Image description

বেসরকারি ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণেই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার।

তাঁর মতে, ভালো ও খারাপ ব্যাংককে এক কাতারে দেখায় ভালো ব্যাংকগুলোকেও দুর্নামের বোঝা বহন করতে হচ্ছে।

পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে সংকট সমাধান সহজ হবে না বলেও তিনি মনে করেন।
এক সাক্ষাৎকারে বস্ত্রশিল্পের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান পূর্বাণী গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, প্রায় চার দশক আগে বেসরকারি খাতের হাতে ব্যাংক দেওয়ার সময় ব্যাংকের উদ্যোক্তা ও পৃষ্ঠপোষকদের বিষয়ে যাচাইবাছাই করা হতো।
প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের বেশির ভাগ ব্যাংক ব্যবসায়ীদের হাতে ছিল।
 

তবে তৃতীয় প্রজন্মের পর থেকে ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বাড়তে থাকে।

এর ফলেই খাতটিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।


তিনি বলেন, বর্তমানে ১৫ থেকে ২০টি ব্যাংক ভালো অবস্থায় থাকলেও দুর্বল ব্যাংকগুলোর নেতিবাচক প্রভাব পুরো খাতের ওপর পড়ছে।

কিছু ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিশ্বাস ও মানুষের আস্থা কাজে লাগিয়ে অর্থ পাচারের অভিযোগও করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব এখনো ব্যাংক খাতে রয়ে গেছে। আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর ক্ষেত্রে সম্প্রতি পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন আবদুল হাই সরকার। তাঁর মতে, বাজারে ভালো ব্যাংক থাকা সত্ত্বেও কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে নতুন কাঠামো তৈরি করলেও আমানতকারীদের আস্থা অর্জন কঠিন হবে। তিনি বলেন, আমানতকারী ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকে অর্থ না রেখে নিরাপদ মনে করা অন্য ব্যাংকে চলে যেতে পারেন। ঢাকা ব্যাংকের বয়স ৩১ বছর উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সময়ে ব্যাংকটি কখনো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তারল্য সহায়তা চায়নি। অন্য ব্যাংকের সংকটের কারণে ভালো ব্যাংকগুলোকেও একইভাবে দেখার প্রবণতা তিনি ক্ষতিকর বলে মনে করেন। বর্তমান নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়েও তিনি কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, ব্যাংক খাতে পরিবর্তন ধীরে ধীরে আনতে হবে এবং নীতিনির্ধারণের আগে গবেষণা ও মূল্যায়ন প্রয়োজন। হঠাৎ করে নীতি চাপিয়ে দিলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া নতুন সার্কুলার জারি করার সংস্কৃতির সমালোচনা করেন তিনি। ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে নীতিগতভাবে ইতিবাচক পরিবর্তনের পক্ষে মত দেন আবদুল হাই সরকার। তিনি বলেন, কোনো ব্যাংকের লাভ থাকলেও মন্দ ঋণের বিপরীতে বড় অঙ্কের সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে গিয়ে যদি সব ধরনের লভ্যাংশ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। তাঁর মতে, নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সুযোগ থাকলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব বজায় থাকতে পারে। সরকারি ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, বেসরকারি ব্যাংক নিয়ে যত আলোচনা হয়, সরকারি ব্যাংকের দুর্বলতা ও খেলাপি ঋণ নিয়ে ততটা আলোচনা হয় না। অথচ সরকারি ব্যাংকগুলোতেও বড় অঙ্কের অর্থের অনিয়ম এবং খেলাপি ঋণের সমস্যা রয়েছে। ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় পরিচালনা পর্ষদ ও নির্বাহী ব্যবস্থাপনা উভয়ের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের নির্বাহী ব্যবস্থাপনার সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে অতীতে কিছু ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদের অতিরিক্ত প্রভাবের কারণে বড় অঙ্কের অর্থ বেরিয়ে গেছে, যা এখন উদ্ধার করা কঠিন। খারাপ ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একক কোনো পদ্ধতি অনুসরণের বিপক্ষে আবদুল হাই সরকার। তিনি বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় একত্রকরণ, একীভূতকরণ, বিলুপ্তিকরণ ও অধিগ্রহণ-এই চার ধরনের পদ্ধতির মধ্যে উপযুক্ত পথ বেছে নিতে হবে। কোনো দুর্দশাগ্রস্ত ব্যাংকের ঘুরে দাঁড়ানোর বাস্তব সম্ভাবনা না থাকলে শুধু তারল্য সহায়তা দিয়ে সেটিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা না করে বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।

তাঁর মতে, ব্যাংক খাতের সমস্যার সমাধান অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে করতে হবে। কোনো ব্যাংক আমানতকারীদের আস্থা হারালে শুধু সরকারি অর্থ ঢেলে তাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। তাই কোন ব্যাংক পুনরুদ্ধারের উপযুক্ত, তা আগে মূল্যায়ন করতে হবে।

খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে ঢাকা ব্যাংক ঋণগ্রহীতার ব্যবসা, সামাজিক পরিচয়, উত্তরাধিকার, পটভূমিসহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি দুর্বল থাকায় ঢালাওভাবে ঋণ বিতরণ করা হতো। বর্তমানে নতুন করে মন্দ ঋণ তৈরি করা তুলনামূলক কঠিন হয়েছে।

গত ছয় মাসে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, অতীতে দেওয়া ঋণের প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। আগে বিভিন্নভাবে যেসব ঋণ গোপন রাখা হয়েছিল, সেগুলো এখন প্রকাশ্যে আসছে। ফলে খেলাপি ঋণ বাড়ার একটি বড় অংশ পুরোনো সমস্যার প্রতিফলন।

ঢাকা ব্যাংকের ৩০০ কোটি টাকার বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে আবদুল হাই সরকার বলেন, ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নতুন করপোরেট অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকটি এখন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকিং, ক্ষুদ্রঋণ ও রিটেইল ব্যাংকিংয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাত এখন শুধু বড় করপোরেট অর্থায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ক্ষুদ্রঋণ, বড় ঋণ, রপ্তানি ও আমদানি অর্থায়নের মাধ্যমে ব্যবসার পরিধি বাড়ছে।

সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের তারল্য থেকে সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের বড় ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়ার সুযোগ কমে যায়। তাই ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ যত কম হয়, বেসরকারি খাতের জন্য তত বেশি অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে।

ডিজিটাল ঋণ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে গ্রাহকদেরও ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপদের ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তবে স্টার্টআপে ঋণ দেওয়ার আগে যথাযথ যাচাইবাছাই না করলে নতুন করে মন্দ ঋণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন।

প্রবাসী আয় বাড়াতে প্রবাসীদের জন্য আরও সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন আবদুল হাই সরকার। তাঁর মতে, ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীরা যথাযথ সুবিধা না পেলে তাঁরা হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর দিকে ঝুঁকতে পারেন। তাই রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে প্রবাসীবান্ধব ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতের সংকট নিরসনে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং, শক্তিশালী কিন্তু বাস্তবসম্মত নিয়ন্ত্রণ, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের যোগাযোগ, দুর্বল ব্যাংকের বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের ওপর জোর দেন ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান। তাঁর মতে, ব্যাংক খাতের সংস্কার হঠাৎ করে নয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে করতে হবে।