Image description

জোবাইদা নাসরীন

গত শনিবার ঢাকার গুলিস্তান জিপিও মোড়ে অবস্থিত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রধান কার্যালয় থেকে প্রায় তিনশো’র মতো নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। এর আগে মব করে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ‍্যমে এটি নিয়ে ব‍্যাপক প্রতিক্রিয়ার পর অনেককেই মুক্তি দেওয়া হয়েছে। গণমাধ‍্যমসূত্রে জানা যায়, রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাতে শুনানি শেষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে গ্রেফতার ২৭ জনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। কিন্ত জাসদের নেতাকর্মী নয়, সেখানে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের ২৮০ থেকে ৩০০ নেতাকর্মীকে আটক করার কথা জানিয়েছিলেন মতিঝিল জোনের ডিসি হারুনুর রশিদ। পুলিশের অভিযোগ নেতাকর্মীরা ‘গোপন বৈঠক’ করছিলেন।

জাসদ নেতারা বলছেন, এই বিষয়ে সব তথ‍্য জানিয়ে অনুমতি চেয়ে পুলিশের কাছে আবেদনও করেছিলেন তারা এবং এই বিষয়ে প্রমাণ হিসেবে হাজির করেছেন একটি আবেদনপত্র। সেখানে পুলিশের ‘রিসিভড’ সিল ও সই রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, তারা এই বিষয়ে কিছু জানেন না (বাংলা টিব্রিউন, ২৬ সেপ্টেমম্বর ২০২৬)। শুধু আবেদনই নয়, প্রতিনিধি সভায় মাইক ব্যবহার ও সভার নিরাপত্তার জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার ও ডিএমপির মতিঝিল বিভাগের ডিসি বরাবর গত ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর আবেদন করা হয়েছিল। দলটির পক্ষ থেকে, সেই আবেদনগুলো রিসিভও করা হয়; গণমাধ‍্যমগুলো সেরকমই জানিয়েছে। তাহলে ‘গোপন’ বৈঠকের বিয়ষটি কীভাবে আসলো? আবেদনের প্রমাণ হাজির হওয়ার পরও কেন পুলিশ থেকে বলা হচ্ছে, তারা এই বিষয়ে অবহিত নন।

 

এখন প্রশ্ন হলো কর্মী সমাবেশের অনুমতির নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই সেখানে নিজস্ব অফিসে অনুষ্ঠান করছিল জাসদ। তাহলে সেখানে মব হামলা এবং গ্রেফতারের কারণ কী? জাসদ কী নিষিদ্ধ দল? নিষিদ্ধ না হলে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে বাধা দেওয়া হবে কেন? সেখানে মব হামলা কারা করেছিল? পুলিশ কারা নিয়ে গিয়েছিল? এমনও নয় যে জাসদ নতুন রাজনৈতিক দল, তাই পুলিশ তাদের সম্পর্কে জানে না। আর না জানলেওতো কোনও দলের কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া যায় না, যাবে না।

প্রসঙ্গতই বলে রাখা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাসদ একটি বামধারার পুরনো দল। বিএনপির অনেক নেতা এবং বর্তমান সরকারের একাধিক মন্ত্রীও রয়েছেন যারা একসময় জাসদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং নেতা ছিলেন। যাদের ওপর হামলা কিংবা যাদের মব করে আটক করা হলো তাদের বিরুদ্ধে কোনও মামলা ছিল? তারা কি ফেরারি আসামি ছিলেন? আর কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা মামলা থাকলে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন; এটাইতো হওয়ার কথা। কিন্তু মব করে এবং হামলা চালিয়ে এবং গ্রেফতার করে কোনও রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমে বাধা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ‍্য নয়।

আমরা জানি মব একটি রাজনৈতিক সন্ত্রাস, এটি গণতন্ত্র এবং মুক্তচিন্তার পরিপন্থী। তাহলে ধরেই নেওয়া হচ্ছে, বিএনপির পছন্দের রাজনৈতিক দল ছাড়া কোনও রাজনৈতিক দল কর্মসূচি পালন করতে পারবে না?

এই গ্রেফতারের পেছনে আরও একটি কারণ উল্লেখ করা হয় যে, তাদের কাছে তথ‍্য আছে যে, সেখানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো জয় বাংলা স্লোগান দিলে কেন বা কোন আইনে গ্রেফতার করতে হবে? বিএনপি সরকার কী ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ নিষিদ্ধ করেছে? শুধু জাসদ অফিসের গ্রেফতারই নয়, এর আগে বিভিন্ন সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে কেন্দ্র করে অনেককেই গ্রেফতার করা হয়েছে, কিন্তু কেন? বিএনপিকে অবশ‍্যই খোলাসা করতে হবে, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান হলেই কেন আতঙ্ক, কেন গ্রেফতার?

‘জয় বাংলা’ এদেশের মানুষের জীবনের সর্ব‍্যশ্রেষ্ঠ অর্জন মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান। এটি উচ্চারণ করা কেন অপরাধ হবে? বিএনপি সবসময় নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের দল হিসেবে দাবি করে আসছে। তাহলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে বাদ দিয়েই সেই দাবি? যারা মুক্তিযোদ্ধো কিংবা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন, তাদের এমন কেউ আছেন, যিনি সে সময় ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করেননি। জয় বাংলাতো এই দেশের মুক্তিকামী মানুষের স্লোগান। এটি উচ্চারণ কেন অপরাধ হবে? কোনও আইনে অপরাধ হবে? কেন বিএনপি সরকার জয় বাংলা শুনলেই গ্রেফতারের জন‍্য উঠেপড়ে লাগছে? আর জয় বাংলা স্লোগান দিলে যদি গ্রেফতার চলতেই থাকে, তাহলে বিএনপিকে অবশ‍্যই এর পেছনের আইন দেখাতে হবে। তা না হলে এই ধরনের কারণ দেখিয়ে গ্রেফতার বন্ধ করতে হবে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ‍্য হলো মিরপুর-১ নম্বর সেকশনে অবস্থিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা-ভাঙচুর হয়েছে। ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ গণমাধ‍্যমে বলছেন, মুখোশ পরা অন্তত দুই শতাধিক ব্যক্তি নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে এবং তারা চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, সরকারি টিকা, নগদ টাকা ও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সামগ্রী লুট করে নিয়ে গেছে। কিন্তু সে ঘটনায় এত তরিৎগতিতে কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। তাহলে কাকে কোন ঘটনায় গ্রেফতার করা হবে এগুলো আসলে ‘অপরাধ’-কেন্দ্রিক নয়, বরং এগুলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যে সিদ্ধান্ত হয়তো আগে থেকে নেওয়াই থাকে।

বিএনপিকে কেন এগুলো করতে হচ্ছে? নির্বাচনের আগের বিএনপি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেগুলোর বিপরীতে অবস্থান নিচ্ছে বিএনপি। পুলিশ বাহিনীকে এরকমভাবে দলীয় মবে এবং রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার কাজে ব‍্যবহার কেন করা হচ্ছে? সরকারকে তাহলে এখনও ঘোষণা দিতে হবে সরকার কী তাহলে সকল রাজনৈতিক দলের কমসূচি পালন করতে দেবে না? বেছে বেছেই দিবে? জয় বাংলা এদেশের মুক্তি সংগ্রামের স্লোগান। এটি কেন সরকারের জন‍্য এতো এলার্জি হচ্ছে? তাহলে বলতেই হবে মব তাহলে আগের মতই রাষ্ট্রীয় আশকারা পাচ্ছে?

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয়।