Image description

ঘন ঘন লোডশেডিং, সুতা ও রঙের অতিরিক্ত দাম এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ত্রিমুখী চাপে স্থবির হয়ে পড়েছে পাবনা ও সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। লোকসানের মুখ দেখে বন্ধ হয়ে গেছে বহু বিদ্যুৎচালিত তাঁত (পাওয়ারলুম) ও চিত্তরঞ্জন (সেমি অটোমেটিক) তাঁত। এতে কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন বহু ক্ষুদ্র তাঁতি ও শ্রমিক।

বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম বোর্ডের স্থানীয় বেসিক সেন্টারগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ দেশের অন্যতম বৃহৎ তাঁতসমৃদ্ধ এলাকা। দুই জেলায় বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম ও চিত্তরঞ্জন তাঁতের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার লাখ। এ অঞ্চলে উৎপাদিত শাড়ি ও লুঙ্গি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হয়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বিদ্যুৎসংকটের কারণে উৎপাদনের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ায় ও বাজারে উৎপাদিত পণ্যের কাঙ্ক্ষিত দাম না থাকায় মালিকরা কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম বোর্ড ও স্থানীয় তাঁতী সমিতি সূত্রে জানা যায়, সুতা প্রসেসিং, রং করা, শুকানো, নলি ভরা ও কাপড় বোনার মতো কাজে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন প্রায় সাড়ে বহু শ্রমিক। উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকে বাধ্য হয়ে রিকশা-ভ্যান চালানো কিংবা দিনমজুরির মতো বিকল্প পেশায় ভিড়ছেন।

পাবনার কুলুনিয়া গ্রামের তাঁতমালিক সৈয়দ আলী ও দোগাছী গ্রামের আবু জাফর জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জেনারেটর চালানো ছাড়া উপায় থাকে না। তবে বাজারে ডিজেলের সংকট ও চড়া দামের কারণে প্রতিদিন ৪-৫ ঘণ্টা জেনারেটর চালাতে গিয়ে অতিরিক্ত প্রায় দেড় হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। ফলে কাপড় তৈরির উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে।

একই গ্রামের সুতা ব্যবসায়ী কামাল ব্যাপারি ও ডায়িং মিলের মালিক দবির উদ্দিন বলেন, সুতা, রং, সোডা এসিডসহ সব উপকরণের দাম অনেক বেড়েছে। ৫০ কাউন্টের এক বেল সুতা এক বছর আগের ১৪ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ২০০ টাকায়। কাঁচামালের দামের বিপরীতে পণ্যের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

উৎপাদন কমে যাওয়ার চরম ধাক্কা লেগেছে শ্রমিকের মজুরিতে। সাঁথিয়ার তাঁতশ্রমিক আবুল হোসেন, রহম আলী ও মগরেব আলী জানান, আগে যেখানে দিনে তিন থেকে চারটি লুঙ্গির থান বোনা যেত, বিদ্যুৎ না থাকায় এখন সারা দিনে দুইটি থান তৈরি করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে আগে যেখানে সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা আয় হতো, তা এখন নেমে এসেছে এক থেকে দেড় হাজার টাকায়।

শাহজাদপুর হাটের পাইকারি বিক্রেতারা জানান, অতিরিক্ত উৎপাদন খরচের কারণে কাপড়ের দাম বেড়ে যাওয়া এবং আর্থিক মন্দার প্রভাবে বেচাকেনায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। রংপুর, ঢাকা বা চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা আগে প্রতি হাটে চার থেকে আট ট্রাক কাপড় কিনে নিয়ে যেতেন, তারা এখন মাত্র এক থেকে দুই ট্রাক কাপড় কিনছেন।

দেশের নানা প্রান্তের পাশাপাশি ভারতীয় ব্যবসায়ীরাও এখান থেকে শাড়ি-লুঙ্গি কিনতেন। স্থানীয় ব্যাংক ও ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে কাপড় বিক্রি, রপ্তানি ও ব্যাংক লেনদেন ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

বেড়া উপজেলা তাঁতী সমিতির সভাপতি আব্দুল গফুর এবং হ্যান্ডলুম অ্যান্ড পাওয়ারলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, তাঁতীদের একদিকে বিদ্যুতের বিল দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে চড়া দামে ডিজেল কিনে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না করলে এবং সরকারি নীতিগত সহায়তা না দিলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তাদের।

বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও উদ্ভূত সংকটের বিষয়ে পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ২-এর মহাব্যবস্থাপক আহমেদ শাহ আল জাবের জানান, তাঁতশিল্প অধ্যুষিত এই এলাকায় প্রতিদিন বিদ্যুৎ চাহিদা ৭৪ মেগাওয়াট। বিপরীতে সর্বোচ্চ পাওয়া যাচ্ছে ৬১ মেগাওয়াট। প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের অসুবিধার বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়েছে। সে অনুযায়ী সারাদেশে রেশনিং করে লোড ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে।