একসময় নির্বাচনি পোস্টার আর উচ্চৈঃস্বরে মাইকিংয়ের মাধ্যমে ভোটের প্রচারণা ছিল জমজমাট। ছিল রঙিন লিফলেটের ছড়াছড়ি। রাজপথ থেকে মেঠোপথ, দেওয়াল, অলিগলি-সর্বত্রই ছিল পোস্টারের দখলে। দিন বদলে গেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর অনেক ক্ষেত্রেই পরিবর্তন দেখতে চায় দেশের মানুষ। সেই চিন্তা মাথায় রেখে নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারণায় বেশকিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। আগের নির্বাচনগুলোর মতো এবার প্রার্থীদের ইচ্ছামতো পোস্টার লাগানো যাবে না। উচ্চৈঃস্বরে মাইকিং এবং পিভিসি ব্যানার নিষেধ। দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সীমিত পরিসরে মাইকিং করার অনুমতি থাকলেও উচ্চ শব্দ এড়াতে হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় প্রচারণার জায়গা করে নিয়েছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছে প্রচারণার বড় ক্ষেত্র, যা দেশের মোবাইল ব্যবহারকারী, ভোটারসহ সবার ডিজিটাল স্ক্রিনজুড়ে চোখের সামনে ভাসছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনি প্রচারণায় এই নতুন মাত্রা সবাইকে প্রার্থীদের ব্যাপারে আরও আগ্রহী করে তুলেছে। কোন দলের কী প্রতিশ্রুতি, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে সবার কাছে। এর মাধ্যমে ভোটাররাও তাদের মতামত তুলে ধরছেন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্যান্য ভোটারের পাশাপাশি এবার চার কোটির বেশি তরুণ ভোটারকে টার্গেট করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ ডিজিটাল নানা প্ল্যাটফর্মে সরব সব দল, দলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। প্রচারে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন চিন্তা। প্রচারণা ও বক্তব্যের পাশাপাশি নির্বাচনি গানও পৌঁছে যাচ্ছে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটভিত্তিক সব মাধ্যমে। ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার অ্যাড লাইব্রেরির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নির্বাচন উপলক্ষ্যে এক মাসে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন বাবদ ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার মার্কিন ডলার। পোস্টার, লিফলেট, ব্যানারের জায়গায় এখন প্রার্থীদের লড়াই ভিডিও, গ্রাফিক্স, লাইভ ও রিলসকেন্দ্রিক কনটেন্টে। প্রযুক্তির প্রভাবে নির্বাচনি প্রচারণায় চিরাচরিত রূপ বদলে গেলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইসির নিয়ম মেনে মাইকিং বা উঠান বৈঠকও চলছে। তাও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রার্থীদের কাঙ্ক্ষিত এলাকার ভোটারদের কাছে। ফলে এবারের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ অনেকাংশেই স্মার্টফোনের স্ক্রিন এবং অনলাইন প্রচারনির্ভর হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ইমরান হোসেন বলেন, ডিজিটাল এই বিপ্লব প্রচারণাকে যেমন সহজ ও স্মার্ট করেছে, তেমনই ভোটারদের সামনেও সুযোগ করে দিয়েছে প্রার্থীর যোগ্যতা ও ইশতেহার নিবিড়ভাবে যাচাই করার। নির্বাচন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন ‘ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্র’। প্রার্থীদের দলীয় পেজের পাশাপাশি কর্মী-সমর্থকদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকেও চলছে প্রচারণা। স্বল্প অর্থে কনটেন্ট বুস্ট করে বার্তা (নোটিফিকেশন) পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর কাছে।
প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এক মাসে ন্যূনতম ১০০ ডলার খরচ করেছে এমন ১১২টি ফেসবুক পেজের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ১০০ ডলারের নিচে খরচ করা পেজগুলোর হিসাব মেটার বিজ্ঞাপনের তালিকায় না থাকায় প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ নির্ণয় করা মুশকিল। এই ব্যয় আরও কয়েকগুণ বলেই ধারণা। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রচারণায় ব্যয়ের হিসাবে এগিয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী।
মেটার হিসাবে, ডিজিটাল প্রচারে বিএনপির পক্ষে অন্তত ৫০টি পেজ থেকে ৩০ হাজার ৯১৬ ডলার ব্যয় করা হয়েছে। মোট বিজ্ঞাপনের সংখ্যা ২ হাজার ২২৪টি। ব্যক্তিগতভাবে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার ব্যয় করেছেন চট্টগ্রামের এক আসনের প্রার্থী। দলগতভাবে দ্বিতীয় অবস্থানে জামায়াত। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ৩৩টি পেজ থেকে ১১ হাজার ২২২ মার্কিন ডলার খরচ করা হয়েছে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও ডিজিটাল প্রচারে বিনিয়োগ করছেন। বাগেরহাটের এক স্বতন্ত্র প্রার্থী এক মাসে ব্যয় করেছেন ১ হাজার ৯০০ ডলার।
প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও বেসিসের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রাফেল কবির যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারণার প্রভাব বেশি। ছোট ছোট ভিডিও, মিম, পোস্ট ও বুস্টিংয়ের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তবে এই প্রচারণার প্রকৃত ব্যয় নির্ণয় করা কঠিন। কারণ, অধিকাংশ বুস্টিং ১০০ ডলারের নিচে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ কোটি ইন্টারনেট গ্রাহক রয়েছেন। এর মধ্যে ৬ কোটি ৫০ লাখ ফেসবুক, ৫ কোটি ইউটিউব এবং বাকিরা ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক ব্যবহার করেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ডিসেম্বরের জরিপ বলছে, দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন ১৩ কোটি ৬৯ লাখ মানুষ। যদিও বিটিআরসির হিসাবে এই সংখ্যা ১৮ কোটি ৭০ লাখ। এ বিশালসংখ্যক জনগোষ্ঠীর কাছে প্রার্থীরা নিজেদের ইশতেহার, নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি জানান দিচ্ছেন ডিজিটালি।
প্রার্থীরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার ভোটারের কাছে বার্তা পৌঁছানো সহজ নয়। এজন্য কনটেন্ট তৈরি, টার্গেটিং ও প্রচারে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। পাশাপাশি প্রায় সব প্রার্থীই ডিজিটাল প্রচারণার জন্য আলাদা জনবল নিয়োগ দিয়েছেন। দিনরাত কাজ করছেন ভিডিও এডিটর, গ্রাফিক্স ডিজাইনার, এসইও বিশেষজ্ঞ, এমনকি এআই প্রম্পট ইঞ্জিনিয়াররাও। ছোট ভিডিও, গান, নাট্যাংশ, সাক্ষাৎকার, জনসভা ক্লিপ ও মিম-সব ধরনের কনটেন্টই ব্যবহার করা হচ্ছে প্রচারণায়। নিজস্ব টিমের বাইরে রাজনৈতিক দলের ডিজিটাল টিমের কর্মী, বিজ্ঞাপনী সংস্থা ও অনলাইন মার্কেটিং যুক্ত হয়েছে বুস্টিং ও প্রমোশনের কাজে।
ইতিবাচক প্রচারণার পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থকরা আলাদা ওয়েবসাইটও বানিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারাতে নানারকম মিম ও ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্টকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছে। ভুয়া ফটোকার্ড, এআই দিয়ে বানানো ভিডিও প্রচারণায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানারের পরিসংখ্যান বলছে, সংসদ নির্বাচন ঘিরে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০৯টি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
নির্বাচনে অপতথ্য প্রচার ঠেকাতে সমন্বিতভাবে কাজ করছে সরকারের একাধিক সংস্থা-জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি (এনসিএসএ), প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সঙ্গেও সমন্বয় করছে এনসিএসএ।
তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, মিস-ইনফরমেশন ও ক্ষতিকর ন্যারেটিভ মোকাবিলায় মাল্টিপল ডিপার্টমেন্ট ও এজেন্সির সমন্বয়ে একটি হাই-পাওয়ার কমিটি কাজ করছে।