Image description

ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও কুমিল্লা জেলা পশ্চিম শাখার সাবেক সভাপতি জিসান মিয়া প্রধানের নিখোঁজ হওয়া ও বিয়ের প্রলোভনে বিধবাকে ধর্ষণের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ধর্ষণের অভিযোগ তোলা সেই নারীকে (২৫) গতকাল শুক্রবার (১২ জুন) বিকেল ৫টার দিকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানিয়েছেন তার বোন। 

শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, গতকাল (শুক্রবার) বিকেলে ১৫-২০ জন আমার বাবার বাড়িতে যান। তখন আমার বোনকে আর তার ছেলেকে তুলে নিয়ে যান। আমার বাবা একজন স্ট্রোকের রোগী, আমাদের পরিবারের কাউকে সঙ্গে যেতে দেওয়া হয়নি। তারা কারা ছিল, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে কিছুই বলেনি। আমরা বুঝতে পারি নাই কে নিয়ে যাচ্ছে, কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। পরে আমরা রাত ৭টা-৮টার দিকে খবর পাইছি আমার বোনকে আর তার ছেলেকে থানায় নেওয়া হয়েছে। তখন আমার বাবা আর চাচা থানায় যান। আমরা তখন আইনের মারফতে যাই। আইনে যা করে তাই হবে।

বোনের সঙ্গে সর্বশেষ কখন কথা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার বাবা আর চাচা আছেন ওখানে। ওখানে কী হচ্ছে না হচ্ছে আমি কিছুই বলতে পারব না। আমি আমার ছোট বাচ্চা নিয়ে শ্বশুর বাড়িতে আছি।

ওই নারীর বোন বলেন, কাউকেই নেয় নাই। আমার বাবা অসুস্থ, স্ট্রোকের রোগী। আমার মা মারা গেছে, মা নাই। আমার ছোট একটা বোন ছিল বাড়িতে। সে বুঝতেও পারেনি হঠাৎ লোকগুলো এসে তাকে নিয়ে চলে গেছে।

কী বলে নিয়ে গেছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মোবাইল কেড়ে নিয়ে কোনো কিছু বলারও সুযোগ দেয়নি। উঠিয়ে নিয়ে গেছে আর কী। কাউকে দেখতেও দেয়নি। পরবর্তীতে জানতে পারছি যে হেরা কই নিছে, তারপরে আমরা আইনের আশ্রয় নিছি। আমি আর কিছু জানি না।

এদিকে শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান। সংবাদ সম্মেলনে  ওই নারীকে তুলে নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পুলিশ সুপার বলেন, আমরা কোনো মেয়েকে তুলি নাই। মেয়েটা থানায় অভিযোগ করতে এসেছিল, মেয়েটা থানায় অভিযোগ দিয়েছেন- এই বলে সংবাদ সম্মেলন সমাপ্ত করেন পুলিশ সুপার।একই সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, শিবির নেতা জিসান মিয়া প্রধানকে উদ্ধারের পর কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আমরা ডাক্তারের কাছ থেকে তার শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাগজপত্র নিয়েছি। তিনি পুরোপুরি সুস্থ আছেন। চিকিৎসক তাকে ছাড়পত্র দিলে তাকে আদালতে তোলা হবে। তার নিরাপত্তায় পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।  নিকটাত্মীয়রা জিসানের সঙ্গে আছেন।

 

ঘটনার বিষয়ে জানতে ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি।

শনিবার সন্ধ্যায় শিবির নেতা জিসানের ভাই রাসেল রাফি ঢাকা পোস্টকে বলেন, জিসান বর্তমানে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছে। আমরা অনুমতি নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখি তিনি ঘুমোচ্ছেন। ধারণা করছি তাকে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। পরে আমরা ফিরে চলে আসি। এসব অভিযোগের বিষয়ে তার সঙ্গে কথা না বলা পর্যন্ত কিছুই বলতে পারছি না।

পুরোপুরি সুস্থ থাকার পরও কেন একজন রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না এ বিষয়ে জানতে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. শাহজাহানকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাত থেকে নিখোঁজ হন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও কুমিল্লা জেলা পশ্চিম শাখার সাবেক সভাপতি জিসান মিয়া প্রধান। পরিবারের পক্ষ থেকে তিনি নিখোঁজ হন বলে জিডি করা হয়। শুক্রবার (১৩ জুন) রাত ৮টা-৯টার দিকে জেলার লাকসাম জংশন এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

শনিবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, ২৫ বছর বয়সী এক বিধবা নারী বাদী হয়ে ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। মামলায় ওই নারী উল্লেখ করেন, গত ৫-৬ মাস আগে শিবির নেতা জিসানের সঙ্গে ওই নারীর ফেসবুকে পরিচয় হয়। একপর্যায়ে দুজন মোবাইলে কথা বলতে বলতে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান। গত ২০ মে শিবির নেতা জিসান তার দাউদকান্দির ভাড়া বাসায় নিয়ে ওই নারীকে ধর্ষণ করেন। 

পরে ওই নারী গর্ভবতী হয়ে পড়লে জিসান বাচ্চা নষ্ট করার জন্য চাপ দেন। জিসান তার চাচাতো ভাই সজীবকে দিয়ে বাচ্চা নষ্ট করার ওষুধ পাঠান। পরে ওই নারীর রক্তক্ষরণ শুরু হলে তা পুনরায় সজীবকে জানান তিনি। জিসান সজীবকে দিয়ে পুনরায় ওষুধ পাঠান। পরে ওই নারী সুস্থ হয়ে উঠে জিসানকে বিয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। গত শুক্রবার (১২ জুন) উভয়ের বিয়ের কথা ছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে সেই বিয়ে থেকে বিরত থাকতেই নিখোঁজের নাটক সাজান শিবির নেতা জিসান।