Image description

গত ১০ জুন সন্ধ্যায় দৈনিক প্রথম আলো তাদের ওয়েবসাইটে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে যার শিরোনাম, “‘থানা পুড়িয়ে দিয়েছি’ হুমকি দেওয়া সেই বৈষম্যবিরোধী নেতা ‘ধাওয়া খেয়ে’ আশ্রয় নিলেন থানায়”।

চমৎকার একটি শিরোনাম। কোন ঘটনা ‘সংবাদ’ হয়ে উঠতে গেলে সেটির মধ্যে যেসব উপাদান খোঁজা হয় সেগুলোর একটি হলো Oddity; যার বঙ্গানুবাদটি বেশ কঠিন: ‘অদ্ভুততা’। এর অর্থ নানাবিধ হতে পারে। তবে মূল কথা হল, এমন ঘটনা যেটির মধ্যে কমবেশি অস্বাভাবিকতা বা অদ্ভুতা বা বিষমতা আছে; যা কমনসেন্সের বা স্বাভাবিকতার কিছুটা বাইরে থাকে। Paradox; যার বঙ্গানুবাদ করা হয়েছে ‘আত্মবিরোধী ধারণা’ বা ‘স্ববিরোধী সত্য’। ‘প্যারাডক্স’ সংবাদ উপাদান হিসেবে Oddity এর অধীনে পড়ে। অর্থাৎ, কোন ঘটনায় স্ববিরোধী সত্য থাকলে সেটি ভালো সংবাদ।

প্রথম আলোর উপরের শিরোনামটি এই কারণে চমৎকার যে, তাতে বৈষম্যবিরোধী নেতা মাহদীর আচরণে একটা প্যারাডক্স বা স্ববিরোধী সত্য খুবই স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠেছে। যেই ব্যক্তি ৫ আগস্টের পর থানায় গিয়েই ওসিকে উদ্দেশ্য করে একদা সদর্পে বলেছিলেন (যদিও সেটা রেটোরিক, বাস্তবতা নয়), আমরা ‘থানা পুড়িয়ে দিয়েছি’, সেই লোকই যখন নিজে বিপদে পড়ে থানায় গিয়ে আশ্রয় চান, সেটি একটি প্যারাডক্সের জন্ম দেয়। মাহদীর আচরণের স্ববিরোধিতা তুলে ধরে।

প্রথম আলোর শিরোনামটি আরেকটি কাজও করেছে সফলভাবে। এমন ফ্রেমিংয়ের মাধ্যমে মাহদীর অতীতের ‘অপকর্ম’ (থানা পুড়িয়ে দেয়ার হুমকি) সামনে নিয়ে আসা গেছে এমন সময় যখন তিনি নিজে ভিকটিম হয়েছেন (ধাওয়া খাওয়া)। তার বর্তমান ভিকটিহুডের বিষয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার সুযোগ ছিল, শিরোনামটির ফ্রেইমিং সেটি তুলনামূলক কমাবে। উল্টো, পাঠকভেদে এই ফ্রেইমিংয়ের ফলে মাহদীর ভিকটিমহুড অনেকের মধ্যে সুখানুভুতিও তৈরি করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তার রাজনৈতিক বা আদর্শিক বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছেন যারা তাদের জন্য এটি খুবই উৎসবমূখর একটি উপলক্ষ্য এনে দিল। 

শিরোনামটি যে কারো কারো জন্য ‘উৎসবমূখ’ উপলক্ষ্য এনে দিয়েছে তার প্রমাণস্বরূপ প্রথম আলোর ফেসবুক পেইজে এই প্রতিবেদনের ফটোকার্ডের নিচের একটি মন্তব্য তুলে ধরছি, “মজা পাইলাম শুনে,আহারে বেচারা”।

এই ‘মজা’টা শুধু ওই একজন মন্তব্যকারী পাননি। বরং হাজারো ফেসবুক ব্যবহারকারীকে মজা দিয়েছে প্রথম আলোর শিরোনামের ফ্রেইমিং। পোস্টটিতে ১১ হাজারের কিছু বেশি মানুষ রিয়েকশন দিয়েছেন, যার মধ্যে ৭ হাজার ৭০০টির বেশি রিয়েকশন ছিল ‘হাহা’। একই ধরনের আরও ‘মজা’র উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, শিরোনাম এমন না হলেও কি মাহদীর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষগুলো তার আক্রান্ত হওয়ার এই ঘটনায় ‘মজা’ পেত না? এর উত্তরে বলা যায়, হ্যাঁ অনেকেই হয়তো ‘মজা’ পেত। কিন্তু প্যারাডক্সটি শিরোনামে তুলে ধরার ফলে মাহদীর প্রতিপক্ষের কাছে বিষয়টি বেশি দৃষ্টি আকর্ষণীয় হয়েছে, মজাদার হয়েছে। এটিও প্রথম আলোর ফেসবুক পোস্টের কমেন্ট সেকশন থেকে বুঝা যায়। দুইজন পাঠকের মন্তব্য তুলে ধরছি। একজন লিখেছেন, “প্রথম আলোকে ধন্যবাদ লা জবাব হেডলাইন”। আরেকজনের মন্তব্য , “হেডিং দেইখ্যা টাস্কি খাইছি”।

অর্থাৎ, শিরোনামটি আলাদাভাবে দৃষ্টি কেড়েছে অনেকেরই। এবং এটা একটি সংবাদমাধ্যমের সফলতা। বা অন্যভাবে বলা যায়, যিনি শিরোনামটি দিয়েছেন সেই কপি এডিটরের মুন্সিয়ানার পরিচয়।

প্রথম আলোর শিরোনামের ফ্রেইমিংয়ের কারণে মাহদীর আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাটি যেভাবে বেশিরভাগ পাঠকের কাছে (হাহা রিয়েকশন সংখ্যা হিসাব করে) হাস্যরসের উপাদান হয়ে ওঠেছে, কিম্বা অনেকের কাছে তার আক্রান্ত হওয়াকে ‘উচিত হয়েছে’ (ফেসবুক মন্তব্য) হিসেবে টেকেছে, তার দায় কি প্রথম আলোর?

না, অবশ্যই এর দায় প্রথম আলোর নয়। কারণ, প্রথম আলো অন্যায্যভাবে প্যারাডক্সটি তুলে ধরেনি। মাহদীর আচরণে প্যারাডক্স আছেই, সংবাদমাধ্যম শুধু সেটি সঠিকভাবে পয়েন্ট আউট করেছে; শিরোনামে নিয়ে এসেছে। এরপর পাঠকের যে নেতিবাচক রিয়েকশন সেটি একটি চমৎকার শিরোনামের বাইপ্রডাক্ট; এর চেয়ে বেশি কিছু বলার সুযোগ নেই।


১২টি সংবাদমাধ্যমের শিরোনামের কৃতিত্ব প্রথম আলোর

এখানে আরেকটি ধাঁধার সমাধান করা দরকার। কারো মাথায় প্রশ্ন আসতে পারে যে, ওইদিনের আরও বহু সংবাদমাধ্যমেও তো মাহদীকে নিয়ে একই ফ্রেইমিংয়ে শিরোনাম দেখেছি। তাহলে এই লেখক কেন প্রথম আলোর শিরোনামটিকে ফোকাসে রেখে আলোচনা করছেন?

ধাঁধার সমাধান হলো, অনলাইনে সার্চ করে ‘থানা পুড়িয়ে দিয়েছি’ শব্দগুচ্ছ দিয়ে শুরু করা শিরোনামটি ঢাকার অন্তত ১৩টি সংবাদমাধ্যমে পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে সবার আগে প্রকাশ করা প্রতিবেদনটি প্রথম আলোর। অর্থাৎ, প্রথম আলোর এরকম শিরোনাম করার পর বাকি সংবাদমাধ্যমগুলোতে হুবহু একই বা একইরকমের শিরোনামে এই খবরটি প্রকাশ করা হয়েছে।

এই ১২টি সংবাদমাধ্যমের শিরোনামের ফ্রেইমিংয়ের কৃতিত্বটি যে প্রথম আলোর তা বুঝা যায় কারণ সমকাল, ইত্তেফাকসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম প্রকৃতপক্ষে প্রথম আলোর প্রতিবেদনের উল্লেখযোগ্য অংশ কপি/পেস্ট আকারেই প্রকাশ করে দিয়েছে। 

সন্ধ্যা ৭টা ৫৩তে প্রকাশ করা প্রথম আলোর প্রতিবেদনটির শিরোনাম প্রায় একই রেখে ৮টা ৫১ মিনিটে প্রকাশ করা সমকালের প্রতিবেদনের কপি/পেস্ট করা অংশগুলো দেখুন নিচের স্ক্রিনশটে। 

 

ইত্তেফাক এর প্রতিবেদনে দৃষ্টি দিলেও পাওয়া যায় কপি/পেস্টের প্রমাণ। দেখুন নিচের তুলনামূলক স্ক্রিনশটটি।

 

 

এক্ষেত্রে সমস্যার বিষয়টি হলো, সমকাল, ইত্তেফাক বা অন্য যারা প্রথম আলোর শিরোনাম বা প্রতিবেদন কপি/পেস্ট করেছে বা আইডিয়া নিয়েছে সেসবের কোন কৃতিত্ব প্রথম আলোকে দেয়নি।

 

 

আশা করি এ পর্যায়ে ধাঁধাটির সমাধান হল যে, কেন এই প্রতিবেদনে শুধু প্রথম আলোর শিরোনামকে ফোকাস করে আলোচনাটি শুরু করা হয়েছে।

 

মিডিয়ার নাম

তারিখ ও সময়

শিরোনাম

প্রথম আলো

১০ জুন: ১৯:৫৩ (সন্ধ্যা ৭:৫৩)

‘থানা পুড়িয়ে দিয়েছি’ হুমকি দেওয়া সেই বৈষম্যবিরোধী নেতা ‘ধাওয়া খেয়ে’ আশ্রয় নিলেন থানায়

প্রিয়

১০ জুন: ২০:২২ (রাত ৮:২২)

‘থানা পুড়িয়ে দিয়েছি’ হুমকি দেওয়া সেই বৈষম্যবিরোধী নেতা ‘ধাওয়া খেয়ে’ আশ্রয় নিলেন থানায়

সমকাল

১০ জুন: ২০:৫১ (রাত ৮:৫১)

‘থানা পুড়িয়ে দিয়েছি’ হুমকি দেওয়া সেই বৈছাআ নেতা আশ্রয় নিলেন থানায়

রুপালি বাংলাদেশ

১০ জুন: ০৯:০৫ পিএম (রাত ৯:০৫)

থানায় আগুন দেওয়া সেই মাহদী এবার আশ্রয় নিলেন থানায়

ডেইলি স্টার

১০ জুন: ০৯:৪৯ অপরাহ্ন (রাত ৯:৪৯)

‘থানা পুড়িয়ে দিয়েছি’ বলা সেই বৈষম্যবিরোধী নেতা আশ্রয় নিলেন থানায়, ধাওয়ার অভিযোগ ছাত্রদলের বিরুদ্ধে

ইত্তেফাক

১০ জুন: ২১:৫৫ (রাত ৯:৫৫)

‘থানা পুড়িয়ে দিয়েছি’ হুমকি দেওয়া সেই বৈষম্যবিরোধী নেতা ‘ধাওয়া খেয়ে’ আশ্রয় নিলেন থানায়

সময় টিভি

১০ জুন: ২২:১১ (রাত ১০:১১)

‘থানা পুড়িয়েছি’ বলা বৈষম্যবিরোধী নেতা মাহাদী প্রাণভয়ে আশ্রয় নিলেন থানায়

বাংলাভিশন

১০ জুন: ২৩:০৩ (রাত ১১:০৩)

‘এসআই সন্তোষকে পুড়িয়ে মেরেছি’ বলা সেই মাহদী আশ্রয় নিলেন থানায়

আমাদের সময়

১০ জুন - প্রকাশ: ১১:৪২ রাত

‘থানা পুড়িয়ে দিয়েছি’ বলা সেই নেতা এবার আশ্রয় নিলেন থানায়

যুগান্তর

১১ জুন- : ১২:০০ এএম (রাত ১২:০০)

পুলিশকে পুড়িয়ে হত্যা করেছি বলা মাহদী থানায় আশ্রয় চাইলেন

ঢাকাট্রিবিউন

১১ জুন: ০২:৫০ (রাত ২:৫০)

আত্মস্বীকৃত থানা পুড়িয়ে দেয়া নেতা আশ্রয় নিলেন থানাতেই

রাইজিং বিডি

১১ জুন: ০৯:২১ (সকাল ৯:২১)

‘থানা পুড়িয়ে দিয়েছি’ হুমকি দেওয়া সেই মাহদী আশ্রয় নিলেন থানায়

ইত্তেফাক

১১ জুন: ১৬:৫৯ (বিকাল ৪:৫৯)

‘থানা পুড়িয়েছি’ বলা সেই মাহদী এবার পিটুনির শিকার, হাসপাতালে ভর্তি

 

বিচ্ছিন্ন শিরোনাম নয়, কিছু প্যাটার্ন অনুসরণ করছে প্রথম আলো

বিচ্ছিন্নভাবে মাহদী সংক্রান্ত প্রথম আলোর উপরের প্রতিবেদনটির শিরোনাম যদি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে তাতে ফুটে ওঠে সাংবাদিকতায় শিরোনাম লেখার মুন্সিয়ানার পরিচয়। কিন্তু যদি প্রতিবেদনটির ভেতরে আরেকটু লক্ষ্য করা যায়, তাহলে বাড়তি আরেকটি জিনিসও পাওয়া যাবে। সেটি হলো, প্রতিবেদনের ভেতরে ব্যবহার করা আরেকটি ছবি। ওই ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “আটক ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে নিতে গত ২ জানুয়ারি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় এসে ওসিকে হুমকি দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মাহদী হাসান। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া”।

অর্থাৎ, শিরোনামে মাহদীর বর্তমান ভিকটিমহুডের সময়ে তার অতীত ‘অপকর্ম’কে হাইলাইট করার কাজটি শুধু ‘শিরোনাম লেখার মুন্সিয়ানার’ উর্ধ্বে উঠিয়ে ‘অপকর্ম’র ওপর ফোকাস আরও বাড়াতে থানায় বসে হুমকি দেয়ার ছবিও যুক্ত করা হয়েছে প্রতিবেদনের ভেতরে।

প্রথম আলো কি এই প্রথম ‘জুলাইপন্থী’ পরিচয়ধারী কোন ব্যক্তির ভিকটিমহুডের খবরের সাথে তার অতীতের অপকর্মের তথ্য জুড়ে দিয়ে বা হাইলাইট করে সংবাদ প্রকাশ করলো? নাকি অতীতেও এরকমটা করেছে?

আবার ‘জুলাইবিরোধী’ বলে নিজেদের পরিচয় দেয় এমন পক্ষ– যারা আওয়ামী লীগ বা এর অঙ্গসংগঠন– তাদের ক্ষেত্রেও একইরকম ফ্রেইমিং করে কি প্রথম আলো? আওয়ামী লীগের কোনো নেতার বর্তমান কোন ভিকটিমহুডের খবরের সাথে তার অতীতের কোন অপকর্মকে যুক্ত করে দিয়ে শিরোনাম করে?

বিষয়গুলো একটু তলিয়ে দেখা দরকার। 

এই চিন্তা থেকেই প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে সার্চ শুরু করলাম দুইপক্ষ– অর্থাৎ যারা নিজেদেরকে ‘জুলাইপন্থী’ বলে পরিচয় দেন এমন ব্যক্তিরা এবং যারা নিজেদেরকে ‘জুলাইবিরোধী’ বলে পরিচয় দেন–  তাদের নানানভাবে আক্রান্ত হওয়ার খবরগুলো প্রথম আলো কীভাবে ফ্রেইম করে?

এখানে ‘জুলাইপন্থী’ শব্দটি ব্যাপকার্থে নেয়া হয়নি। ব্যাপকার্থে, রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের বিবেচনায় আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলো ব্যতিত বাকি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও সংগঠনগুলো ‘জুলাইপন্থী’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু আলোচ্য বিশ্লেষণ যে সংবাদটিকে ঘিরে সেটির মূল চরিত্র মাহদী হাসান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা হওয়ায় জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন (যেমন জাতীয় নাগরিক পার্টি, বিষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ইনকিলাব মঞ্চ ইত্যাদি) সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরকে এই আলোচনায় ‘জুলাইপন্থী’ হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীর মতো আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ সংক্রান্ত খবরগুলো উপেক্ষা করা হয়েছে এখানে।

অন্যদিকে ‘জুলাইবিরোধী’ বলে আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গসংগঠনকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে এই বিশ্লেষণে।

এই লেখাটি কোন গবেষণা নয়। ফলে প্রথম আলোর খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে খুবই কঠোর কোন পদ্ধতি (মেথোডোলোজি) মানা হয়নি। শুধু ‘জুলাইপন্থী’ এবং ‘জুলাইবিরোধী’ বলে উপরে সংজ্ঞায়িত দুটি পক্ষের যেসব লোক সম্প্রতি বিভিন্নভাবে ‘আক্রান্ত’ হয়ে সংবাদে এসেছেন তাদের সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো প্রথম আলোর ওয়েবসাইট থেকে বিচ্ছিন্নভাবে খুঁজে দেখা হয়েছে। এতে সব প্রতিবেদন সমানভাবে হয়তো ওঠে আসেনি। ‘আক্রান্ত’ বলতে হামলার শিকার, মামলার শিকার, কারাগারে থাকা এসব বিষয়কে বুঝানো হয়েছে।

সার্চে যেসব সংবাদ প্রতিবেদন পাওয়া গেছে সেগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এনসিপি-বৈছাআ সংশ্লিষ্ট আক্রান্ত ব্যক্তিদের এবং আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংবাদ কভারেজের ক্ষেত্রে  প্রথম আলো মোটাদাগে কয়েকটি প্যাটার্ন অনুসরণ করছে। সেগুলোই নিচে তুলে ধরা হলো।

১. অতীতের অপকর্মকে ‘হাইলাইট করা’ বনাম ‘উপেক্ষা করা’

“‘থানা পুড়িয়ে দিয়েছি’ হুমকি দেওয়া সেই বৈষম্যবিরোধী নেতা ‘ধাওয়া খেয়ে’ আশ্রয় নিলেন থানায়” শিরোনামটিতে যেভাবে মাহদীর অতীতের অপকর্মকে হাইলাইট করা হয়েছে, তেমন দৃষ্টান্ত আরও আছে ‘জুলাইপন্থী’ আরেক আক্রান্তের খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে।

চলতি বছরের ২৬ মার্চ প্রথম আলোর আরেকটি শিরোনাম ছিল, “ঢাবিতে ছাত্রলীগ অভিযোগ তুলে মারধরের ঘটনায় ‘জড়িত’ ছাত্রশক্তি নেতার গ্রামের বাড়িতে আগুন”।

এখানে ছাত্রশক্তির নেতার বাড়িতে আগুন দেয়ার মাধ্যমে তিনি যখন আক্রান্ত হচ্ছেন আওয়ামী লীগের দ্বারা তখন তখন ওই নেতার অতীতের অপকর্মকে শিরোনামে হাইলাইট করা হয়েছে।

কিন্তু আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যাদের বিরুদ্ধে নিকট অতীতে প্রকাশ্য অপকর্মের অভিযোগ বা প্রমাণ রয়েছে বা তাদের সম্পদ যখন ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর আক্রান্ত হয়েছে, তখন তাদের সেই অপকর্ম শিরোনামে হাইলাইট করা হয়নি। প্রথম আলো থেকে অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে এমন। 

যেমন, ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলন চলাকালে ১৫ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকারীদেরকে প্রকাশ্যে হুমকি দেন এই বলে যে, “ক্যাম্পাসে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের জবাব দিতে ছাত্রলীগ প্রস্তুত”। এই হুমকিমূলক বক্তব্যের পরদিনই ছাত্রলীগ ঢাবিসহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলা করে এবং বহুজনকে আহত করে। ১৬ ‍জুলাই পুলিশ ও আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের হামলায় ৬ বিক্ষোভকারী নিহত হন।

এর কয়েক মাস পর ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল, “নোয়াখালীতে ওবায়দুল কাদেরের গ্রামের বাড়িতে ভাঙচুর ও আগুন”। বৈছাআ নেতা মাহদী হাসান এবং যুবশক্তি নেতা সাইফুল্লাহর ক্ষেত্রে যেমন অতীতে তাদের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগকে শিরোনামে এনেছে পত্রিকাটি তেমনটা ওবায়দুল কাদেরের ক্ষেত্রে অনুসরণ করলে শিরোনামটি হওয়া উচিত ছিল, “জুলাই আন্দোলনকারীদের হুমকি দেয়া ওবায়দুল কাদেরেরে গ্রামের বাড়িতে ভাঙচুর ও আগুন”

একইভাবে ১৫ এপ্রিল ২০২৫ সালের প্রথম আলোর শিরোনামটি, “পঞ্চগড়ে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের বাড়ির একটি ঘরে আগুন”-- এমন না হয়ে হওয়া উচিত ছিল এমন: “জুলাই আন্দোলনকারীদের হুমকি দেয়া ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের বাড়ির একটি ঘরে আগুন”।

কারণ, সাদ্দামও ১৬ জুলাই ২০২৪ তারিখে আন্দোলনকারীদেরকে হুমকি দিয়েছিলেন এভাবে: “একটি ঘটনাও জবাব ছাড়া যাবে না”।

গণঅভ্যুত্থানের দিন ৫ আগস্ট প্রথম আলোর শিরোনাম ছিল, “চাঁদপুরে ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম খান ও তাঁর ছেলে শান্ত খানকে পিটিয়ে হত্যা”। প্রথম আলোর প্রতিবেদনের ভেতরে লেখা হয়েছে সেলিম খান ক্ষুব্ধ জনতার ওপর ওইদিন গুলি ছুঁড়েছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, সেলিম ওই এলাকার কুখ্যাত বালু মহালের মাফিয়া ছিলেন। অভ্যুত্থানের আগের এবং ওইদিনের সেলিমের অপকর্মের প্রসঙ্গ প্রথম আলোর শিরোনামে হাইলাইট করলে শিরোনামটি হওয়া উচিত ছিল, “চাঁদপুরে  জনতার ওপর গুলি ছোঁড়া ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম খান ও তাঁর ছেলে শান্ত খানকে পিটিয়ে হত্যা”

৫ আগস্ট প্রথম আলোর আরেকটি শিরোনাম ছিল, “শামীম-সেলিম ওসমানের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ”। ডেইলি স্টার পত্রিকার খবর মতে, ওইদিন শামীম ও সেলিম ওসমানের বাড়িঘরে হামলার আগে নারায়ণগঞ্জে শামীম ওসমান ও তার সহযোগীরা বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর গুলি ছঁড়েছিলেন। গুলি ছোঁড়ার ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে।

এক্ষেত্রে প্রথম আলোর শিরোনাম হওয়া উচিত ছিল, “জনতার ওপর গুলি ছোঁড়া শামীম ওসমানের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ”। কিন্তু বাস্তবে এমন শিরোনাম করা হয়নি।

বেশ চেষ্টা করা হয়েছে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের বর্তমানে আক্রান্ত হওয়ার খবরের সাথে অতীতের অপকর্মকে শিরোনামে হাইলাইট করা একটি প্রতিবেদন প্রথম আলোতে বের করার। কিন্তু সার্চে আসেনি। এটি হয়তো এই লেখকের সার্চের সীমাবদ্ধতা, অথবা এরকম আদৌ কোন শিরোনাম পত্রিকাটিতে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত হয়নি।

 

২. আক্রান্ত ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান ‘জুলাইপন্থী’ এবং অভিযুক্ত আওয়ামী হলে অভিযুক্তের পরিচয় উপেক্ষা করা

‘জুলাইপন্থী’ কেউ যখন আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট কারো দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ ওঠে তখন অনেক ক্ষেত্রেই অভিযুক্তের রাজনৈতিক পরিচয় উপেক্ষা করা হয় শিরোনামে। সাথে আক্রান্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ও অনেক সময় হাইলাইট করা হয় না। 

যেমন সর্বশেষ দুটি ঘটনার উদাহরণ টানা যেতে পারে প্রথম আলো থেকে। ১০ জুনের এক প্রতিবেদনের শিরোনাম, “নেত্রকোনায় গভীর রাতে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে দুর্বৃত্তদের আগুন”। অন্য একাধিক সংবাদমাধ্যমে এবং প্রথম আলোর প্রতিবেদনের ভেতরেও আগুন দেয়া ব্যক্তিদের মুখে আওয়ামী স্লোগান শোনা যাওয়ার তথ্য রয়েছে। এক্ষেত্রে আগুন দেয়া ব্যক্তিদেরকে ‘দুর্বৃত্ত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই ঘটনার ভিডিও প্রতিবেদনের শিরোনাম করেছে প্রথম আলো, “নেত্রকোনায় জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে আগুন, ছড়াল ভিডিও”। এই ভিডিওটি মূলত আওয়ামীপন্থী বিভিন্ন ফেসবুক পেইজ ও প্রোফাইল থেকে সোৎসাহে প্রচার করা হয়েছে। তবে প্রথম আলো শিরোনামটি কারা ছড়াচ্ছে তা ‘প্যাসিভ’ করে দিয়েছে। 

একই ঘটনা ঘটেছে একই দিন নেত্রকোনায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীদের উলঙ্গ করে জুলাই আন্দোলন বিরোধী বক্তব্য দিতে বাধ্য করে এবং উল্লঙ্গ অবস্থায় সেই বক্তব্য রেকর্ড করে ফেসবুকে ছেড়ে দেয়। প্রথম আলো এই ঘটনায় ‘প্যাসিভ’ শিরোনাম করেছে, “নেত্রকোনায় জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীকে হেনস্তার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে”। উলঙ্গ করে মারধর ওই জোরপূর্বক বক্তব্য রেকর্ড করার ঘটনাকে শিরোনামে ‘হেনস্থা’র মতো হালকা শব্দের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছে।

শুধু নেত্রকোণার দুটি ঘটনার ৩টি শিরোনাম নয়, নিকট অতীতে ‘জুলাইপন্থী’দের ওপর আওয়ামীদের হামলার আরও বহু ঘটনায় আক্রমণকারীর রাজনৈতিক পরিচয় উপেক্ষা করে শিরোনাম করেছে প্রথম আলো। যেমন, ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ও পরিকল্পিত হামলায় ৪জন নিহত হওয়ার ঘটনায় পত্রিকাটির শিরোনাম ছিল, “গোপালগঞ্জে সমাবেশ শেষে এনসিপির নেতা-কর্মীদের ঘিরে হামলা, ১৪৪ ধারা জারি”। এই ঘটনায় আরেকটি শিরোনাম ছিল, “গোপালগঞ্জে এনসিপির সমাবেশ ঘিরে হামলা-সংঘর্ষ, মৃত্যু বেড়ে ৪”। হামলাকারীদের আওয়ামী পরিচয় শিরোনামে উপেক্ষা করা হয়েছে।

২১ জানুয়ারি ২০২৫ এর একটি শিরোনাম, “চট্টগ্রামে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো দুজন গ্রেপ্তার”। প্রতিবেদনের ভেতরের তথ্য থেকে জানা যায় ওই ‘দুজন’ আসলে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।

তবে এই ধরনের সব প্রতিবেদনে যে, আওয়ামীদের রাজনৈতিক পরিচয় শিরোনামে আনা হয়নি, তা নয়। কিছু প্রতিবেদনে রাজনৈতিক পরিচয় হাইলাইট করা হয়েছে। 

 

৩. আক্রান্ত আওয়ামীদের রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল ও ইতিবাচক পরিচয় হাইলাইট

আওয়ামী লীগ গণঅভ্যুত্থানে পলাতক দল এবং পরে যেই দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বা অঙ্গসংগঠনের পরিচয় নেতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত। এমতাবস্থায় আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি যখন আক্রান্ত হন, তখন অনেক ক্ষেত্রেই (সবক্ষেত্রে নয়) আক্রান্তের রাজনৈতিক পরিচয়টি (যেমন: আওয়ামী লীগ নেতা, বা দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতা) শিরোনামে আড়াল করে তার পেশাগত বা অন্য কোনো ইতিবাচক পরিচয় (যেমন: বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট নাগরিক বা অধ্যাপক) সামনে নিয়ে আসা হয় প্রথম আলোর কভারেজে। 

প্রথম আলো ধারাবাহিকভাবে এমন শিরোনাম করেছে: 

“চৌদ্দগ্রামে মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছনা, এলাকা ছাড়তে হুমকি”

“বরগুনায় প্রকাশ্যে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডারকে হেনস্তা, ভিডিও ভাইরাল”

“চৌদ্দগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা লাঞ্ছনায় জড়িতরা শনাক্ত, ধরা পড়েননি কেউ”

“কুমিল্লায় মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়ে ৩০ বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতি”

“বীর মুক্তিযোদ্ধাকে জুতার মালা পরিয়ে লাঞ্ছনার ঘটনায় দুই সমর্থককে বহিষ্কার করল জামায়াত”

এসব শিরোনামে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় হিসেবে ‘মুক্তিযোদ্ধা’, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ কিংবা ‘মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার’ পরিচয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাঠকের সামনে এগুলো হাজির হয়েছে একজন মুক্তিযোদ্ধার অপমান বা লাঞ্ছনার ঘটনা হিসেবে।

কিন্তু এই ব্যক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়ও ছিল, যা হচ্ছে তারা স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন। অন্যান্য কোন কোন সংবাদমাধ্যমে এই ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় এবং পুরনো অপকর্মের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। 

যেমন, চৌদ্দগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা কানুকে নিয়ে দৈনিক কালবেলার একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “সেই কানুর ফাঁসি চেয়েছিল আ.লীগ”। কানুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি ২০১৬ সালে স্থানীয় যুবলীগ নেতাকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে আওয়ামী আমলেই হত্যাসহ ৮টি মামলা ছিল। যাদের কয়েকটির বাদী আওয়ামী লীগের অন্যান্য গ্রুপের নেতাকর্মীরা।

এখানে প্রশ্নটি কানু মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো, একজন ব্যক্তির একাধিক পরিচয়ের মধ্যে কোন পরিচয়টিকে সংবাদমাধ্যম শিরোনামে বেছে নিচ্ছে এবং কোন পরিচয়টিকে পেছনে সরিয়ে দিচ্ছে।

প্রথম আলোর শিরোনামগুলোতে আক্রান্ত আওয়ামী লীগারদের রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়কে ধারাবাহিকভাবে বেশি দৃশ্যমান করা হয়েছে। 

এরকম আরেকটি ঘটনা

৩২ নম্বরে গিয়ে মারধরের শিকার হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে নিয়ে প্রথম আলো শিরোনাম করেছিল, “৩২ নম্বরে গিয়ে মারধরের শিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জামাল উদ্দিন”। এখানে আক্রান্ত ব্যক্তির পরিচয় হিসেবে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক’ পরিচয়টিকেই সামনে আনা হয়েছে।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে একই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় প্রথম আলোর শিরোনাম ছিল, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক জামাল উদ্দীন গ্রেপ্তার”। এই ক্ষেত্রে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বা সংশ্লিষ্টতা শিরোনামে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুটি শিরোনাম পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন পরিচয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তিনি যখন হামলার শিকার, তখন তাঁর একাডেমিক পরিচয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক’ সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। আবার যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করেছে তখন ‘আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক’ পরিচয়টি শিরোনামে স্থান পেয়েছে। 

 

৪. মামলার শিকার আওয়ামীদের অপরাধ উল্লেখ না করে 'প্যাসিভ ফ্রেইমিং’

গণঅভ্যুত্থানে পলাতক আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, এমপি বা নেতাদের হত্যা ও দুর্নীতির বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তারের খবরগুলোতে প্রথম আলোর শিরোনামে সাধারণত তাদের বিরুদ্ধে থাকা সুনির্দিষ্ট এবং গুরুতর অভিযোগ (যেমন: হত্যা বা অস্ত্র মামলা) উহ্য রাখা হয়। শুধু 'গ্রেপ্তার' বা 'রিমান্ড' শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এমনকি জামিন পাওয়ার খবরেও ঠিক কোন অপরাধের মামলায় জামিন পেলেন, শিরোনামে সেটি এড়িয়ে যাওয়া হয় প্রথম আলোর কভারেজে।

উদাহরণ হিসেবে প্রথম আলোর কয়েকটি শিরোনাম দেখা যেতে পারে:

“আওয়ামী লীগের ‘আলোচিত’ সাবেক সংসদ সদস্য জান্নাত আরা হেনরী গ্রেপ্তার”

“কক্সবাজারের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি গ্রেপ্তার”

“ঢাকায় সাবেক সংসদ সদস্য কাজী মনিরুল ইসলাম গ্রেপ্তার”

“সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খান গ্রেপ্তার”

“সাবেক সংসদ সদস্য হাজি সেলিম গ্রেপ্তার”

“শিল্পী ও সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজ গ্রেপ্তার”

“সুনামগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান গ্রেপ্তার”

“রাজশাহীর আওয়ামী লীগ নেতা ডাবলু সরকার গ্রেপ্তার”

“কয়রার আওয়ামী লীগ নেতা বাহারুল ঢাকায় গ্রেপ্তার”

এসব শিরোনামের অনেকগুলোতেই ‘আওয়ামী লীগ নেতা’ পরিচয় নেই। বরং ‘সাবেক সংসদ সদস্য’, ‘শিল্পী’ ইত্যাদি পরিচয় হাইলাইট করা হয়েছে। আবার শিরোনামে গ্রেফতারের পেছনের অভিযোগের/অপরাধের উল্লেখ নেই। পাঠকের কাছে শিরোনাম পড়ে মনে হবে, ‘সংসদ্য সদস্য হওয়ার কারণে’ বা ‘আওয়ামী লীগ নেতা হওয়ার কারণে’ গ্রেফতার হয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে যে, হত্যা, সহিংসতা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, দুর্নীতি বা অন্য কোনো গুরুতর অভিযোগ আছে সেটা শিরোনামে অনুপস্থিত।

একই প্রবণতা তাদের রিমান্ডসংক্রান্ত শিরোনামেও দেখা যায়। যেমন: 

“৬ দিনের রিমান্ডে সাবেক সংসদ সদস্য কবিরুল হক”

সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান চার দিনের রিমান্ডে

“ঝিনাইদহে সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলামের দুই দিনের রিমান্ড”

“সাবেক সংসদ সদস্য শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিনের ৩ দিনের রিমান্ড”

“সাবেক সংসদ সদস্য লতিফের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর”

এখানেও পাঠকের সামনে রিমান্ডের তথ্য উপস্থিত আছে, কিন্তু সেই রিমান্ডের পেছনে থাকা অভিযোগের প্রকৃতি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিরোনামের বাইরে থেকে যায়।

অবশ্য ব্যতিক্রম যে নেই, তা নয়। কিছু শিরোনামে আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেফতারের পেছনের অভিযোগের উল্লেখ থাকে। যেমন:


“বগুড়ার সাবেক সংসদ সদস্য রাগেবুল আহসান দুই হত্যা মামলায় কারাগারে”

“মাদ্রাসাছাত্রকে খুনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো সাবেক এমপি ফজলে করিমকে”

“হত্যা মামলায় সাবেক জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন ৫ দিন রিমান্ডে”

“সাভারে হত্যা ও অস্ত্র মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা গ্রেপ্তার”