রাজীব হাসান
ওডিসির বয়স ২৭০০ বছর। তবু ওডিসি বেঁচে আছে আজও। অথচ দুই বছর না-পেরোতেই জুলাই অভ্যুত্থানের আবেদন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। এ আমার দাবি নয়, জুলাইয়ের আন্দোলনকারীদেরই গুমোট হাহাকার দেখি। কেন?
কেন আড়াই হাজার বছর পার করেও টিকে থাকে ওডিসি? এমনকি যখন বর্ণমালা ছিল না, ছিল না শিলালিপিতে ইলিয়াড-ওডিসির বিশালতা ধরে রাখার উপায়? সহজ উত্তর—গান।
গানে গানে টিকে ছিল ওডিসি। শিলালিপি ক্ষয়ে যায়, কাগজ পুড়ে যায়। কিন্তু যাকে পোড়ানো যায় না, ধ্বংস করা যায় না, তা হলো গণমানুষের মুখের গান।
যেকোনও বিপ্লবের জ্বালানি হলো গান। সেই বিপ্লবের প্রবাহিত ইতিহাস, বিপ্লবের চেতনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয় গানে। সেই কৈবর্ত থেকে একাত্তর; নব্বই থেকে জুলাই—আমাদের নিজস্ব গৌরবান্বিত বিদ্রোহের মূল জ্বালানিও ছিল গান।
জুলাইয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে গাওয়া ধনধান্য পুষ্পে ভরা এতটাই প্রকম্পিত করেছিল; এই সুরের অনুরণন ছড়িয়ে গিয়েছিল সারা দেশে। কারার ওই লৌহ কপাট সব দেয়াল ভেঙেচুরে বিদীর্ণ করার কানমন্ত্র ছিল। ‘কথা ক’ নামের র্যাপটি এমন মানুষকেও বারবার শুনতে দেখেছি, যিনি রবীন্দ্রসংগীতের বৃত্ত থেকেই বেরোতে চান না।
মুক্তির মন্দির সোপানতলে গানটি কতজন গেয়েছে! যাদের চোখে ছিল বিক্ষোভে শহীদ মলিন মুখে ভাষা জাগানোর, বন্দিশালার শিকল ভাঙার সংকল্পও।
অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের পর সবার প্রথমে, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হলো এই গান!
ডানপন্থিদের উত্থানে নীরবে সরে যেতে থাকলেন আন্দোলনের অন্যতম অংশীদার কবি- লেখক-শিল্পীরা। সবাই গেছেন এমন দাবি তো করা যায় না। তবে এই আন্দোলনকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে জুলাই।
ঠিক মনে নেই, দিনটি সম্ভবত ছিল ‘৩২ জুলাই’। ক্যালেন্ডারে যা ছিল ১ আগস্ট। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের এই দিনটিতে আন্দোলনকারীরা সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য রেখেছিলেন। কবি-লেখক-শিল্পীরা আগেও নানাভাবে, নিজেদের মতো করে আন্দোলনে ছিলেন। কখনও সামনে, কখনও আড়ালে। এই একটা দিন একসাথে রাজপথে নেমে এলেন। পরে তা আন্দোলনকে দিলো অন্যমাত্রা। অন্য ব্যাপকতা।
অথচ জুলাইয়ের পর সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর আঘাত এলো। গ্রামের যাত্রাপালা থেকে শহরের মঞ্চনাটকে বাধা এলো। ‘মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তির’ সিলটার কাঠামো ঠিক রেখে সেটিকেই ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ বানিয়ে ফেলা হলো।
জুলাইয়ের পর ‘জুলাই’কে নিয়ে আর কি কোনও প্রাণে শিহরণ জাগানিয়া, রক্তে হিন্দোল তোলা গান তৈরি হলো?
আমি সচেতনভাবে এই আন্দোলনে অংশ নেইনি। এর বিরুদ্ধেও দাঁড়াইনি। তাই কখনোই এর কৃতিত্বের কণাটুকু দাবি করি না। সমালোচনার বেলাতেও চেষ্টা করি বিরত থাকার।
গত দুই বছরে ফেসবুকে যে লেখা লিখতে গিয়েও শেষ পর্যন্ত লিখিনি, এমনকি লিখেও পোস্ট করিনি; তার সিংহভাগ জুলাই নিয়ে।
জুলাই হারিয়ে যাবে, টিকে থাকবে না—এসব যারা বলেন, তাদের সঙ্গে একমত হতে পারি না। কিন্তু জুলাইয়ে যে জাগরণ তৈরি হয়েছিল, পুরো দেশকে বদলে ফেলার সম্মিলিত কণ্ঠস্বর, সেটা বিভাজিত করা ছিল মস্ত বড় ভুল। একা মানুষ চিৎকার করতে পারে। কিন্তু কয়েকজনের সম্মিলিত চিৎকার রূপ নেয় গর্জনে। একার চিৎকার দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। গর্জন কাঁপিয়ে দিতে পারে সপ্ত-আসমান।
নিজেকে বারবার প্রশ্ন করি—কেন এই দেশে এক কী দেড় দশক পর পর একটা বড় আন্দোলন হয়, কিছু মানুষের প্রাণ ঝরে যায়। আবার সবকিছু আগের মতো চলতে থাকে?
জুলাই সবাই ভুলে গেলেও সেই মা কি ভুলবে কোনও দিন, আর কোলশূন্য, আঁচল কখনও শুকানোর সময়ই পায় না! এই দেশকে বদলাতে আর কত রক্ত দিতে হবে?
‘তাঁরা কি ফিরিবে আজ সু-প্রভাতে/যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে?’ এটাই তো আমার জিজ্ঞাসা? এর উত্তর সেই গানেই আছে—‘যাঁরা স্বর্গগত তাঁরা এখনও জানে/স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি।’ অথচ এই গানটার প্রাণই কেড়ে নেওয়া হলো!
জানি না, জুলাই নিয়ে নতুন করে কোনও শিল্পী গান বাঁধবেন কিনা। জুলাই কি ছাইচাপা আগুন, নাকি নিভে যাওয়া বারুদ? সময় এর উত্তর দেবে।
শুধু এতটুকু বলি, জুলাইয়ে যাকে গাইতে দেখেছি ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’, তাকে আবারও এক বছর পর গাইতে দেখেছি, ‘ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমাদেরই হাতে-পায়!’
লেখক: কথাসাহিত্যিক