পথের ধারে ভ্রাম্যমাণ বা অস্থায়ী খাবারের দোকান, ছোট রেস্তরাঁ থেকে শুরু করে আমদানিকারক ও বড় আকারের খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, খাবারের ব্যবসায় জড়িত এমন সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এখন থেকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থেকে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। সম্প্রতি প্রবিধানমালাটি সরকারি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। নির্দেশনা দেয়া হয়েছে- আগামী ১লা নভেম্বর থেকে এই নিয়ম কার্যকর হবে। প্রবিধান কার্যকরে সংহতি জানিয়েছেন বিভিন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও। খাবারে নিয়ম-শৃঙ্খলা আনতে তারা সহযোগী হবেন বলে জানিয়েছেন। তবে লাইসেন্স-নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নিবন্ধক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা আর নিবন্ধন করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হতে পারেন, এমন শঙ্কাও দেখছেন তারা।
শুক্রবার রাজধানীর কয়েকটি এলাকার বিভিন্ন ক্যাটাগরির ক্ষুদ্র ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশির ভাগ ব্যবসায়ীই এখনো কিছুই জানেন না বিধিবিধান সম্পর্কে। ব্যবসায়ীদের কাছে জারিকৃত গেজেট উপস্থাপন করলে বেশির ভাগ ব্যবসায়ীই সাধুবাদ জানিয়েছেন এ উদ্যোগকে। বলছেন, নিয়ম করে খাবারে শৃঙ্খলা আনা গেলে এটি সবার জন্যই ভালো হবে। নিবন্ধন-রেজিস্ট্রেশনের অর্থের প্রয়োজন হলেও আপত্তি নেই তাদের। কিছু কিছু ব্যবসায়ী আপত্তি জানিয়েছেন এ বিষয়ে। তারা বলছেন, ট্রেড লাইসেন্স করিয়ে ট্যাক্স পরিশোধ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায় ফের নিবন্ধন-রেজিস্ট্রেশন করা অযৌক্তিক।
তাছাড়া বিভিন্ন দপ্তরের লাইসেন্স ও নিরাপত্তার ছাড়পত্র নিতে গিয়ে নানা জটিলতায় পড়তে হয়। বর্তমানে ১২টি সরকারি সংস্থা আলাদাভাবে তদারকি ও অভিযান চালানোর নামে তাদের নিয়মিত হয়রানি করে। ফলে লাইসেন্স করা কিংবা লাইসেন্স নবায়ন করতে গিয়েও বিপাকে পড়তে হতে পারে বলে শঙ্কা তাদের।
মগবাজার এলাকার ভাসমান ফল বয়বসায়ী মহিউদ্দিন বলেন, ‘সরকার যদি বাধ্যতামূলক করে আমরা করতে বাধ্য। ব্যবসায় করতে হলে ইনভেস্ট করবো। খাবারের নিরাপত্তা থাকলো, এটা ভালো। এর আগে অনেক টাকা আমরা চাঁদা হিসেবেই দিয়ে আসছি। এখন যদি আইনত টাকা দিয়ে ব্যবসা করতে হয় আমরা দিতে পারবো’।
মৌচাক এলাকার মায়ের দোয়া জুস কর্ণারের রাকিব বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত এমন কোনো কিছু শুনিনি যে লাইসেন্স করতে হবে। আমাদের ট্রেড লাইসেন্স আছে। তার ওপর খাবারের জন্য আলাদা কীসের লাইসেন্স জানি না। তবে সরকার যদি নিয়ম করে সেটাতো সবার জন্য। সেক্ষেত্রে আমাদেরও করা লাগবে। মগবাজার চৌরাস্তায় বেকারি পণ্যসহ টং দোকান দিয়ে চা বিক্রি করেন কাজল। বলেন, এই দোকান থেকে আমি যা আয় করেছি, ১০ হাজার টাকা খরচ করেও যদি রেজিস্ট্রেশন করতে হয় আমার কোনো সমস্যা নেই। কাওরান বাজারে খোলা আকাশের নিচে পুরি, সমুচা, ছোলা বিক্রি করেন মোহাম্মদুল্লাহ। তিনি মানবজমিনকে বলেন, নিয়ম করুক, সাধুবাদ জানাচ্ছি। কিন্তু নিয়ম চালু হওয়ার পর যাতে বিষয়টি নিয়ে ভজকট না লাগে। মানুষের হয়রানি না হতে হয়।
তবে এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন কিছু কিছু ব্যবসায়ী। সংশ্লিষ্টরা জানায়, লাইসেন্সিং ব্যবসায়ীদের জন্য হয়রানির কারণ হলে তারা আরও বিপদে পড়বেন। এতে সরকারের ভালো উদ্দেশ্যের চেয়ে নেতিবাচক প্রভাবই বেশি দেখা দেবে।
মগবাজারের এক মিষ্টি দোকানি বলেন, সব প্রক্রিয়া যদি সুশৃঙ্খল হয় এবং এর মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটে, তবে ব্যবসায়ীরা একে স্বাগত জানাবেন। এখানে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়ে থাকলে ব্যবসায়ীদের জন্য বড় বোঝা। মৌচাকের ফাইভ স্টার-ফাস্ট ফুডের দোকানদার জহির বলেন, আমরা ইতিমধ্যেই ট্রেড লাইসেন্স করেছি, ভ্যাট ট্যাক্স দিচ্ছি রেগুলার। এরপরও সরকার যদি মনে করে আবারো খাবারের জন্য লাইসেন্স করা লাগবে, আমাদের ব্যবসায় গুটিয়ে ভিক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। সরকার আমাদের কোনো রকম সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে না, নিজের সুবিধার জন্য বিভিন্ন জিনিস আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। মগবাজার রেলগেট এলাকায় ডাব বিক্রেতা সিরাজ বলেন, আমার সারাদিনে সবমিলিয়ে যে টাকা আয় হয় খাওয়ার টাকাই হয় না, তার উপরে এখন লাইসেন্স রেজিস্ট্রেশন করতে থাকে সরকার; এই সামান্য ব্যবসায় বন্ধ করে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সারা দিন সবমিলিয়ে ১৫-২০ পিস ডাব বিক্রি করি, তার মধ্যে যে লাভ হয় তা দিয়ে সংসার পেটে খাবার দেয়া দায়। তার উপরে নিবন্ধন করলেই যে মান নিশ্চিত হবে তারই বা কি গ্যারান্টি আছে?
কি আছে আইনে?
আইনানুযায়ী রেস্তরাঁ, বেকারি, ফলের রসের দোকান, পেস্ট্রি শপ এবং ক্যাটারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। প্যাকেটজাত বা মোড়কজাত খাবার উৎপাদনকারী, মিষ্টির দোকান, দুগ্ধপণ্য প্রস্তুতকারী এবং আমদানিকারকদেরও (কাঁচা ও তাজা খাবার বাদে) নিবন্ধন করতে হবে। এমনকি রাস্তার পাশে যারা পিঠা, পুরি ও পিয়াজুর মতো খাবারের ব্যবসা করেন, নতুন এই নিয়মের আওতায় তাদেরও নিবন্ধন নিতে হবে।
এ ছাড়া পাইকারি মুদি খাদ্য ব্যবসা, কাঁচা ও তাজা খাদ্য আমদানি, খাদ্য সংরক্ষণাগার ও কোল্ড স্টোরেজ, ভোজ্য তেল ও ভোজ্য লবণ উৎপাদন, বিশেষ খাদ্য, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য, স্বাস্থ্য সহায়ক ও সম্পূরক খাদ্য, বিশেষ পথ্য, চিকিৎসাসংক্রান্ত বিশেষ পথ্য, প্রোবায়োটিক ও প্রিবায়োটিক খাদ্য, জৈব-খাদ্য, কিরণ-সম্পাতকৃত খাদ্য, স্বতাত্ত্বিকভাবে পরিবর্তিত খাদ্য, অভিনব খাদ্য, ব্যবহারিক খাদ্য, একাধিক ধাপে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং খাদ্য সংযোজন দ্রব্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, আমদানি, রপ্তানি ও বিপণনসংশ্লিষ্ট নির্ধারিত ব্যবসার জন্য নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অন্যদিকে যেসব প্রতিষ্ঠান বিশেষায়িত খাদ্যপণ্য নিয়ে কাজ করে তাদের বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের আওতায় নিয়ে আসা হবে এ প্রবিধানের মাধ্যমে। এ ছাড়া বংশগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত বা সংশোধিত খাদ্য, জৈব-খাদ্য, কিরণ-সম্পাতকৃত খাদ্য, স্বতাত্ত্বিকভাবে পরিবর্তিত খাদ্য, অভিনব খাদ্য, ব্যবহারিক খাদ্য, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য এবং নিরাপদ খাদ্য (বিজ্ঞাপন ও দাবি) প্রবিধানমালা, ২০২৫ অনুযায়ী স্বাস্থ্য সহায়ক দাবি বা রোগের ঝুঁকি হ্রাস-সংক্রান্ত দাবি-সম্পন্ন খাদ্যের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসারে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও নিবন্ধন গ্রহণ করতে হবে।
কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, নিবন্ধন বা লাইসেন্স গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও নিবন্ধন বা লাইসেন্স ছাড়া খাদ্য ব্যবসা পরিচালনা করা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। নিবন্ধন ও লাইসেন্সের মেয়াদ হবে তিন বছর এবং এরপর এটি নবায়ন করতে হবে বলেও জানানো হয়।