রাজধানীর একটি বহুতল ভবন থেকে নিচে ফেলে এক তরুণী গৃহকর্মীকে হত্যার অভিযোগে এখন কারাগারে আছেন একজন উচ্চপদস্থ সরকারি প্রকৌশলী ও তার স্ত্রী। অন্যদিকে, খুলনায় আরেক অসহায় গৃহকর্মীকে নিয়মিত পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন এক পুলিশ দম্পতি।
আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই দুটি ঘটনাতেই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিলেও অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ হয়তো এখানেই শেষ হয়ে যাবে। কারণ বাংলাদেশে ধনী ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী কর্মকর্তা কিংবা সমাজের উঁচুতলার মানুষ তাদের আশ্রিত অসহায় খেটে খাওয়া মানুষের ওপর নৃশংসতা চালালেও অপরাধীর শাস্তি হওয়ার নজির মেলা ভার।
টাকা আর ক্ষমতার জোরে এসব প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পার পেয়ে যান বলে এই ধরনের আলোচিত মামলাগুলোতে সফল বিচারের কোনো দৃষ্টান্ত প্রায় নেই। গরম পানির ছ্যাঁকা, ব্লেডের ক্ষত কিংবা মাথায় গুরুতর আঘাতের বীভৎস ছবি দেখে বারবার এদেশের মানুষ শিউরে ওঠে। শুরুতে কিছু গ্রেপ্তারের নাটক হলেও শেষ পর্যন্ত পর্দার আড়ালে নীরবে সমঝোতা হয়ে যায়। দুর্বল তদন্ত আর প্রমাণের অভাবে আসামিরা শেষমেশ খালাস পেয়ে যান—এটাই এখানকার চেনা চিত্র।
ডোমেস্টিক ওয়ার্কার্স রাইটস এস্টাবলিশমেন্ট নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক আবুল হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেবল একটি মাত্র মামলায় আসামির শাস্তি নিশ্চিত করা গেছে। ২০১৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ১১ বছরের শিশু আদুরীকে নির্যাতন করে ঢাকার একটি ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সেই ঘটনায় গৃহকর্ত্রীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় আদালত।
প্রভাবশালী আসামিদের খালাস পাওয়ার পেছনের কারণ হিসেবে আবুল হোসেন জানান, ঘটনার শুরুতেই পুলিশ অনেক সময় প্রভাবিত হয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দুর্বল মামলা বা চার্জশিট তৈরি করে। তাছাড়া ভুক্তভোগীরা গরিব ও অশিক্ষিত হওয়ায় তারা আইন বোঝে না। উল্টোদিকে প্রভাবশালী মালিকেরা পুলিশকে হাত করতে পারেন, আবার ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বা টাকার লোভ দেখিয়ে আদালতের বাইরে আপস করতে বাধ্য করেন। ফলে মামলাগুলো অঙ্কুরেই নষ্ট হয়, অধরা থেকে যায় বিচার।
এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী সালমা আলী। তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা প্রথমে নথিভুক্ত হলেও পরে আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। শক্তিশালী সাক্ষী না থাকা এবং ভুক্তভোগীদের চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মামলাগুলো শেষ পর্যন্ত আদালতের বাইরে মিটমাট হয়ে যায়।
কল্পনা নির্যাতন মামলা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা
২০২৪ সালের অক্টোবরে ঢাকার বসুন্ধরায় ১৩ বছরের শিশু গৃহকর্মী কল্পনা আক্তারকে নির্যাতনের ঘটনা পুরো দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেই মামলাটিও এখন চিরচেনা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছে। আদালতের বাইরে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার জোর চেষ্টা চলছে।
কল্পনার ওপর যে বর্বরতা চালানো হয়েছিল তা শুনলে গা শিউরে ওঠে। পুলিশি প্রতিবেদন বলছে, তাকে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, কাঁচি দিয়ে হাত-পায়ের নখ উপড়ে ফেলা হয় এবং ঘর পরিষ্কার করার ব্রাশ দিয়ে পিটিয়ে সামনের দাঁত ভেঙে দেওয়া হয়। মারধরের চোটে তার ক্ষতগুলোতে পচন ধরে দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল। কিন্তু তার নিষ্ঠুর মালিক তাকে ডাক্তার না দেখিয়ে উল্টো সুগন্ধি বা পারফিউম স্প্রে করে সেই দুর্গন্ধ ঢাকার চেষ্টা করেছিলেন। চার মাস হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে তবেই সুস্থ হয় কল্পনা।
অথচ এই চরম নৃশংসতার পরও গত জুলাই মাসে আদালতে একটি আপস আবেদন জমা দেওয়া হয়। আবেদনে দাবি করা হয় যে পুরো ঘটনাটি নাকি কেবলই একটা “ভুল বোঝাবুঝি” ছিল।
তবে আদালত এই অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেনি। আপস আবেদনটি নাকচ করে দিয়ে বিচার চালু রাখার নির্দেশ দিয়ে ২৫ আগস্ট শুনানির দিন ঠিক করেছে আদালত। অবশ্য এই ফ্ল্যাটের মালিক এবং ঘটনার মূল দুই আসামি ভাই-বোন বর্তমানে দিব্যি জামিনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
বাদীর আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার টাইমস’-এর কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, টাকার বিনিময়ে এমন অমানবিক নির্যাতনের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হলে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক।
নৃশংস নির্যাতনের পরও সহজে জামিন
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাবেক এমডি এবং সিইও শফিকুর রহমানের বাসায় ১১ বছরের এক শিশুর ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। ছোট শিশুটির পুরো শরীরে জ্বলন্ত চুলা দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়াসহ অসংখ্য গভীর ক্ষত ছিল।
এই অপরাধে গত ২ ফেব্রুয়ারি বিমান বাংলাদেশের সাবেক এমডি এবং তার স্ত্রী বিথি আক্তারকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, তিন মাস পার হওয়ার আগেই গত ২৮ এপ্রিল মাত্র ৫ হাজার টাকার মুচলেকায় তারা আদালত থেকে জামিন পেয়ে যান।
একইভাবে চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সিমোন হাসান একা তার রামপুরার বাসায় গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা হলেও মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে যান।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী ফাহমিদা আক্তার বলেন, তদন্তের কচ্ছপগতির কারণে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দ্রুতই ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। এই সুযোগে আসামিরা আদালতের বাইরে সমঝোতা করে জামিন নিয়ে নেয়। শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা কোনো বিচার বা ক্ষতিপূরণ পায় না।
আলোচনার ঝড় উঠলেও সাজা হয় না
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত ছয় বছরে ১৪০ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সংবাদপত্রের খবর বিশ্লেষণ করে তৈরি এই প্রতিবেদন বলছে, এই ১৪০টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ৫০টির ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় ৬৫ শতাংশ নির্যাতনের ঘটনায় কোনো মামলাই হয়নি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র সমন্বয়ক আবু আহমেদ ফয়জুল কবির টাইমস’কে বলেন, ঘটনা যখন প্রথম জানাজানি হয়, তখন চারদিকে খুব শোরগোল হয়, মামলাও হয়। কিন্তু সংস্থাগুলো যখন পরবর্তীতে খোঁজ নিতে যায়, তখন দেখা যায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো নিজেরাই মামলা থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে।
সংস্থার নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান মনে করেন, একমাত্র কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব, যা সমাজে গৃহকর্মী নির্যাতন কমিয়ে আনবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)-এর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে ৭১৪ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৫০ জন মারা গেছেন, ৩৪৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন, ১৭ জন অপমানে-কষ্টে আত্মহত্যা করেছেন এবং ২ জন নিখোঁজ হয়েছেন।
বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ টাইমস’কে বলেন, ভুক্তভোগীদের মনে বিচার ব্যবস্থার ওপর এক ধরনের গভীর অবিশ্বাস কাজ করে। তারা ধরেই নেয় যে গরিব হয়ে ধনীদের বিরুদ্ধে বিচার পাওয়া যাবে না। তাছাড়া দারিদ্র্যের কারণে তাদের ওপর যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়, তার মুখে টিকতে না পেরে তারা শেষ পর্যন্ত কিছু টাকার বিনিময়ে মামলা তুলে নেয়।
শিশু গৃহকর্মীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা শাপলা নীড়ের সমন্বয়ক মাহফুজা পারভীন বলেন, খেটে খাওয়া মানুষজন জটিল আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে ভয় পায়। এর বড় কারণ মামলার পেছনে বিপুল খরচ, যা চালানো তাদের সাধ্যের বাইরে। তাছাড়া নিজেদের আইনি অধিকার সম্পর্কেও তাদের কোনো ধারণা নেই।