শেখ আশ্বাফুজ্জান এফসিএ
সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া সফরে এক প্রবাসী বাংলাদেশির সঙ্গে বেশ কয়েকবার দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ হয়েছিল। একসময় তিনি আমার সহকর্মী ছিলেন; বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার একটি স্বর্ণখনি কোম্পানিতে ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতি, সুশাসন, দুর্নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলার এক পর্যায়ে তিনি একটি বাক্য উচ্চারণ করলেন, যা এখনো আমার কানে বাজে।
তিনি বলেছিলেন, “বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হলো আমাদের প্রত্যেকের গায়ে সেঁটে থাকা অদৃশ্য ‘প্রাইস ট্যাগ’। দেশের অধিকাংশ মানুষেরই একটি নির্দিষ্ট মূল্য আছে; সেই মূল্য পরিশোধ করতে পারলে তাকে কেনা যায় কিংবা প্রভাবিত করা যায়।
কথাটি শুনে তৎকালীন মুহূর্তে প্রতিবাদ করিনি, আবার নিঃশর্ত সমর্থনও দিতে পারিনি। তবে বুক চিরে এক গভীর বেদনাবোধ জেগে উঠেছিল। কারণ, যখন পুরো জাতিকে এভাবে মূল্যায়ন করা হয়, তখন তা আর কেবল কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মন্তব্য থাকে না; তা হয়ে ওঠে আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার এক নির্মম আয়না।
আমরা কি তবে সত্যি এমন এক সমাজ গড়ে তুলছি, যেখানে সততা পণ্যের মতো বিকিকিনি হয়? যেখানে ব্যক্তিগত বিবেক দর-কষাকষির বিষয় আর নৈতিকতা কেবল রাজনৈতিক বা আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার অলংকার? কোনো প্রতিষ্ঠানে, প্রশাসনিক দপ্তরে কিংবা কোনো নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্তে যদি অর্থ, ক্ষমতা ও ব্যক্তিস্বার্থ সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রাধান্য পায়—তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বা প্রবাসীদের মনে আমাদের সম্পর্কে এমন ধারণার জন্ম নেওয়া খুব স্বাভাব।
তবে এই মুদ্রার আরেকটি উজ্জ্বল দিকও রয়েছে। বাংলাদেশ এখনো অসংখ্য সৎ, নীতিবান, সাহসী ও আপসহীন মানুষের দেশ। প্রচারবিমুখ এই মানুষগুলো কোনো প্রলোভনেই বিক্রি হন না। তাঁদের নীতি, আত্মমর্যাদা ও নৈতিক অবস্থানই আমাদের জাতির প্রকৃত সম্পদ। তাঁদের ওপর ভর করেই আজ অবধি সমাজ পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি এবং আমরা একটি উন্নত ভবিষ্যতের আশা রাখতে পারি।
একটি জাতির আসল শক্তি তার ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক সম্পদে কিংবা মেগা প্রজেক্টে নয়; জাতির আসল শক্তি তার মানুষের চরিত্রে। অর্থ দিয়ে হয়তো দৃষ্টিনন্দন সেতু, সড়ক বা উচ্চাভিলাষী অবকাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব, কিন্তু অর্থ দিয়ে কখনো সততা, ন্যায়বোধ, পারস্পরিক বিশ্বাস ও জাতীয় মর্যাদা কেনা যায়
আজ সময় এসেছে আমাদের নিজেদের মুখোমুখি দাঁড়ানোর। প্রত্যেকেরই নিজ নিজ বিবেকের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখা দরকার— ‘আমার মূল্য কি সামান্য কিছু টাকা কিংবা সুবিধায় নির্ধারিত, নাকি আমার সুদৃঢ় মূল্যবোধই আমার প্রকৃত পরিচয়।
যেদিন এই প্রশ্নের উত্তর আমরা প্রত্যেকে নিজ বিবেকের কাছে সততার সাথে দিতে পারব, সেদিনই বাংলাদেশ কেবল অর্থনৈতিক সূচকে নয়, বরং একটি সুশাসিত, মর্যাদাবান ও নীতিভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে সত্যি সত্যি মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে ?
লেখক: স্বতন্ত্র পরিচালক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেড