Image description
ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি-অঙ্গীকারের ছড়াছড়ি

প্রতিবারই নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অন্তহীন প্রতিশ্রুতির কথা শোনা যায়। দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করাসহ অনেক কিছুরই আশ্বাস দেন তারা। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে সেই প্রতিশ্রুতির বেশির ভাগেরই বাস্তবায়ন চোখে পড়ে না। অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি কার্যকর হয় না সরকারে গেলেও।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে শেখ হাসিনা ১০ টাকা সের দরে চাল খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে দুর্নীতি বন্ধ করে সুশাসন কায়েম করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু পরবর্তী সাড়ে ১৫ বছরের শাসনে এগুলোর বাস্তবায়ন দূরে থাক; উলটো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল দেশে।

এর আগে ও পরে অন্য সরকারগুলোর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন জনগণের চোখে পড়েনি। ফলে দেশের অধিকাংশ ভোটার দলগুলোর প্রতিশ্রুতির ওপর এখন আর আস্থা রাখতে পারছে না। তারা এর সত্যিকার বাস্তবায়নের জন্য সঠিক রূপরেখার কথা জানতে চায়।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এবারও ভোটের মাঠে প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের ছড়াছড়ি দেখা যাচ্ছে। প্রতিদিনই রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা ও প্রার্থীরা নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাইছেন। কেউ বলছেন, বিজয়ী হলে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়বেন। সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতে কেউবা দিচ্ছেন নানা ধরনের কার্ড ও ভাতার প্রতিশ্রুতি। এছাড়া বিগত সময়ের মতো কর্মসংস্থান, উন্নয়ন, সুশাসন নিশ্চিতের কথাও বলা হচ্ছে। তবে ভোটারদের চাওয়া হলো, শুধু প্রতিশ্রুতি দিলেই চলবে না। প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রূপরেখাও জানাতে হবে।

একই কথা বলছেন, রাজনীতি ও নির্বাচন বিশ্লেষকরাও। তাদের মতে, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির বিষয়ে এখনই প্রত্যেকটা দলকে তাদের পথরেখা স্পষ্ট করতে হবে। কীভাবে প্রতিশ্রুতিগুলো তারা বাস্তবায়ন করবে তা বিস্তারিতভাবে জনগণকে জানাতে হবে। কারণ রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীদের হাতে কোনো জাদুর কাঠি নেই যে ক্ষমতায় গেলেই সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়ে যাবে। অবশ্য রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিস্তারিত বিবরণ থাকছে।

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না, বাস্তবায়নের রূপরেখাও জানাতে হবে। কারণ এক দল বলছে ফ্যামিলি কার্ড দেবে। এখন এক কোটি মানুষকে দিতে গেলে কত কোটি টাকা লাগবে? পাঁচ বছরে সেটা কত কোটি টাকা হবে? সেই টাকাটা কোথায় থেকে আসবে? বেকার ভাতার কথা বলা হচ্ছে, সেটা কতদিনের জন্য দেওয়া হবে? আরেক দল বলছে, তারা বেকারের ফ্যাক্টরি করবে না। সবাইকে কাজ দেবে? কিন্তু কীভাবে দেবে তা বলছে না। তিনি আরও বলেন, প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, কতদিনে বাস্তবায়ন করা হবে, সেগুলোও বিস্তারিত জানাতে হবে।

নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ফেমা’র প্রেসিডেন্ট মুনিরা খান যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে তো জাদুর কাঠি নেই। তারা তো ম্যাজিক জানে না যে ক্ষমতায় গেলেই সব হয়ে যাবে। ফলে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে। পাশাপাশি জবাবহিদিতাও থাকতে হবে। শুধু বলবে আমরা ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি বন্ধ করব; কিন্তু কীভাবে বন্ধ করা সম্ভব হবে সেটাও তো তাদের বলতে হবে। জনগণের আস্থা তাদের অর্জন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, এখানে ভোটারদেরও বড় দায়িত্ব আছে। কারণ একটা ভালো শাসন ব্যবস্থার জন্য স্টেকহোল্ডার শুধু ইলেকশন কমিশন বা রাজনৈতিক দল নয়; ভোটাররা বড় স্টেকহোল্ডার। তারা তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার ঠিকভাবে প্রয়োগ করল কি না, এখানে সেটাও একটা বড় ব্যাপার। রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা প্রচারে গেলে তাদের কাছ থেকে এসব বিষয়ে জানতে হবে। তাদের প্রশ্ন করতে হবে- আপনারা যা বলছেন, সেগুলো কীভাবে করবেন?

নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির বিষয়ে নাগরিক এবং গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যেকটা দলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষক ডা. জাহেদ উর রহমান। যুগান্তরকে তিনি বলেন, ভোটারদের বলতে হবে যে, আপনি যা যা বলছেন সেটা করা সম্ভব কি না? আপনি এক কোটি বা দুই কোটি মানুষকে চাকরি দেবেন; কিন্তু কীভাবে দেবেন সেটা আমাকে জানান। আপনি এই কার্ড করবেন, ওই কার্ড করবেন, কীভাবে ফাইন্যান্স হবে, এর খুঁটিনাটি জানাতে হবে। আপনি হেলথ সেক্টরে ৬ থেকে ৮ শতাংশ জিডিপি দেবেন, যেখানে আমার ট্যাক্স আদায় হয় ৯ শতাংশ। ফলে কীভাবে আপনি কী করবেন? দেশ চালাবেন কীভাবে? এই প্রশ্নগুলো রাজনৈতিক দলকে এখনই করতে হবে। ভারতের গত লোকসভা নির্বাচনের আগের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, কংগ্রেস এক্সক্লুসিভলি একটা সংবাদ সম্মেলন করেছিল। সেখানে তারা ধরে ধরে দেখিয়েছিল বিজেপি কী কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং এর কোনটা কোনটা রাখতে পেরেছে, কোনটা কোনটা পারেনি। সেজন্যই বলি, বাংলাদেশে যদি নির্বাচনি ব্যবস্থাটা থাকে তাহলে অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিলে তার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো চাপে পড়বে, বিপদে পড়বে। এজন্য এখনই সতর্ক হওয়া দরকার।

গণতান্ত্রিক সমাজে সাধারণ মানুষের কাছে ভোটই সবচেয়ে বড় শক্তি। নির্বাচনের আগে সব মত ও দলের প্রার্থীরা ভোটারদের দরজায় হাজির হন। নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা ভোট প্রার্থনা করেন। কিন্তু ভোটের পরে জনপ্রতিনিধিদের কাছে কাজের হিসাব চাওয়ার প্রবণতা আমাদের দেশে খুব কম। ফলে প্রতিশ্রুতি ভাঙলে বড় কোনো চাপ তৈরি হয় না। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরে নতুন বাংলাদেশের যাত্রায় এবারের নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রার্থী ও দলগুলোর কাছ থেকে ভোটার ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কথা হয় রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক চাকরিজীবীর সঙ্গে। নিজের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমি চাই এমপি-মন্ত্রীরা কেউ প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ করবেন না। তারা টিআর-কাবিখার পেছনে দৌড়াবেন না। চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, সব দিক দিয়ে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হবে। রপ্তানি বাড়াতে হবে এবং আমদানি কমাতে হবে। একই বিষয়ে কথা হয় আরেকজন ভোটারের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি আমার নাগরিক অধিকারগুলো পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন চাই। আমি ও আমার পরিবার নিরাপদে বাসা থেকে বের হয়ে আবার নিরাপদে বাসায় ফেরার নিশ্চয়তা চাই। সরকারের কাছে আর্থিক সহযোগিতা নয়; শুধু শান্তিপূর্ণ জীবন-যাপনের নিশ্চয়তা চাই।

রাজধানীর রামপুরা এলাকার বাসিন্দা চাকরিজীবী আল-আমিন হোসেন বলেন, এই যে এত এত প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, আমরা তো এত প্রতিশ্রুতি চাই না। আমরা চাই তারা যেটা করতে পারবে, সেটাই পরিষ্কার করে আমাদের বলুক। যেমন-আমাদের আয় কম, ব্যয় বেশি। ফলে আমরা চাই সব জিনিসের দাম যেন আমাদের সাধ্যের মধ্যে থাকে। এ বিষয়ে তারা কী কী পদক্ষেপ নেবেন তা আমাদের জানাতে হবে।

ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসিন্দা সাদ্দাম হোসেন বলেন, আমি চাই যারাই ক্ষমতায় যাবে তারা যেন চুরি ও দুর্নীতি বন্ধ করে। তবে কীভাবে দুর্নীতি বন্ধ করবে সেটা বিস্তারিত বলা উচিত। ভোটের আগে শুধু কথার কথা বললে তো হবে না। সুজন মিয়া নামের রাজধানীর মিরবাগ এলাকার এক সবজি বিক্রেতা যুগান্তরকে বলেন, কী আর চাইব? আমাদের চাওয়ার কি কোনো মূল্যায়ন হয়? ক্ষমতায় যাওয়ার পরে আমাদের কথা কেউ তো ভাবে না।

বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতারা যা বলেন : প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, একটা লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি হিসাবে বিএনপি সব সময় প্রগতিশীল রাজনীতির পক্ষে ছিল এবং এখনো আছে। বিএনপি কোনো রেজিমেন্টেড দল নয় যে আমাদের নিজেদের প্রতিষ্ঠান করতে হবে। ফলে জনগণের কল্যাণে বিএনপি যেসব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে তা যতটুকু সম্ভব তা অবশ্যই বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি বলেন, বিএনপির ইশতেহারে এই বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে উল্লেখ আছে। আমাদের ভিশন ২০৩০-এর ৩১ দফার মধ্যে কোনোটা স্বল্পমেয়াদি, কোনটা অগ্রাধিকারভিত্তিক, আর কোনটা মধ্যমেয়াদি এগুলোর বিস্তারিত রূপরেখা আছে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটি সভাপতি মাওলানা এটিএম মাছুম যুগান্তরকে বলেন, শুধু ভোট পাওয়ার জন্য জামায়াত কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না। এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ইস্যু হলো বেকারত্ব দূরীকরণ। আমরা যুবসমাজকে দক্ষ করে গড়ে তুলব। সবাইকে সরকারি চাকরি দেওয়া সম্ভব নয়। এজন্য আমরা বিপুলসংখ্যক উদ্যোক্তা তৈরি করব। জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করব। শুধু দেশেই নয়, বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর জন্য প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করব। তথ্যপ্রযুক্তির ওপর জোর দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, আমরা নিজেরা দুর্নীতি করব না, কাউকে দুর্নীতি করতে দেবও না। এজন্য প্রশাসনিক সেবা ডিজিটালাইজ করা হবে এবং তদবির বন্ধ করা হবে। সব সরকারি দপ্তর সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হবে। নজরদারি ও জবাবদিহিতা বাড়ানো হবে। চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট বন্ধ করা হবে-উল্লেখ করে জামায়াতের এই নেতা বলেন, জনগণকে স্বস্তি দিতে এ কাজটি আমাদের করতেই হবে।

জামায়াত জোটে থেকেও এনসিপি আলাদাভাবে ৩৬ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা কি আদৌ সম্ভব কি না জানতে চাইলে দলটির মুখপাত্র ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া যুগান্তরকে বলেন, আমাদের ঘোষিত ইশতেহার অন্য দশটা রাজনৈতিক দলের ঘোষিত ইশতেহারের মতো নয়। আমরা আমাদের ইশতেহার দেশের সাধারণ মানুষের কাঙ্ক্ষিত মতামত এবং পরামর্শ নিয়ে করেছি। এ ইশতেহার নিশ্চয়ই বাস্তবায়ন করা হবে।