Image description

চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক সাইবার স্ক্যামার চক্রের সন্ধান পেয়ে তদন্তে নেমে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগ। পাঁচ দেশের ৬৩ বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদের পর তদন্তে উঠে এসেছে বাংলাদেশ-তাইওয়ানের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বহুজাতিক ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন সন লিমিটেডের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার নাম। জব্দ করা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক তথ্য ও গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য যাচাই করে সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছে তদন্ত সংস্থা। তবে অপরাধচক্রের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টতা এখনো তদন্তাধীন, এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

গুগলের সহায়তায় রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেররিজম বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওস, চীন, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও নেপালের নাগরিক। এদের মধ্যে দু-তিনজন পাকিস্তানি নাগরিক ছাড়া বাকিরা কেউই নিজ দেশের ভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা বুঝছেন না।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর সাইবার সুরক্ষা আইনে ৬৩ বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে করা মামলায় প্রত্যেককে দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।

আসামিদের রিমান্ড আদেশ পাওয়ার পর ভাষাসংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে পরে গুগল ট্রান্সলেটরের সাহায্যে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ সম্পন্ন করে কাউন্টার টেররিজম বিভাগ। তদন্ত সংস্থা ৬৩ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে ১৫ দিন সময় নেয়।

কাউন্টার টেররিজমের প্রধান উপকমিশনার মো. শামীম হোসেন বলেন, আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও আমাদের তদন্তে গোল্ডেন সন লিমিটেডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত চলমান থাকায় এখনই সুনির্দিষ্ট কারও নাম প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাউন্টার টেররিজমের পরিদর্শক মোহাম্মদ রাসেল মাহমুদ জানান, ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়ে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ৬৩ বিদেশির সবাইকে পর্যায়ক্রমে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হয়েছে।

 

জবানবন্দি দিতে অস্বীকৃতি মহসিনের

১৭ সেপ্টেম্বর কোকেন উদ্ধার মামলায় গোল্ডেন সন লিমিটেডের হিসাব ব্যবস্থাপক (অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার) সৈয়দ মোহাম্মদ মহসিনকে রিমান্ডে নেয় পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে মহসিনও দাবি করেছিলেন, কোম্পানিটির চীনা বসের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক এই সাইবার স্ক্যামিং সিন্ডিকেটের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তৈরি হয়। একই মাসের শেষ সপ্তাহের প্রথম দিকে সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলাটিতে তাঁকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্ত সংস্থা।

তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রিমান্ডের সময় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার কথা বললেও, শেষ পর্যন্ত আদালতে কোনো স্বীকারোক্তি দিতে রাজি হননি মহসিন। কোকেনের চালানের সঙ্গেও নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন তিনি।

গোল্ডেন সনের পরিচালনায় যাঁরা

২০০৩ সালে বাংলাদেশ ও তাইওয়ানের যৌথ উদ্যোগে কর্ণফুলীর খোয়াজনগরে প্রতিষ্ঠিত হয় ইঞ্জিনিয়ারিং ও ম্যানুফ্যাকচারিং প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন সন লিমিটেড। কোম্পানিটির চেয়ারম্যান তাইওয়ানের নাগরিক মিসেস লিন ইউ চেন এবং তাঁর স্বামী বাংলাদেশের নাগরিক বেলাল আহমেদ রয়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) দায়িত্বে। এ ছাড়া পরিচালকদের তালিকায় রয়েছেন লিন ইউ চেনের বোন লিন সু চিয়াং ও তাঁদের বাবা লিন সাই সিয়েন। এর বাইরে কোম্পানির বড় অংশের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে আছেন আরও একাধিক চীনা ও তাইওয়ানিজ।

এই বিষয়ে গোল্ডেন সনের এমডি বেলাল আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বলেন, ‘এটা নিয়ে আমার কোনো কিছু বলার নেই।’ এই বলে তিনি ফোন কেটে দেন। প্রতিষ্ঠানটির কোম্পানি সেক্রেটারি ইশহাক ফাহাদ বলেন, ‘আমি মূলত কোম্পানির শেয়ারবাজার দেখাশোনা করি।’

নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন সাবেক দুই সেনাসদস্য

চট্টগ্রামের জাকির হোসেন রোডের ওয়ারলেস মোড় থেকে রিকশায় মাত্র পাঁচ মিনিটের দূরত্বে কৃষ্ণের চূড়া আবাসিক এলাকা। সেখানকার ৪ নম্বর মুক্তিযোদ্ধা রোডের আটতলা একটি নির্মাণাধীন ভবন ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল আন্তর্জাতিক স্ক্যামারদের এই গোপন আস্তানা।

ভবনটির মালিক পেকুয়া উপজেলার সৌদিপ্রবাসী তিন ভাই মামুন করিম, মোহাম্মদ আক্কাস ও মোহাম্মদ জাকারিয়া হক।

জানা গেছে, গত আগস্টে সাবেক সেনাসদস্য আবু জাফরের মাধ্যমে ভবনটির ১৪টি ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী অগ্রিম ১৬ লাখ টাকা এবং মাসিক ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ৪ লাখ টাকা। চুক্তির সময় জাকারিয়া দেশে এসে স্ট্যাম্প সই করে ফের সৌদি আরবে চলে যান।

ভবনের কেয়ারটেকার মো. ইলিয়াস বলেন, ‘সাবেক দুই সেনাসদস্য মূলত এই বিদেশি স্ক্যামারদের কড়া নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। ফ্ল্যাটে কেয়ারটেকার বা বাইরের কারও প্রবেশের অধিকার ছিল না। বাজার-ঘাট থেকে শুরু করে রান্নাবান্নার কাজটি করতেন নির্দিষ্ট কিছু লোক ছিল। এরা বাঙালি ছিল। কয়েকজন ছিল পাকিস্তানি। বিদেশি নাগরিকেরা ভবন থেকে কখনো বাইরে বের হতেন না।’

যেভাবে ধরা পড়ে চক্রটি

ঘটনার সূত্রপাত গত ৪ সেপ্টেম্বর। নগরের দক্ষিণ খুলশীর ‘স্টেড ফাস্ট কুরিয়ার সার্ভিসে’ অভিযান চালিয়ে ২৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল্যের ১১৮ গ্রাম কোকেন জব্দ করে খুলশী থানার পুলিশ। এই ঘটনায় খুলশী থানায় মামলা হয়। সেই মামলার সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নেমে ১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর রোডের ভবনে ঝটিকা অভিযান চালায় পুলিশ। সেখান থেকে ৬৩ বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তারের পর সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করা হয়।

পুলিশ জানায়, নিজ দেশে অভিযানের মুখে তাড়া খেয়ে অনলাইন প্রতারক চক্রের এই সদস্যরা চট্টগ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন।