Image description

২০২৪ সালের বিপর্যয়ের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অস্তিত্বের সবচেয়ে দৃশ্যমান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে অনলাইন দুনিয়া, বিশেষ করে ফেইসবুক, ইউটিউব, টিকটক, টেলিগ্রাম, বোটিম ও হোয়াটসঅ্যাপভিত্তিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এখন দলটির প্রধান রাজনৈতিক ভরসাস্থলে পরিণত হয়েছে। শত শত পেইজ, চ্যানেল ও গ্রুপ তৈরি হয়েছে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পক্ষে আখ্যান নির্মাণের উদ্দেশ্যে। দেশে ও প্রবাসে ছড়িয়ে পড়া অনেক কর্মী-সমর্থক স্বেচ্ছায় এই ডিজিটাল লড়াইয়ে নেমেছেন। এক সময় যে দলটি বছরের পর বছর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল, আজ সেই দলটির রাজনৈতিক স্পন্দনের বড় অংশ সীমাবদ্ধ ডিজিটাল জগতে। এটি শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়। এটি এক ধরনের ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডিও।


নতুন বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের পক্ষে সবচেয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন একদল অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট। তারা ইউটিউবে লাইভ করেন। ফেইসবুকে পোস্ট দেন। টকশো পরিচালনা করেন। ভিডিও বানান। কেউ নিজেদের ‘ডিজিটাল যোদ্ধা’ হিসেবে পরিচয় দেন। কেউ দাবি করেন তারা ‘গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই’ করছেন। কেউ আবার সরাসরি শেখ হাসিনার পক্ষে প্রচার চালান। তাদের অনেকেই মনে করেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিকভাবে বেঁচে থাকার বড় অবলম্বন এখন এই অনলাইন নেটওয়ার্ক।


শুধু সমর্থকরা নন, শেখ হাসিনা নিজেও অনলাইন যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। ভার্চুয়াল মিটিং করছেন। নির্দেশনা দিচ্ছেন। অর্থাৎ, ক্ষমতা হারানোর পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কমান্ড কাঠামোর একটি বড় অংশ ডিজিটাল মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়েছে।


কিন্তু সমস্যা এখানেই। আজ আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত সাংগঠনিক নয়। বরং বাস্তবতা উপলব্ধির সংকট। দলটির অনলাইন পরিসরে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যেন ইউটিউবের ভিউ এবং ফেইসবুকের রিচই রাজনৈতিক শক্তির নতুন মানদণ্ড। যেন অনলাইন ন্যারেটিভই সবকিছু। কিন্তু অনলাইন জগৎ বাস্তব রাজনীতির বিকল্প নয়। ফেইসবুকের শেয়ার আর ইউটিউবের ভিউ রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করে না। টেলিগ্রাম গ্রুপ দিয়ে রাজনৈতিক আস্থা গড়ে ওঠে না। রাজনৈতিক দল টিকে থাকে মাঠের কর্মীদের ওপর। সেইসব মানুষের ওপর, যারা ঝুঁকি নেয়। যারা ভয় সত্ত্বেও সংগঠন ধরে রাখে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্চকণ্ঠ উপস্থিতি বাস্তব জনসমর্থনের সমার্থক নয়।


আওয়ামী লীগের বর্তমান অনলাইন কার্যক্রমে আরেকটি বড় সমস্যা হলো চরম বিভক্তি। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে নানা গ্রুপ তৈরি হয়েছে। কেউ নিজেদের ‘আসল আওয়ামী লীগ’ দাবি করছেন। কেউ অন্যদের ‘হাইব্রিড’ বলছেন। কেউ প্রবাসী নেতাদের আক্রমণ করছেন। কেউ আবার সাবেক মন্ত্রী বা ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। ব্যক্তিগত আক্রমণ, কাদা ছোড়াছুড়ি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা।


এই অনলাইন সংঘাত শুধু বিব্রতকর নয়। এটি রাজনৈতিকভাবেও ক্ষতিকর। আওয়ামী লীগের অনলাইন কর্মীরা যখন নিজেদের মধ্যেই একে অপরকে আক্রমণ করেন, তখন সাধারণ মানুষের কাছে দলটির ভাবমূর্তি আরো দুর্বল হয়। আওয়ামী লীগ বিরোধী শক্তিগুলো লাভবান হয়। সবচেয়ে বড় কথা, আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনও বিলম্বিত হয়। কারণ জনগণ বিভক্ত, বিশৃঙ্খল এবং আত্মঘাতী আচরণ পছন্দ করে না। একটি রাজনৈতিক দল যদি নিজেদের ভেতরেই স্থিতি তৈরি করতে না পারে, তাহলে জনগণের আস্থা অর্জন করা কঠিন হয়ে যায়।


কিছু অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। কারো বিরুদ্ধে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ আছে। কেউ নাকি ইউটিউব ভিউ ও রাজনৈতিক প্রচারণাকে ব্যবসায় পরিণত করেছেন। কেউ আবার বিদেশে বসে রাজনৈতিক আশ্রয় বা অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য অতিরঞ্জিত প্রচারণা চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য ছড়ানো ও বিভ্রান্তিকর ভিডিও বানানোর অভিযোগ আছে। ফলে আওয়ামী লীগের অনলাইন প্রচারণার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।


আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি সংস্কৃতি ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষের সমাজের একটি বড় অংশ ২০২৪ সালের জুলাই ও অগাস্টের আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। তারা সরকারের নানা দমনমূলক আচরণ, দুর্নীতি, কর্তৃত্ববাদ এবং রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতায় হতাশ ছিল। তারা পরিবর্তন চেয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী বাস্তবতা তাদের অনেককেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং ছাত্র আন্দোলনের কিছু নেতা-কর্মীর আচরণে এই শ্রেণির মানুষের একাংশ প্রতারিত বোধ করছেন। তারা দেখেছেন যে আদর্শিক রাজনীতির জায়গায় অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থ, ক্ষমতার লড়াই এবং গোপন সমঝোতা সামনে চলে আসে। কেউ কেউ মনে করেন, যাদের ‘নতুন রাজনীতি’র প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তাদের মধ্যেও পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির নানা উপাদান স্পষ্ট ছিল।


বাংলাদেশের সেক্যুলার, সাংস্কৃতিক এবং মুক্তিযুদ্ধপন্থি মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিখুঁত নয়। তাদের অবস্থানও সবসময় একরৈখিক নয়। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রশ্নে এই অংশটির গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আওয়ামী লীগের কিছু অনলাইন কর্মী এই মানুষদের সঙ্গে সংলাপ তৈরির বদলে তাদের আক্রমণ করছেন। কাউকে ‘ভণ্ড সেক্যুলার’ বলা হচ্ছে। কাউকে ‘মৌসুমী বুদ্ধিজীবী’ বলা হচ্ছে। কাউকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এই প্রবণতা রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী। কারণ মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সাংস্কৃতিক উদারতার পক্ষের এই শ্রেণির সমর্থন ছাড়া আওয়ামী লীগের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হওয়া কঠিন।


রাজনীতিতে ভুল হতে পারে। মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু সব সমালোচককে শত্রু হিসেবে দেখলে রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের উচিত হবে এই সেক্যুলার ও সাংস্কৃতিক বলয়ের মানুষদের প্রতি আক্রমণাত্মক ভাষা থামানো। তাদের উদ্বেগ শোনা। আত্মসমালোচনা করা। রাজনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য নতুন সামাজিক সংলাপ তৈরি করা। গালাগালি নয়।


আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাঠের বাস্তবতা। আজ যারা দেশের ভেতরে ঝুঁকি নিয়ে ছোট ছোট মিছিল করছেন, সাংগঠনিক যোগাযোগ রক্ষা করছেন, নেতা-কর্মীদের একত্র রাখার চেষ্টা করছেন, তাদের রাজনৈতিক মূল্য অনেক বেশি। কারণ তারা বাস্তব ঝুঁকি নিচ্ছেন। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। অনেকে গ্রেপ্তার হচ্ছেন। কেউ কেউ হামলার শিকার হচ্ছেন। সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ছেন। তারপরও তারা মাঠ ছাড়ছেন না। রাজনীতির ইতিহাসে শেষ পর্যন্ত এই ধরনের কর্মীরাই দলকে টিকিয়ে রাখেন।


অন্যদিকে বিদেশে বসে অনলাইনে বড় বড় কথা বলা তুলনামূলক সহজ। ইউটিউব লাইভ করা সহজ। ফেইসবুকে আবেগী পোস্ট লেখা সহজ। কিন্তু বাস্তব সংগঠন তৈরি করা কঠিন। রাজনৈতিক দলকে পুনর্গঠন করতে হলে এলাকায় এলাকায় সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক লাগে। মানুষের দরজায় যেতে হয়। ভীত কর্মীদের সাহস দিতে হয়। স্থানীয় পর্যায়ে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হয়। এই কাজগুলো অনলাইন স্টুডিও থেকে করা যায় না।


শেখ হাসিনার জন্যও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। তার উচিত হবে বিদেশে অবস্থানরত নেতা কিংবা অনলাইনকেন্দ্রিক প্রচারকদের চেয়ে তৃণমূলের সেইসব নেতা-কর্মীদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া, যারা এখনো দেশের মাটিতে থেকে সংগঠন ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। কারণ রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি শেষ পর্যন্ত মাঠে নির্ধারিত হয়। প্রবাসী কমিটি বা অনলাইন যোদ্ধারা একা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে পারবে না। ইতিহাসে কোনো বড় রাজনৈতিক দল শুধু ইউটিউব আর ফেইসবুকের ওপর দাঁড়িয়ে পুনরুত্থান ঘটাতে পারেনি।


আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রজন্মগত পরিবর্তন। নতুন প্রজন্মের বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা কোনো একক রাজনৈতিক বয়ানে বিশ্বাস করে। বরং তরুণদের বড় অংশ এখন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সন্দিহান। তারা রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন, দুর্নীতি, দলীয়করণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সমালোচক। আওয়ামী লীগের অনলাইন প্রচারণা যদি শুধুই ব্যক্তিপূজা বা অতীত স্মৃতিচারণে আটকে থাকে, তাহলে নতুন প্রজন্মের কাছে সেটি গ্রহণযোগ্যতা হারাতে পারে।


আওয়ামী লীগের সামনে এখন আত্মসমালোচনারও প্রশ্ন আছে। কেন এত দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকেও দলটি এমন এক অবস্থায় এসে দাঁড়াল যেখানে তাদের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে ইউটিউব লাইভ এবং ফেইসবুক পোস্ট। কেন মাঠের সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হলো। কেন সমালোচনা সহ্য করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। কেন দলটির ভেতরে বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি হয়নি। এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গেলে শুধু অনলাইন প্রচারণা দিয়ে রাজনৈতিক পুনরুত্থান সম্ভব নয়।


রাজনীতির যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত মাঠেই জিততে হয়। অনলাইন সেই যুদ্ধের একটি সহায়ক হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু মূল রণক্ষেত্র নয়। আওয়ামী লীগ যদি এই পার্থক্যটি বুঝতে পারে এবং অনলাইনের বিভক্তি কাটিয়ে একটি সমন্বিত কৌশলে মাঠে নামতে পারে, তাহলেই কেবল ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে।

 

-মো. আবু নাসের