Image description
আলফাজ আনাম
 
আজকে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে যে সংঘাত ঘটছে এটি নিছক দুটি ছাত্র সংগঠনের প্রভাব বিস্তারের লড়াই নয়। এর শেকড় আরো অনেক গভীরে। যারা পেছনে কলকাঠি নাড়ছেন, তারা আছেন ক্ষমতা বলয়ের একেবারেই কেন্দ্রবিন্দুতে। শিবিরকে গুপ্ত বলে শ্লোগান দিলে, দেয়ালে দেয়ালে গুপ্ত , রাজাকার বললে - শিবিরের কিছুই যায় আসে না। হাসিনার দেড় দশকের শিবিরের ওপর যে নিপীড়ন হয়েছে তাতে কি শিবিরের রিক্রটমেন্ট কমেছে ? না কমেনি বরং বেড়েছে। সবগুলো বিবিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে শিবির জয়ী হয়েছে। শিবির যদি ঘোষণা দিয়ে মিছিল সমাবেশের কার্যক্রম বন্ধ করে, তাতেও শিবিরের কিছুই হবে না। তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলবে। ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি এভাবে চলে ।
 
 
তাহলে কেন এই সংঘাত ? এর উত্তর খুঁজতে যেতে হবে পেছনে। ১৯৯১ সালে নির্বাচনের পর বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ট আসনে বিজয়ী হয়। কিন্তু তা সরকার গঠনের মতো যথেষ্ট ছিলো না। জামায়াত অনেকটা নি:শর্ত সমর্থন দিলে বিএনপি সরকার গঠন করে। এর এক বছরের মাথায় ১৯৯২ সালের জানুয়ারি মাসে গঠন করা হয় ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি। এই কমিটি গঠনের আইডিয়া এসেছিলো কোথা থেকে? রাষ্ট্রের মালিকানাধীন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকের মাথা থেকে। যারা সাথে আরো কিছু লেখক - সাংবাদিক জড়িত ছিলেন। সেই সাথে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অগোচরে তার কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তাও এর সাথে জড়িয়ে পড়েন।
এরপর জামায়াতের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়। জামায়াত নেতারা মনে করলেন বিএনপি যেখানে তাদের রাজাকার আর ৭১ এর পরাজিত শক্তি বলে কোনঠাসা করছে তাহলে- আওয়ামীলীগ ও বিএনপির মধ্যে পার্থক্য কী? কি লাভ হলো বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে - এমন প্রশ্ন তুললেন কোনো কোনো নেতা । এরমধ্যে খবর এলো শেখ হাসিনা নিজেই নাকি জাহানারা ইমামকে পছন্দ করেন না। জামায়াতের সাথে আওয়ামীলীগের ঘনিষ্টতা বাড়তে থাকে। এরপর এক সাথে ৯৩ সালে সংসদ বর্জন। চরম বেকায়দায় পড়া বিএনপি ১৯৯৬ সালে ১২ ফ্রেবুয়ারি একতরফা নির্বাচন করে কেয়ারটেকার দাবি মেনে নেয়। সেই সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে বিদায় নেয়। পর ৯৬ সালের জুনে আরেকটি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২১ বছর আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এসে পুর্নজীবন পায়।
 
৯৩ সালে যারা গনআদালত গঠন করেছিলো তাদের ভাবশিষ্যদের অনেকে এখন প্রধানমন্ত্রীর আশে পাশে। তারা এখন পরিকল্পনা করছেন কিভাবে নানা জায়গা থেকে জামায়াত - শিবির বিতাড়িত করা যায়। এমনকি সাংবাদিকদের তালিকা করছেন। টকশোতে কারা যাবেন সে রকম তালিকাও করা হয়েছে।
 
এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে সেগুলো একই পরিকল্পনার অংশ। বিএনপি নেতাদের বোঝানো হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ন্ত্রন না করতে না পারলে যে কোনো সময় বিরোধী দল আন্দোলন করবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করা যাবে না। অপরদিকে প্রশাসনে গুপ্ত খেদাও শুরু করতে গিয়ে অর্ধেকের কাছাকাছি জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মী এমনকি আওয়ামী মন্ত্রীদের পিএসরা পর্যন্ত। কিন্তু রাজনৈতিক দলের ব্যকগ্রাউন্ড নেই এমন অনেক ধর্মভীরু ও সৎ অফিসার বাদ পড়ছেন। বিএনপির ভেতরে একপক্ষ আরেক পক্ষকে এখন গুপ্ত ট্যাগ দিয়ে কোনঠাসা করছে।
 
এর প্রভাব কিছুদিনের মধ্যে দেখা যাবে। সংসদে দুই রহমান যতই মধুর আলাপ করুক না কেন মাঠ পর্যায়ে সংঘাত তীব্র রুপ নেবে। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন বিরোধী দলের ওপর সরকারের দেয়া নির্দেশনার বাইরে গিয়ে নিপীড়ন চালাবে। মাঠের চাপে বিরোধী দলের নেতাকে শেষ পর্যন্ত সরকারকে সহযোগীতার রাজনীতি পরিত্যাগ করতে বাধ্য হতে হবে।
 
প্রধানমন্ত্রীকে বোঝানো হবে বিরোধী দল ষড়যন্ত্র করছে। ইতোমধ্যে বগুড়ায় জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করেছেন। গতকাল সংসদে জ্বালানী সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য বিরোধী দলীয় নেতার প্রস্তাব গ্রহন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রী বিরোধী দলের নেতার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু আপনি যখন ধীরে ধীরে ষড়যন্ত্র তত্বে বিশ্বাস করবেন তখন এই পরিবেশ আর স্থায়ী হবে না।
 
অনেকে হয়তো মানতে চাইবে না - ৯১ এবং ২০০১ সালের বিএনপি সরকারের চেয়ে এবারের বিএনপি সরকার অনেক দূর্বল। সংসদে বিএনপি বেশি আসন পেলেও ভোটের চিত্র মোটেও সুখকর নয়। বিএনপি এবার ৪৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এরমধ্যে সংখ্যালঘু ও আওয়ামীলীগের ভোট যদি ১৮ বা ২০ শতাংশ পেয়ে থাকে তাহলে বিএনপির প্রকৃত সমর্থকের ভোট এসেছে ২৬ থেকে ২৯ শতাংশ। অপরদিকে জামায়াত - এনসিপির ভোট ৩৮ শতাংশ। যারা সব সময় বিএনপিকে ভোট দেয় এমন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ভোটার জামায়াত এনসিপিকে ভোট দিয়েছে। মনে রাখতে হবে আওয়ামীলীগের ভোটাররা কখনো বিএনপির জন্য মাঠে সরব হবে না।
 
সামনে এই সরকারকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা করতে হবে। বিদ্যুত ও জ্বালানী পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রনের মধ্যে থাকবে না। বেশি দামে আর্ন্তজাতিক বাজার থেকে জ্বালানী কিনে এই ভর্তুকি চালিয়ে যাওয়া কোনো ভাবেই সম্ভব হবে না। সামনে তেলের পর বিুদ্যতের দাম বাড়াতে হবে। এমনকি আরো এক দফা জ্বালানীর দাম বাড়ানো লাগতে পারে।
 
এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দলের সাথে সহযোগিতা ও সহবস্থান ছাড়া শান্তিপূর্নভাবে রাষ্ট্রপরিচালনা করা কঠিন হবে। শুধু মাত্র বিদ্যুত ও সার নিয়ে যে ধরনের সামাজিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে তা মোকাবিলা করা সরকারের জন্য কঠিন হতে পারে। অতীতে বিএনপিকে বিদ্যুত নিয়ে কানসাট পরিস্থিতি আর সার নিয়ে কৃষক হত্যার দায় নিতে হয়েছে। বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে হাসিনা এই দুই ইস্যু সব সময় জীবন্ত রেখেছিলো। আওয়ামীলীগের মতো জামায়াত এই রাজনীতি করতে পারবে না। কিন্তু রাজনৈতিক ঐক্য ছাড়া সামাজিক অসন্তোষ নিয়ন্ত্রন করা অসম্ভব। বিরোধী দলের সাথে মাঠ পর্যায়ে সর্ম্পক খারাপ হলে এই সহযোগিতা আশা করা বৃথা। বরং আওয়ামীলীগের সমর্থকরা তা উস্কে দেবে। সামনে বিএনপিকে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। বিএনপি এখন রাজনৈতিক বুদ্ধি ও কৌশলের জন্য গনবিচ্ছিন্ন গুপ্ত বামদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এর মুল্য খালেদা জিয়াকে দিতে হয়েছে এখন তারেক রহমান কিভাবে দেন তা দেখার বিষয়।
 
আজকে একটি ফটো কার্ড নিয়ে থানার ভেতরে ছাত্রদল ডাকসুর কয়েকজন নেতাকে মেরেছে। রিউম্যার স্ক্যানারের মতো প্রতিষ্টিত ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা বলেছে এই ফটোকার্ড যার আইডি থেকে দেখানো হয়েছে তিনি তা করেননি। এছাড়া সেই ছেলে নিজে গেছে থানায় জিডি করতে সেখানে তাকে মারা হয়েছে। শেষে জানা গেলো আওয়ামী সমর্থক একটি আইডি থেকে প্রথম এটি ছড়ানো হয়। আবার শিবির এটি করেছে বলে প্রচারনা চালানো হয়। খালেদা জিয়া বলেছিলেন ছাত্রদলে আমি বস্তির ছেলে দেখতে চাই না। দুর্ভাগ্য হচ্ছে মাঠ পর্যায়ে ছাত্রদলের নেতৃত্ব বস্তির ছেলেদের হাতে চলে গেছে। শাহবাগি পতিত বাম আর বস্তির ছেলে দের নিয়ে তারেক রহমান প্রবল সামাজিক অসন্তোষের মুখে থাকা একটি দেশ কিভাবে চালাবেন তা আগামি ছয় মাসের মধ্যে স্পষ্ট হবে। তবে আলামত ভালো নয়।