দীর্ঘদিনের সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর অবশেষে সাক্ষরিত হতে যাচ্ছে মার্কিন–ইরান শান্তি সমঝোতা চুক্তি। তবে এই চুক্তির নেপথ্য প্রক্রিয়া এবং এর স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের ভেন্যু বা স্থান নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তৈরি হয়েছে নানা জল্পনা ও কৌতূহল।
বিশেষ করে, প্রাথমিক মধ্যস্থতা পাকিস্তানকেন্দ্রিক হলেও চুক্তি স্বাক্ষরের চূড়ান্ত ভেন্যু হিসেবে করাচির পরিবর্তে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা কেন প্রাধান্য পাচ্ছে, তা এখন বড় আলোচনার বিষয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তান এবং এর করাচি–ইসলামাবাদ অক্ষ এই শান্তি চুক্তির মূল কারিগর হিসেবে কাজ করলেও আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রথাগত নিয়ম, লজিস্টিক সুবিধা এবং মার্কিন শীর্ষ নেতৃত্বের ইউরোপ সফরের বাস্তবতার কারণেই চুক্তি সইয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্তটির জন্য বেছে নেওয়া হচ্ছে জেনেভাকে।
ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক তীব্র সংকটের মুখে পড়ে। ওই বছর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইরানে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির সরকার উৎখাত হয়।
এরপর ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষাকারী দেশ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে সুইজারল্যান্ড। তখন থেকেই তেহরানে অবস্থিত সুইস দূতাবাস দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান, কনস্যুলার সেবা এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে আসছে। সুইজারল্যান্ড গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে।
এদিকে সুইজারল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে এই শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছে। কিন্তু চূড়ান্ত চুক্তি সইয়ের জন্য করাচি বা পাকিস্তানের কোনো শহরকে বেছে না নিয়ে কেন ইউরোপের দিকে ঝুঁকছে দুই পক্ষ?
এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, কূটনীতিতে ভেন্যু বা স্থান নির্বাচন একটি প্রতীকী এবং কৌশলগত বার্তা বহন করে। পাকিস্তান এই চুক্তির প্রধান মধ্যস্থতাকারী হলেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুইজারল্যান্ডের জেনেভা সবসময়ই একটি অত্যন্ত বিশ্বস্ত, নিরপেক্ষ এবং সুরক্ষিত শান্তির মঞ্চ হিসেবে স্বীকৃত।
এছাড়া জেনেভার ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ২০১৫ সালে ইরান ও বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি-জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ)-সংক্রান্ত প্রাথমিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল সুইজারল্যান্ডে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং ইউরোপীয় কূটনীতিকরা চুক্তির মূল কাঠামো নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছান। সুতরাং ইতিহাসের বহু বড় আন্তর্জাতিক সংকট সমাধানের সাক্ষী এই জেনেভা।
অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ফজলুল হালিম রানা বলছেন, সুইজারল্যান্ড দীর্ঘকাল ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে পরিচিত। ফলে সেখানে চুক্তি সই করলে কোনো পক্ষেরই রাজনৈতিক বা কৌশলগত অহংবোধে আঘাত লাগে না।
এছাড়া এই দুই বিশ্লেষকই বলছেন, চুক্তিটিকে আরও বেশি কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য করতে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চুক্তির প্রতি দায়বদ্ধ রাখতে এখানে ইউরোপকে যুক্ত করা হচ্ছে। কারণ ট্রাম্পের বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতিতে অতীতেও দ্রুত পরিবর্তন এসেছে, ভবিষ্যতেও আসতে পারে। ইউরোপীয় দেশগুলোর সম্পৃক্ততা থাকলে সে আশঙ্কা অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করেন তারা।
তবে ভেন্যু পরিবর্তনের অন্যতম বড় এবং তাৎক্ষণিক কারণ হলো মার্কিন শীর্ষ নেতৃত্বের সুবিধাজনক অবস্থান ও সময়সূচি। কূটনৈতিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে ফ্রান্সে বিশ্বনেতাদের জি-৭ (জি-সেভেন) সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই সম্মেলনে অংশ নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কিন সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইউরোপ সফরে থাকবেন। ফ্রান্সের সম্মেলনস্থলের খুব কাছাকাছি হওয়ায় ভৌগোলিক সুবিধার কারণে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাকেই চূড়ান্ত ভেন্যু হিসেবে নির্বাচন করা সহজ হয়েছে।
এদিকে ইরানি কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ভেন্যু হিসেবে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাকেও বিকল্প তালিকায় রাখা হয়েছিল। কারণ ভিয়েনাতেই জাতিসংঘের পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) অবস্থিত এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এর আগের বড় বড় আলোচনা সেখানেই হয়েছে। তবে সার্বিক লজিস্টিক সুবিধা এবং জি-৭ সম্মেলনের নৈকট্যের কারণে জেনেভাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ভেন্যু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
উল্লেখ্য, এই চুক্তির খসড়া তৈরিতে এবং ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্কের বরফ গলাতে অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি এই গোপন ও নিবিড় কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় নেতৃত্ব দিয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্যমতে, আলোচনা ও মধ্যস্থতার একটি বড় অংশ পাকিস্তানের বাণিজ্যিক রাজধানী করাচি এবং রাজধানী ইসলামাবাদকেন্দ্রিকভাবে সম্পন্ন হয়।
পাকিস্তানের এই অভূতপূর্ব কূটনৈতিক সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রস্তাবিত চুক্তিটির নাম ‘ইসলামাবাদ ঘোষণা’ (ইসলামাবাদ ডিক্লারেশন) রাখা হতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সুইজারল্যান্ডের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি এবং জটিল কূটনৈতিক সংকট মোকাবিলার অভিজ্ঞতাই দেশটিকে এই দায়িত্ব পালনে বিশেষভাবে উপযুক্ত করে তুলেছে। এটি পাকিস্তানের মধ্যস্থতার গুরুত্বকে বিন্দুমাত্র কমায় না; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি জটিল সমস্যার বহুপাক্ষিক সমাধানের অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র-েইরান শান্তি চুক্তি।