রাষ্ট্রদূত ও নতুন সুযোগ
বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীকে নিয়োগ দেয়াও আরেকটি ইঙ্গিত যে নয়াদিল্লি সম্পর্কটিকে নতুন করে রাজনৈতিক গুরুত্ব দিতে চায়। সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ত্রিবেদী এমন একটি পদে নিয়োগ পেয়েছেন, যেখানে সাধারণত পেশাদার কূটনীতিকদের দায়িত্ব দেয়া হয়। দুই দেশের সরকার যখন আগের সময়ের টানাপোড়েন কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, তখন তিনি ঢাকায় দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ঢাকাও নিজেদের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামকে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে ভারত। তিনি এম রিয়াজ হামিদুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হবেন। হামিদুল্লাহ জেনেভায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। দায়িত্বে থাকা পররাষ্ট্র সচিবকে নয়াদিল্লিতে পাঠানোর ফলে এই নিয়োগ যথেষ্ট কূটনৈতিক গুরুত্ব পেয়েছে। দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং অমীমাংসিত মতপার্থক্য দূর করার প্রচেষ্টার কেন্দ্রে একজন জ্যেষ্ঠ পেশাদার কূটনীতিককে স্থাপন করা হচ্ছে। ১৮ই অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, নিয়োগের অনুমোদনের বিষয়টি জানানো হয়েছিল। তবে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, তা তখনো নিশ্চিত হয়নি। শুধু নিয়োগের মাধ্যমে দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব নয়। কূটনৈতিক যোগাযোগের এই পথ দুই সরকারকে আরও ধারাবাহিকভাবে এবং প্রকাশ্য বিরোধ কমিয়ে কঠিন বিষয়গুলো মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে কি না, তার ওপরই এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে।
হাইকমিশনার ত্রিবেদীর প্রকাশ্য বক্তব্য সংযত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নভেম্বর সফর নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভারতের আমন্ত্রণ এখনো বহাল রয়েছে এবং তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও বলেছেন, আলোচনা চলছে। তবে সফরের জন্য উভয় পক্ষের অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন এবং তা পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তারিখ নিয়ে জল্পনার চেয়ে এসব বক্তব্য বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। এগুলো থেকে বোঝা যায়, দুই পক্ষই উপলব্ধি করছে যে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সফর থেকে অর্থবহ ফল পেতে হলে আগে প্রস্তুতি নিতে হবে। তাড়াহুড়ো করে বৈঠক করলে তাতে সংবাদের শিরোনাম তৈরি হতে পারে; কিন্তু সতর্কতার সঙ্গে প্রস্তুত করা বৈঠক পরবর্তী কাজের জন্য একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
জনসমর্থন, তবে ব্লাঙ্ক চেক নয়
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন, যিনি প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুদ্ধার, জননিরাপত্তার উন্নতি এবং রাষ্ট্রের ওপর মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করতে চান। তার নির্বাচনী প্রচারে নিম্ন আয়ের পরিবার, কৃষক, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতিও ছিল। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’- কথাটি তাদের নীতির মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এখন প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের পরীক্ষা। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা এবং ব্যবসায়ীদের কাছে নীতিগত স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেন আরও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, প্রতিশোধ ও বঞ্চনার আরেকটি চক্র শুরু না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনের আগে টাইম সাময়িকীকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান জাতীয় সংহতির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারি, তাহলে দেশকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না।’
প্রতিশোধের রাজনীতি দেশের কোনো উপকার করবে না বলেও তিনি যুক্তি দিয়েছেন। এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশে এই বক্তব্যগুলোর গুরুত্ব রয়েছে, যেখানে দমন-পীড়ন, কারাবাস, সহিংসতা ও রাজনৈতিক বঞ্চনার স্মৃতি এখনো তরতাজা। প্রকৃত পরীক্ষা হবে, সরকার রাজনৈতিক বহুত্ববাদ রক্ষা করে কি না, আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে কি না এবং বিরোধীদের শান্তিপূর্ণভাবে জনজীবনে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয় কি না। নির্বাচনী ম্যান্ডেট একটি সরকারকে দেশ পরিচালনার ক্ষমতা দেয়; কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেয়া, মানুষের কথা শোনা কিংবা যারা ভোট দেয়নি তাদের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব থেকে সরকার মুক্ত।
ভারতের জন্যও এটি কোনো গৌণ বিষয় নয়। স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ উভয় দেশের স্বার্থের অনুকূল। সীমান্তের ওপারে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাণিজ্য, পরিবহন, নিরাপত্তা ও জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। শুধু তৎকালীন নেতাদের ওপর নির্ভরশীল সম্পর্ক ভঙ্গুর হবে। বরং প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ চুক্তি ও নিয়মিত যোগাযোগের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্কের স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আরও কার্যকর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থেকে বাস্তব অনেক সুফল পাওয়া সম্ভব। উন্নত পরিবহন যোগাযোগ ব্যবসার খরচ কমাতে পারে এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের নতুন পথ খুলে দিতে পারে। নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সহযোগিতা শিল্প ও গৃহস্থালির প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করতে পারে। পূর্বানুমানযোগ্য ভিসাব্যবস্থা দুই দেশের শিক্ষার্থী, রোগী, পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের যাতায়াত সহজ করতে পারে। বাণিজ্য আলোচনার মাধ্যমে ভৌগোলিক নৈকট্যের স্বাভাবিক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও যেসব বাধা দীর্ঘদিন ধরে রয়ে গেছে, সেগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব।
তবে অগ্রগতির জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। পানিবণ্টন, বাণিজ্য এবং বিদ্যমান ব্যবস্থায় সুবিধার ভারসাম্য নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ ভারতকে গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। অন্যদিকে নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ মোকাবিলা করতে হবে বাংলাদেশকে এবং দ্বিপক্ষীয় মতপার্থক্য যেন বৈরিতার অজুহাতে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো দেশই অন্য দেশের কাছে তাদের প্রতিটি দাবি মেনে নেয়ার প্রত্যাশা করতে পারে না। তবে উভয় দেশই এমন একটি প্রক্রিয়া থেকে লাভবান হতে পারে, যা সুনির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য ফলাফল বয়ে আনবে।
করণীয় বিষয়গুলোর তালিকা বেশ দীর্ঘ। যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানিবণ্টন, ভিসা ও যাতায়াত এবং একে অন্যের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের সমাধানে ধারাবাহিক মনোযোগ প্রয়োজন। তিস্তার পানিবণ্টন বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল একটি বিষয়। অন্যদিকে সীমান্তপারের নিরাপত্তা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক ভারসাম্য নিয়ে ভারতেরও উদ্বেগ রয়েছে।
রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও এই সম্পর্কের মধ্যে জায়গা দিতে হবে। শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের কাছে একটি বিতর্কিত বিষয়। অন্যদিকে নয়াদিল্লি চাইবে, তার নিরাপত্তার স্বার্থ এবং সীমান্তের উভয় পাশে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেয়া হোক। বিষয়গুলো কঠিন, কিন্তু এগুলো এড়িয়ে গেলে পরবর্তী সংকটের সময় সম্পর্ক আবারও অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের বার্তা
বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের দৃশ্যমান উদ্যোগ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্গাপূজার অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। তিনি দেশের উন্নয়নে সব ধর্মের মানুষকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০ অক্টোবর রংপুরের রাধাগোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরে শারদীয় শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান-সবার সমান অধিকার আছে দেশে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে বিভিন্ন আন্দোলনে মানুষের মধ্যে যে ঐক্য দেখা গিয়েছিল, সেটিও স্মরণ করেন তিনি। সমান অধিকার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তাসহ তার এই সফর জাতীয় ঐক্যের পক্ষে দেয়া প্রকাশ্য আহ্বানে ধর্মীয় অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। তবে এই বার্তার প্রকৃত তাৎপর্য নির্ভর করবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমান নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা কতটা ধারাবাহিকভাবে নিশ্চিত করা হয়, তার ওপর। শেখ হাসিনার শাসনামলের তুলনায় বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ বদলে গেছে। দুই সরকারেরই সেই বাস্তবতা স্বীকার করা উচিত। সম্পর্কের পুনর্গঠন মানে পুরোনো ব্যবস্থায় অন্য কোনো পথে ফিরে যাওয়া নয়। বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের বৈধ স্বার্থ- দুটোকেই স্বীকৃতি দিতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন বাস্তবতা, ধৈর্য এবং মতপার্থক্য ও শত্রুতার মধ্যে পার্থক্য করার মানসিকতা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর সর্বোচ্চ পর্যায়ে এই কাজ শুরু করার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। সফর নভেম্বরে হতে পারে, আবার আরও সময়ও লাগতে পারে। দুই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তারিখ ঘোষণা না করা পর্যন্ত সফরটিকে চূড়ান্ত না বলে আলোচনাধীন হিসেবে বর্ণনা করা উচিত। শিরোনামে এই পার্থক্য সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু কূটনীতিতে তা গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লির কোথাও সেই করমর্দন অপেক্ষা করছে। যখন তা হবে, সেটি কোনো উপসংহার নয়, বরং নতুন সূচনা হবে। এর মূল্য নির্ধারিত হবে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ দিয়ে- দুই প্রতিবেশী সদিচ্ছাকে চুক্তিতে, মতপার্থক্যকে সংলাপে এবং ভৌগোলিক নৈকট্যকে এমন এক সম্পর্কে রূপ দিতে পারে কি না, যা সীমান্তের উভয় পাশের মানুষের কল্যাণে কাজ করবে।