Image description

বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে বিল দিতে হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেও দিতে হচ্ছে ডিমান্ড চার্জ। নিজের টাকায় মিটার কিনেও মাসের পর মাস গুণতে হচ্ছে মিটার ভাড়া। একটি মিটারের দাম কতবার পরিশোধ করলে ভাড়া শেষ হবে, তারও কোনও সীমা নেই। এক বছর নয়, পাঁচ বছর নয়; সংযোগ যত দিন, মিটার ভাড়াও তত দিন।

এ নিয়ে গ্রাহকদের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। কিন্তু অভিযোগের সুরাহা হয়নি। বরং ডিজিটাল ও প্রিপেইড মিটার চালুর পর বিলের বিভিন্ন খাত নিয়ে বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে।

গ্রাহকেরা জানতে চান, মিটার কেনার দাম উঠে যাওয়ার পরও কেন ভাড়া দিতে হবে। বিদ্যুৎ ব্যবহার না হলে কেন ডিমান্ড চার্জ কাটা হবে। এসব খাতে প্রতিবছর কত টাকা আদায় হচ্ছে। সেই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে।

বিতরণ কোম্পানিগুলো বলছে, মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নেওয়ার যৌক্তিকতা রয়েছে। মিটার, সার্ভার, বিদ্যুৎ লাইন, সাবস্টেশন এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সচল রাখতে এই অর্থ ব্যয় হয়। তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, এই ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ করা হয় না।

মিটারের দাম উঠে গেলেও ভাড়া শেষ হয় না

দেশে বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে রয়েছে ডিপিডিসি, ডেসকো, বিপিডিবি, আরইবি, নেসকো ও ওজোপাডিকোসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসিক বিলের সঙ্গে মিটার ভাড়া নেওয়া হয়।

গ্রাহকদের হিসাবে, একটি সাধারণ এনালগ, ডিজিটাল বা প্রিপেইড মিটারের বাজারমূল্য ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। অথচ কেউ কেউ ১০ থেকে ২০ বছর ধরে মাসে ৪০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিচ্ছেন। মাসে ৪০ টাকা হিসাবে ১০ বছরে একজন গ্রাহক দেন ৪ হাজার ৮০০ টাকা। ২০ বছরে ৯ হাজার ৬০০ টাকা। এরপরও মিটারের মালিকানা গ্রাহক পান না। সংযোগ যত দিন থাকে, ভাড়াও তত দিন চলে।

গ্রাহক মোতাহার হোসেনের প্রশ্ন, মিটারের ক্রয়মূল্য ও যৌক্তিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় উঠে যাওয়ার পর ভাড়া বন্ধ হবে না কেন। এর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা কেন থাকবে না।

বিদ্যুৎ নেই, তবুও ডিমান্ড চার্জ

ডিমান্ড চার্জ নির্ধারিত হয় অনুমোদিত লোডের ভিত্তিতে। মাসে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে, তা মুখ্য বিষয় নয়। অনুমোদিত লোড থাকলেই নির্ধারিত অর্থ দিতে হয়। ফলে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বাসা, দোকান বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিলেও এই চার্জ আসে। গ্রামের অনেক বাড়িতে বিদ্যুৎ ব্যবহার শূন্য হলেও চার্জ দিতে হয়।

বিতরণ কোম্পানিগুলোর যুক্তি, অনুমোদিত লোড সরবরাহের সক্ষমতা প্রস্তুত রাখতে হয়। এজন্য সাবস্টেশন, ট্রান্সফরমার, তার, খুঁটি ও বিতরণব্যবস্থা সচল রাখতে হয়। বিদ্যুৎ ব্যবহার না হলেও অবকাঠামোর ব্যয় বন্ধ হয় না।

প্রিপেইড মিটারে আগেই কাটে টাকা

প্রিপেইড মিটারে রিচার্জের সঙ্গে সঙ্গেই মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ও অন্যান্য অর্থ কেটে নেওয়া হয়। ফলে এক হাজার টাকা রিচার্জ করলেও পুরো অর্থের বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। টাকা শেষ হলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। গভীর রাত বা জরুরি মুহূর্তে ব্যালান্স শেষ হলে ভোগান্তি বাড়ে।

গ্রাহকেরা বলছেন, পোস্টপেইড ব্যবস্থায় অন্তত বিল দেওয়ার সময় পাওয়া যেত। প্রিপেইডে আগাম টাকা দিয়েও কোন খাতে কত কাটা হচ্ছে, তার কোনো হিসাব তারা পান না।

টাকা যায় বিতরণ কোম্পানির হিসাবে

মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জের অর্থ সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা হয়। কোম্পানিগুলোর দাবি, এই অর্থ মিটার প্রতিস্থাপন, লাইন মেরামত, সার্ভার, ডাটা নেটওয়ার্ক, সফটওয়্যার ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়। বিদ্যুৎ বিলে যুক্ত পাঁচ শতাংশ ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা হয়।

কোম্পানিগুলো নিজেদের ইচ্ছেমতো এসব চার্জ নির্ধারণ করতে পারে না। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের ভিত্তিতে হার কার্যকর হওয়ার কথা। তবে গ্রাহকদের প্রশ্ন, প্রতিবছর কোন কোম্পানি কত টাকা আদায় ও ব্যয় করছে—তার প্রকাশ্য কোনও হিসাব নাই।

ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মিটারের মূল্য উঠে গেলে মাসিক ভাড়া বন্ধ করা যেতে পারে। বিকল্প হিসেবে এককালীন মূল্য নিয়ে মালিকানা গ্রাহককে দেওয়া যায়। স্মার্ট মিটারের সার্ভার ও ডাটা ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজন হলে পৃথক যৌক্তিক সেবা চার্জ নির্ধারণ করা যেতে পারে। ডিমান্ড চার্জেও গ্রাহকের ধরন ও সংযোগের অবস্থা বিবেচনায় ছাড় রাখা যেতে পারে।

‘কোনও জবাবদিহি নেই’

এ বিষয়ে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে। অনেক গ্রাহকের অতিরিক্ত বিল আসছে। কিন্তু এসব বিষয়ে কোনও জবাবদিহি নেই। আমরা ক্যাবের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানিয়েছি। মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘গ্রাহকেরা বিদ্যুৎ বিলের পাশাপাশি ভ্যাট ও কর পরিশোধ করেন। সে কারণে এসব অর্থ আদায় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা দাবি করার অধিকার তাদের রয়েছে। অনেক সময় গ্যাস, পানি বা বিদ্যুতের পর্যাপ্ত সেবা পাওয়া যায় না, কিন্তু বিল ও বিভিন্ন চার্জ নিয়মিত দিতে হয়। এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অথচ মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নিয়ে সরকারের দৃশ্যমান কোনও পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।’

‘রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করা হয়’

তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ আরিফ সাদেক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নেওয়া হয় রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের জন্য। এসব অর্থ সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানির হিসাবে জমা হয়। পরে মিটার, বিদ্যুৎ লাইন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণে তা ব্যয় করা হয়।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তারা অস্বীকার করছেন না। কিন্তু এর নামে অনির্দিষ্টকাল একই হারে অর্থ আদায় কতটা যৌক্তিক?

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, এগুলো গ্রাহকদের যৌক্তিক প্রশ্ন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জেনে পরে জানাবেন।