অভ্যন্তরীণভাবে প্রবল অর্থ সংকটের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে নতুন সরকারের যাত্রা। আয়ের চেয়ে খরচ বেশি হওয়ায় অর্থ সংকট আরও প্রকট হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে সবার আগে উদ্যোক্তাদের আস্থার সংকট দূর করতে হবে। জরুরিভিত্তিতে সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করার পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পদক্ষেপ নিতে হবে ঋণের সুদের হার কমানোর। পাশাপাশি উন্নয়ন ঘটাতে হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। একই সঙ্গে সরকারকে আমদানি ও রপ্তানি বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এর জন্য কম সুদে ও সহজ শর্তে বৈদেশিক ঋণ সংগ্রহের পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। অপচয় ও দুর্নীতির লাগাম টানতে হবে। এতে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে। ব্যবসা-বাণিজ্য গতিশীল হবে। ফলে রাজস্ব আয় বাড়বে। এর মাধ্যমে সরকারের অর্থ সংকট ঘুচতে থাকবে।
সূত্র জানায়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকেই অর্থনৈতিক মন্দা বাড়তে থাকে। ২০২০ সালে করোনার সময় তা প্রকট আকার ধারণ করে। ২০২২ সালে বৈশ্বিক মন্দা শুরু হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তারা জাল-জালিয়াতি ও টাকা পাচার রোধ করতে সক্ষম হওয়ায় অর্থনীতির বৈদেশিক খাতে স্বস্তি ফিরে আসে। রিজার্ভ বেড়েছে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ খাতে চরম অস্বস্তি বিরাজ করছে। বিনিয়োগে নিদারুণ মন্দা, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সর্বকালের সর্বনিম্নে, রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের পতন, ব্যাংক খাত চাহিদা অনুযায়ী ঋণের জোগান দিতে অক্ষম। মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী ধারা এখনো অব্যাহত। এমন সব বহুমুখী সংকটের মধ্যেই বর্তমান সরকার ক্ষমতায় বসল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) ৬৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে পুঁজি হিসাবে বিনিয়োগ এসেছে খুবই কম। দেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগও কম। যে কারণে ঋণ প্রবাহ বাড়ার চাহিদা তৈরি হয়নি। জুলাই-ডিসেম্বরে এ খাতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৩২ শতাংশ। যা স্মরণকালের সর্বনিম্ন। এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে লুটপাটে দুর্বল ব্যাংক খাতও চাহিদা অনুযায়ী ঋণের জোগান দিতে পারছে না। ফলে ঋণ প্রবাহও বাড়েনি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, অর্থ সংকট দূর করতে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। এজন্য ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে হবে। উন্নয়ন করতে হবে ব্যবসার পরিবেশ। আমদানি-রপ্তানি বাড়াতে হবে। ব্যাংক খাতকে গতিশীল করতে হবে। তাহলে রাজস্ব বাড়বে। এর পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এতে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন বাড়বে, তেমনি সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা খাতে ভারসাম্য শক্তিশালী হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের অর্থ সংকটের আরও একটি বড় কারণ দুর্নীতি ও অপচয়। এটি রোধ করতে হবে। তাহলে সরকারি হিসাবে অর্থের প্রবাহ বাড়বে। সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে হবে দ্রুত। যাতে সরকারের আচরণে উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসে। একই সঙ্গে সরকারি খাতেও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। সরকার অবকাঠামো নির্মাণ করলে সেখানে বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে যাবে। সংশ্লিষ্টরা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহে ঘাটতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে দেশে বিনিয়োগ বাড়েনি। বর্তমান সরকারকে অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে সবার আগে ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে হবে। এর জন্য উদ্যোক্তাদের মধ্যে আগে আস্থার সঞ্চার করতে হবে। উন্নয়ন ঘটাতে হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির।
বিনিয়োগের জন্য পরিবেশ উন্নত করাসহ শিল্প খাতে গ্যাস-বিদ্যুতের জোগান নিশ্চিত করতে হবে। যেটি এখন নেই। ২০২২ সালের জুলাই থেকে মূল্যস্ফীতির হার নিয়ন্ত্রণ করতে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। যা এখনো চলমান রয়েছে। এতে সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬ শতাংশে ওঠেছে। একই সময়ে ডলারের দাম ৮৬ থেকে ১২৩ টাকা হয়েছে। যা ব্যবসার খরচকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ডলারের দাম এখন স্থিতিশীল রয়েছে। সুযোগ থাকলেও রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ানোর স্বার্থে ডলারের দাম কমানো হচ্ছে না। কিন্তু উদ্যোক্তারা জোর দাবি করেছেন ঋণের সুদের হার কমাতে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির হার কমেনি বলে ঋণের সুদের হার কমাচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় অংশই বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। এ জন্য স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে ঋণ প্রবাহ বাড়াতে হবে। এতে আমদানি-রপ্তানি বাড়বে। ২০২২ সাল থেকে ডলার সংকটের কারণে আমদানি ব্যবসায় মন্দা চলছে। এদিকে, ডলারের জোগান বর্তমানে বাড়লেও আমদানি ব্যবসা এখনো চাঙা হয়নি উদ্যোক্তাদের আস্থার অভাবে। আমদানি বাড়ানোর পদক্ষেপ নিলে এ খাতের ব্যবসা চাঙা হবে। পাশাপাশি আমদানির কাঁচামাল দিয়ে রপ্তানি বাড়ানোরও সুযোগ তৈরি হবে। গত ৫ মাস ধরে রপ্তানি আয় নিম্নমুখী। ফলে এ খাতকে অবকাঠামোগত সহায়তা দিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স বাড়ছে রেকর্ড পরিমাণে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স বেড়েছে ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে জানুয়ারিতেই বেড়েছে ৪৫ শতাংশের বেশি। এটি ধরে রাখতে হুন্ডির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স সেবা বাড়াতে হবে।
অর্থনীতিতে রক্ত সঞ্চালনের মতো কাজ করে ব্যাংক খাত। এ খাতটি এখন অত্যন্ত দুর্বল। কিছু ব্যাংক রপ্তানি আয়ের ডলারের টাকাও পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে খাতটিকে চাঙা করতে হলে চলমান সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায় বাড়াতে হবে। আমানতকারীদের উৎসাহ দিয়ে আমানতের প্রবাহও বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ব্যাংক খাতে তারল্য বাড়লে একদিকে ঋণের সুদের হার কমবে, অন্যদিকে ঋণ প্রবাহও বাড়বে। উদ্যোক্তারা যখন দেখবেন কম সুদে ঋণ মিলবে তখন তারা বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন। ব্যবসা চাঙা হলে, রেমিট্যান্স বাড়লে ও রপ্তানি খাত গতিশীল হলে ব্যাংক খাতেও টাকার জোগান বাড়বে।