Image description

রাসেল ইব্রাহীম 

বাংলাদেশের মোট শিক্ষার প্রায় ৯২ থেকে ৯৫ শতাংশ পরিচালিত হয় বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। মুষ্টিমেয় কিছু শিক্ষার্থী সরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পায়। অর্থাৎ, দেশের মেরুদণ্ড গড়ার মূল কাজটি করছেন বেসরকারি শিক্ষকরাই। অথচ যারা সবচেয়ে বড় অবদান রাখছেন, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে তারাই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত।

দেশে প্রায় পৌনে ছয় লক্ষাধিক এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনে পার্থক্য নেই। পার্থক্য ঈদ বোনাস, বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসাভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধায়।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বাড়িভাড়া পান মাত্র ১৫% যেখানে সরকারি শিক্ষকরা মূল বেতনের ৪৫%-৫০% পান। উৎসব ভাতা (ঈদ বোনাস) এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা পান মূল বেতনের ৫০% , যেখানে সরকারি শিক্ষকরা পান ১০০%। সরকারি চাকরিজীবী ও শিক্ষকরা যেখানে প্রতি মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান, সেখানে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা পান মাত্র ৫০০ টাকা। 

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসরের পর টাকা পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, যা সরকারি শিক্ষকদের ক্ষেত্রে অনেক সহজ ও গোছানো।

স্বাস্থ্যসেবা নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার। শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর হওয়া সত্ত্বেও তাদের এই নামমাত্র চিকিৎসা ভাতা দেওয়া এক ধরনের সামাজিক অবমাননা। তাছাড়া শিক্ষকদের বাড়তি টাকা খরচ হয় শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ রাখতে, সেক্ষেত্রে শিক্ষকদের কল ভাতা দেওয়া সবার আগে প্রয়োজন নয় কি?

অনেকেই যুক্তি দেখান, দেশের প্রায় পাঁচ লাখের ওপর এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীকে একবারে জাতীয়করণ করলে সরকারের ওপর বিশাল বাজেটের চাপ পড়বে। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে বড় চ্যালেঞ্জ মনে হলেও, এর একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক সমাধান রয়েছে। দেশের হাজার হাজার এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার লাখ লাখ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে প্রতি মাসে টিউশন ফি, সেশন ফি, ভর্তি ও পরীক্ষার ফি বাবদ এক বিশাল অঙ্কের টাকা আয় হয়। 

বর্তমানে এই অর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব ফান্ডে বা লোকাল গভর্নিং বডির নিয়ন্ত্রণে থাকে, যার একটি বড় অংশ নানা অডিট জটিলতা ও অপচয়ের কবলে পড়ে। সরকারের উচিত এইসব আয়ের উপর সুষ্ঠু নজরদারি দেওয়া এবং টাকাগুলো যেন সরকারি কোষাগারে জমা হয়, সেই পদক্ষেপ নেওয়া। এতে করে সরকারের বাজেট ঘাটতি বহুলাংশে পূরণ হবে। 

বৈষম্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফলাফল হলো বর্তমান বাংলাদেশ। কেউ সরকারি স্কুলে পড়বে, আর কেউ বেসরকারি স্কুলে পড়বে এই তকমা শিক্ষার্থীদের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আর এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ হলে মেধাবী শিক্ষকরাই উপকৃত হবে। মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতা পেশায় আসবে। পড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও কোয়ালিটিফুল লেসন পাবে। 

সরকার চাইলে ধাপে ধাপে জাতীয়করণ করতে পারে। এজন্য শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়। গুরুত্ব দেওয়া উচিত মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নে শিক্ষকরাই ভূমিকা রাখবে। তাছাড়া মানহীন এবং অপ্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিল করে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে এড করলে সরকারের অর্থের অপচয় কমে যাবে। 

শিক্ষামন্ত্রী আনম এহসানুল হক মিলন একদিন এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উদ্দেশ্য বক্তব্যে বলেছেন, আপনারা তো সরকারি হয়েই আছে, আর একটু ধাক্কা দিলেই তো সরকারি হয়ে যাবেন।  তিনি অলরেডি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করার একটা ধাপ বলে দিয়েছেন, সেই ধাপ হলো ' ধাক্কা '। এই 'ধাক্কা’ কে দেবে? দেশের যত শিক্ষক আছে, তাদেরকেই এই 'ধাক্কা’ দিতে হবে। যেভাবে তারা পার্সেন্ট হারে বাড়িভাড়া আদায় করেছেন, সেভাবেই আদায় করতে হবে। 

লেখক: শিক্ষক, আদর্শ একাডেমি ফরিদগঞ্জ ও গীতিকার