Image description
নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ১৪

মর্মান্তিক। মর্মন্তুদ। ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঝরে গেছে ১৪টি প্রাণ। এ ঘটনায় একই পরিবারের মা ও ছেলে গুরুতর আহত হয়ে ভর্তি রয়েছেন হাসপাতালে আর বাবা-মেয়ে লাশ হয়ে শোকের সাগরে ভাসাচ্ছেন স্বজনদের। এছাড়া শরীয়তপুরের জাজিরার ৫ ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন এ ঘটনায়।

পূজার ছুটিতে রাজশাহী যাওয়া হলো না, পথেই প্রাণ গেল বাবা-মেয়ের
লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি জানান, স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে পূজার ছুটি কাটাতে বড় বোনের বাসায় যাচ্ছিলেন রুবিনা আক্তার (৩৬)। রাজশাহীতে পৌঁছে স্বজনদের সঙ্গে আনন্দে সময় কাটানোর কথা ছিল তাদের। কিন্তু সেই আনন্দযাত্রা মুহূর্তে পরিণত হলো বিষাদে। পথে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেল স্বামী শহিদুল ইসলাম (৪০) ও মেয়ে তাছফিয়া খাতুনের (৮)। গুরুতর আহত রুবিনা ও তার ছেলে লাবিব হোসেন (১০) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। স্বামী ও মেয়ের মৃত্যুর খবর এখনো জানেন না রুবিনা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে জানতে চাইছেন, স্বামী ও সন্তানেরা কোথায়। মঙ্গলবার ভোরে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে ঘটে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান ১৪জন যাত্রী। আহত হন অনেকে। তাদেরই একজন রুবিনা। রুবিনা পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি পূবালী ব্যাংকের সুবিদখালী শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

তার স্বামী শহিদুল ইসলাম ছিলেন ব্র্যাক ব্যাংকের মাগুরা শাখার ক্রেডিট ম্যানেজার। তাদের মেয়ে তাছফিয়া খাতুন তৃতীয় শ্রেণি ও ছেলে লাবিব পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। রুবিনা সন্তানদের নিয়ে পটুয়াখালী থেকে রওনা হন। পথে একই বাসে ওঠেন শহিদুলও। গন্তব্য রাজশাহী। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই থেমে যায় তাদের যাত্রা। রুবিনার ভগ্নিপতি শহিদুর রহমান রাজশাহীর পাঠানপাড়া এলাকায় থাকেন। তিনি ইস্টার্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা। তার বাসাতেই পূজার ছুটি কাটানোর কথা ছিল রুবিনা ও শহিদুলের। নির্ধারিত সময়ে তাঁরা না পৌঁছানোয় খোঁজখবর শুরু করেন শহিদুর। একপর্যায়ে জানতে পারেন ভয়াবহ দুর্ঘটনার কথা। যে স্বজনদের আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁদের মধ্যেই দুজন আর ফিরবেন না-এ খবর মেনে নেয়া তার জন্যও কঠিন। শহিদুর রহমান জানান, কিছুদিন আগেই রুবিনা ও শহিদুল ওমরাহ্‌ করে এসেছিলেন। দু’জনই ব্যাংকে চাকরি করতেন। পূজার ছুটিতে একসঙ্গে সময় কাটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন তারা। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা সবকিছু এলোমেলো করে দিলো। এখন নাটোর সদর হাসপাতালে ভর্তি লাবিবের পাশে রয়েছেন শহিদুর রহমান। আর বনপাড়া পাটোয়ারী ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন রুবিনার পাশে আছেন তার স্ত্রী। স্বজনরা একদিকে আহত মা-ছেলের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে তাদের সামলাতে হচ্ছে প্রিয়জন হারানোর অসহনীয় শোক। একই ঘটনায় তার প্রিয় দুইজন ব্যক্তি ছাড়া আরও ১০ জন নিহত হয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম জানান, তথ্যগত ভুলের কারণে দুর্ঘটনার পর প্রথমে নিহতের সংখ্যা ১৪ বলা হয়েছিল। পরে যাচাই করে নিহতের সংখ্যা ১২ বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতার কারণে কিছু সময় মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হলেও বর্তমানে তা স্বাভাবিক রয়েছে।

বড়াইগ্রামে বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১৪, আহত ২৫
বড়াইগ্রাম (নাটোর) প্রতিনিধি জানান, নাটোরের বড়াইগ্রামে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ২৫ জন। মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে বনপাড়া-পাবনা মহাসড়কের বনপাড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের সামনে যাত্রীবাহী বাস ও বালুভর্তি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে এ ঘটনা ঘটে। বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের রেজুর মোড়ে ওই দুর্ঘটনাটি ঘটে।

বরগুনা থেকে পঞ্চগড়গামী আরপি পরিবহনের যাত্রীবাহী একটি বাস মঙ্গলবার ভোরে বড়াইগ্রাম এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা পাবনাগামী বালুভর্তি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে ৯ জন এবং বিভিন্ন হাসপাতালে আরও ৩ জনসহ মোট ১৪ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয়ে হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছে কমপক্ষে ২৫ জন। নিহতের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানায় উদ্ধারকারী ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। নিহতদের মধ্যে ১২ জনের পরিচয় পেয়েছে পুলিশ। এরা হলেন- রাজশাহী গোদাগাড়ির ফরাদপুরের আব্দুল হাকিমের ছেলে সোহেল রানা (৪০), বাগমারার কনোপাড়া এলাকার বাবর আলীর ছেলে আনোয়ার হক (৩০), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের পূর্ব সুবিধখালীর শহিদুল ইসলামের মেয়ে তাসফিয়া (৮), শরীয়তপুরের জাজিরার রামকৃষ্ণপুরের জহিরউদ্দিন মাতব্বরের ছেলে জুয়েল মাতব্বর (৪০), জাজিরার ডুবি সাহাপুর গ্রামের ইউনুস শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার (৩০) একই গ্রামের জাহানউদ্দিন মোল্লার ছেলে শাহ্‌লাল মোল্লা (৪৬) ও মৃত আরব আলীর ছেলে আব্দুস সামাদ (৭০), কাথুরিয়া গ্রামের রাজ্জাক ব্যাপারীর ছেলে শাহীন ব্যাপারি (৩২), পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের পূর্ব সুবিধখালীর আজাহার হাওলাদারের ছেলে শহিদুল ইসলাম (৪৫), ঝিনাইদহ সদর বড় মান্দারবাড়িয়া গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে আবুল কালাম (৫৬), নওগাঁর শাপাহার ঘোনটোলা গ্রামের সাজ্জাদ হোসেনের ছেলে রাসেল শেখ (৩৩), ফরিদপুর সদর বাখোন্দিয়া গ্রামের অমর কুমার জমাদারের ছেলে হিমেশ কুমার জমাদার (৩৫)। নিহত বাকি ২ জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তাদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা গেলে ময়নাতদন্তে মৃতদেহ কাটা ছেঁড়া করবে- এমন ভেবে সেখান থেকে বাড়িতে নিয়ে যায় স্বজনরা। ১২ জনের মরদেহ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক।

স্থানীয়রা জানান, ভোরে বিকট শব্দ পেয়ে সড়কে দৌড়ে এসে দেখি মানুষের আর্তনাদ। পরে নিজেরাই উদ্ধারের পাশাপাশি পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজনকে খবর দিলে তারা এসে নিহত ও আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত বিভিন্ন হাসপাতালে প্রেরণ করে। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার উদ্ধার তৎপরতার কারণে কিছু সময় নাটোর-পাবনা মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। বনপাড়া হাইওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন ও নাটোর ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুর রউফ এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, জেলা প্রশাসক মোছা. সুমনী আক্তার, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক, হাইওয়ে পুলিশ বগুড়া রিজিওনের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম, বড়াইগ্রামের উপজেলা নির্বাহী অফিসার লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস, অফিসার ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নিয়েছেন।

আহত যাত্রী শরীফুল ইসলাম জানান, কুষ্টিয়ার লালন ফকিরের মাজারের অনুষ্ঠান শেষে আরপি পরিবহনের ওই বাসে ঠাসাঠাসি করে যাত্রী ওঠে। যাত্রীদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে কন্ডাক্টরের কথাকাটাকাটি ও চিৎকার চেঁচামেচিতে চালক বিব্রত হন। এতে চালক বারবার পেছনে তাকাচ্ছিলেন। পরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিপরীতমুখী ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। হাইওয়ে পুলিশ বগুড়া রিজিওনের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন জানান, আরপি পরিবহনের এই বাসটির ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ১৩ই মে। ওইদিন পর্যন্তই রুট পারমিট ছিল। বাসটি কীভাবে সড়কে চলাচল করছিল তা খতিয়ে দেখা হবে।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত নাটোর-২ আসনের এমপি ও জাতীয় সংসদের হুইপ এডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু সাংবাদিকদের বলেন, নিহতদের পরিবারের জন্য তাৎক্ষণিক জেলা প্রশাসন থেকে পরিবার প্রতি ২৫ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নিহত প্রতি পরিবারকে ১ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেয়া হবে। এ ছাড়া আহতরা যাতে বিনামূল্যে ও বিশেষ যত্নে চিকিৎসা সেবা পায় তার জন্য সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াতকে প্রধান করে ৭ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্যরা হলেন- পুলিশ সুপার, বড়াইগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ, বিআরটিএ এর সহকারী পরিচালক ও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর উপ-সহকারী পরিচালক।