Image description

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শেখ বশির উদ্দিন এমন কয়েকটি সিদ্ধান্তে জড়িত ছিলেন, যা রাষ্ট্রের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি তৈরি করে তার ব্যবসায়িক স্বার্থকে এগিয়ে নিয়েছে।

২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর থেকে ১৬ মাস ধরে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়সহ তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা শিল্পোদ্যোক্তা বশির উপদেষ্টা হিসেবে তার ক্ষমতা ব্যবহার করে এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে সরকারি নথি ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

টাইমস অব বাংলাদেশের পর্যালোচনা করা সরকারি চিঠিপত্র, মূল্যায়ন নথি, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকারে দেখা গেছে, বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) সবচেয়ে মূল্যবান তিনটি সম্পদসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের সঙ্গে বশিরের যোগসূত্র রয়েছে। এসব সম্পদের সঙ্গে যুক্ত সম্মিলিত মূল্য প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

এক ঘটনায়, আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি একটি প্রতিষ্ঠানকে বিজয়ী নির্বাচন করার পরও লিজ প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করা হয় এবং পরে বশিরের মালিকানাধীন জনতা জুট মিল সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠে আসে।

আরেক ঘটনায়, তিনি এমন একটি লিজ-হার বাস্তবায়ন করতে চাপ প্রয়োগ করেন, যা কার্যকর হলে রাষ্ট্রের অন্তত ৪৪ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হতো। অন্য একটি ঘটনায়, প্রায় ২৫ হাজার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও করিম জুট মিলকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তরের সরকারি পরিকল্পনার বিরোধিতা করার কথা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম দুটি ঘটনাকে ‘স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সংজ্ঞা অনুযায়ী বাস্তবে দুর্নীতি’ বলে অভিহিত করেছেন।

কো-অপারেটিভ জুট মিলের ঘটনা

আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি কো-অপারেটিভ জুট মিলের ৬২ একর জমি লিজ দেওয়ার জন্য প্রাণ ডেইরি লিমিটেডকে একমাত্র রেসপনসিভ দরদাতা হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানটিকে লিজ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল।

২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত একটি ওয়ার্কিং কমিটির সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, এই লিজ থেকে ৩০ বছরে বিজেএমসি প্রায় ১১২ কোটি টাকা আয় করত।

কিন্তু পাঁচ সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় টেন্ডার প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করার উদ্যোগ নেয়। ৯ মার্চ ২০২৫ তারিখের এক চিঠিতে মন্ত্রণালয় প্রাণকে প্রথম রেসপনসিভ দরদাতা হিসেবে স্বীকার করলেও তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করে।

তৎকালীন বস্ত্র ও পাটসচিব এবং বর্তমান ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমি বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই টেন্ডার প্রক্রিয়া পুনরায় খোলা হয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত বশিরের প্রতিষ্ঠানের জন্য বিডিংয়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

তার মালিকানাধীন জনতা জুট মিল নতুন প্রক্রিয়ায় আবেদন করে এবং সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকা শর্টলিস্টেড আবেদনকারী হিসেবে উঠে আসে, যা স্বার্থের সংঘাত ও ক্ষমতার অপব্যবহারের উদাহরণ।

তবে বশির এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেন। তিনি বলেন, আগের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়িক পরিকল্পনাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি মানদণ্ড পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও আর্থিক শক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেন।

তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমি মানদণ্ড পর্যালোচনা করেছি ও পরিবর্তন করেছি।’ তার ভাষায়, ‘জনতা জুট মিলস যদি উন্মুক্ত টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়, তাহলে সেটিকে কেন স্বার্থের সংঘাত হিসেবে দেখা হবে?’

কর্মকর্তারা বলেছেন, কারিগরি ও আর্থিক দিক থেকে সবচেয়ে যোগ্য দরদাতা হিসেবে উঠে এলে বশিরের কোম্পানি ইজারাটি পাবে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকার কথা নিশ্চিত করলেও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

১৯ একরের বিরোধ

নরসিংদীর ঘোড়াশালে বাংলাদেশ জুট মিলস লিমিটেডের ১৯ একর জমির লিজ প্রক্রিয়াতেও বশির হস্তক্ষেপ করেছিলেন। টিকে গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান জুট অ্যালায়েন্স লিমিটেড প্রতি বর্গফুটে মাসিক ৬৩ পয়সা হারে দীর্ঘমেয়াদি লিজ চেয়েছিল, যা বিজেএমসির একটি কমিটির নির্ধারণ করা আড়াই টাকার তুলনায় অনেক কম।

আবেদনটি সরাসরি বশিরের কাছে পৌঁছায়। তিনি আবেদনপত্রে হাতে লেখা নির্দেশনা দিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে বিষয়টি ‘যৌক্তিকভাবে’ নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। পরে মন্ত্রণালয় সাত দিনের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন ও প্রস্তাব চেয়ে আবেদনটি বিজেএমসিতে পাঠায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজেএমসির এক পরিচালক টাইমসকে বলেন, ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বশির কর্মকর্তাদের জুট অ্যালায়েন্সের প্রস্তাবিত হারেই লিজ অনুমোদনের জন্য চাপ দেন। ওই হার রাষ্ট্রের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি ডেকে আনবে বলে বিজেএমসির প্রতিনিধিরা সতর্ক করলেও বশির তার অবস্থান পরিবর্তন করেননি বলে জানান ওই পরিচালক।

আরেক কর্মকর্তা জানান, বিজেএমসি বোর্ড ‘যৌক্তিকভাবে’ শব্দটিকে একটি সুরক্ষা হিসেবে বিবেচনা করে পুনঃমূল্যায়নের নির্দেশ দেয়। মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে পরিচালক মাসুম পাটোয়ারীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর জমা দেওয়া প্রতিবেদনে কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে প্রতি বর্গফুটে মাসিক ২ টাকা ১২ পয়সা ভাড়া নির্ধারণ করে, যা জুট অ্যালায়েন্সের চাওয়া হারের তিন গুণেরও বেশি।

নথি অনুযায়ী, বশিরের নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রের অন্তত ৪৪ কোটি টাকা ক্ষতি হতো। বিজেএমসি কম ভাড়ার প্রস্তাব অনুমোদন করতে অস্বীকৃতি জানায়।

টাইমসের সঙ্গে কথা বলার সময় বশির প্রথমে বলেন, তিনি বিষয়টি মনে করতে পারছেন না। তবে বিস্তারিত জানানো হলে তিনি বিষয়টি স্মরণ করেন।

তিনি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং ভোজ্যতেল উৎপাদনের যুক্তি দেখিয়ে জুট অ্যালায়েন্সকে কম দামে লিজ দিতে তার লিখিত নির্দেশনার পক্ষে সাফাই দেন। বিজেএমসি কর্মকর্তাদের ৬৩ পয়সা হারে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে চাপ দেওয়ার বিষয়টি বশির অস্বীকার করেন।

করিম জুট মিলও প্রশ্ন তুলেছে

তৃতীয় ঘটনাটি ছিল ডেমরার করিম জুট মিলসকে ঘিরে, যা বিজেএমসির সবচেয়ে বড় এবং মূল্যবান অবশিষ্ট সম্পদগুলোর একটি।

নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ৫০ একরের নদীতীরবর্তী এই জমিটিকে অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তরের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থিত এই স্থাপনায় কারখানা ভবন, গুদাম, ইউটিলিটি সংযোগ, গ্যাস সরবরাহ, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, শ্রমিক আবাসন ও একটি নদীবন্দর রয়েছে।

বেজার একটি কমিটি ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সম্পদের তালিকা প্রস্তুত করে এবং দুই সপ্তাহ পর নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের কাছে কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন জমা দেয়। মূল্যায়নে দেখা যায়, বিদ্যমান স্থাপনার প্রায় ৭০ শতাংশ সংস্কার করে উৎপাদনমুখী কাজে ব্যবহার করা সম্ভব, আর খালি জমিতে শিল্প প্লট গড়ে তোলা যাবে।

প্রতিবেদনটিতে সম্পদের মূল্য প্রায় ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয় এবং প্রায় ২৫ হাজার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়, যা সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প পুনর্বিকাশ প্রকল্প হতে পারত। তবে বশিরের দায়িত্বকালে এই প্রস্তাব আর অগ্রসর হয়নি।

মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, বশির অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন। অন্যদিকে, বেজার এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে বারবার চেষ্টা করা হলেও মন্ত্রণালয়ের প্রতিরোধের মুখে তা অগ্রসর হয়নি।

বশির নিজেও প্রস্তাবটির বিরোধিতা করার কথা টাইমসের কাছে স্বীকার করেন।

তিনি বলেন, ‘বেজা আপনাকে ঠিকই বলেছে। আমি এই বিষয়ে সহযোগিতা করিনি। আমার মত ছিল, জায়গাটি অর্থনৈতিক অঞ্চল না করে টাউনশিপ হিসেবে উন্নয়ন করা উচিত। ঢাকায় মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য আবাসনের তীব্র সংকট রয়েছে এবং আমার বিশ্বাস ছিল, এই সম্পদ সেই প্রয়োজন আরও ভালোভাবে পূরণ করতে পারবে।’

আকিজ-বশির গ্রুপ বা তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের এই সম্পত্তি অধিগ্রহণের আগ্রহ নেই বলে উল্লেখ করেন বশির।

জবাবদিহিতা বিহীন একটি ব্যবস্থা

অন্তর্বর্তী সরকারে যোগ দেওয়ার সময় ২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর বশির আকিজ বশির গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। পরে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভা থেকে বিদায়ের পর তিনি আবার সেই পদে ফিরে যান।

বিষয়গুলো নিয়ে আরও কথা বলতে গিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বশির তার সরকারি অবস্থান ব্যবহার করে এমনভাবে সরকারি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিলেন, যা তার নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং তার পছন্দের একটি প্রতিষ্ঠানের উপকারে এসেছে। ‘বশির দায়িত্ব গ্রহণের আগে যে অঙ্গীকার করেছিলেন, সেটিও লঙ্ঘন করেছেন,’ বলেন তিনি।

ইফতেখারুজ্জামানের মতে, ঘটনাগুলো বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থার বড় ধরনের ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে।

তিনি বলেন, ‘সরকারের রুলস অব বিজনেসে স্বার্থের সংঘাত ঠেকানোর জন্য কোনো স্পষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই। বিগত দিনের সরকারগুলো এমন কোনো বিশেষ আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে, যা সরকারের মন্ত্রী বা উপদেষ্টাদের স্বার্থের সংঘাত এড়াতে বা তা প্রকাশ করতে বাধ্য করবে।’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, ‘স্বার্থের সংঘাত প্রতিরোধে আইনি কাঠামো তৈরির দাবি আমরা দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারসহ কোনো সরকারই বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি।’