বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগ করবে যুক্তরাষ্ট্র। আগামী সপ্তাহে মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে ঢাকায় হবে বিনিয়োগ সম্মেলন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি খাতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতে সফররত মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর এই মনোভাবের কথা জানান। বৃহস্পতিবার ঢাকা সফরে আসা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত ও নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর সফর শেষে গতকাল ঢাকা ত্যাগ করেন।
সফরের তৃতীয় দিন গতকাল রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যান সার্জিও গোর। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টার সাক্ষাতে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রভাব ও বাণিজ্য-বিনিয়োগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সাক্ষাৎকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্্দী আমিন ও রেহান আসিফ আসাদ, ওয়াশিংটনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম এবং ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন উপস্থিত ছিলেন।
সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে সার্জিও গোর সাংবাদিকদের বলেন, ‘মাত্র প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ বৈঠক শেষ করেছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রধানমন্ত্রীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখে। আমাদের মধ্যে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে, যা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। ইতিমধ্যে আপনারা দেখতে পেয়েছেন, আমরা বাংলাদেশের জন্য আমাদের ভ্রমণসতর্কতা কমিয়ে দিয়েছি, যাতে মানুষ এখানে পর্যটক হিসেবে আসতে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ দেখতে উৎসাহিত হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগামী সপ্তাহে মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজতে সফরে আসছে। আমরা এই বার্তাটি পৌঁছে দিতে চাই যে এখানে অবিশ্বাস্য সম্ভাবনা রয়েছে। ওষুধশিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে অনেক কিছু করতে পারে। আমরা এই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে এবং পরবর্তী স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য উন্মুখ।’
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সার্জিও গোর বলেন, ‘বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার এবং আমাদের অংশীদারত্বকে আরও উন্নত করার বিপুল সুযোগ নিয়ে আলোচনা করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি অগ্রাধিকার, যাতে একসঙ্গে কাজ করে আমরা বাস্তব ফলাফল অর্জন করতে পারি।’
মার্কিন বিনিয়োগকারীদের ঢাকা সফরের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও নিশ্চিত করেছে। সাক্ষাৎ শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র সাংবাদিকদের বলেন, বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধান এবং বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদারের লক্ষ্যে আগামী সপ্তাহের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির প্রায় ৪৫ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফরে আসবেন। এই ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও তাদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সার্জিও গোরের সাক্ষাতে ওয়্যারহাউজিং, সয়াবিন, তুলা, গমসহ কৃষি ও অন্যান্য খাতে যুক্তরাষ্ট্রকে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন সাংবাদিকদের জানান, বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সার্জিও গোর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে। এর ইঙ্গিত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য বিদ্যমান ট্রাভেল অ্যাডভাইজরির ইতিবাচক সংশোধন করেছে। সার্জিও গোর বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে যে বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত। বৈঠকে আগামী মাসে ইউএস বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফর নিয়েও আলোচনা হয়।
শাহাদাৎ স্বাধীন বলেন, বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসনের (এফডিএ) সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সার্জিও গোর আশ্বাস দেন বাংলাদেশে এফডিএর পরীক্ষাকার্য আবার শুরু করার বিষয়ে তিনি সহায়তা করবেন। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন করপোরেশনের (ডিএফসি) মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় হয়। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। এ বিষয়ে বিশেষ দূত জানান, বাংলাদেশে ডিএফসির বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারণে যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচকভাবে কাজ করবে। ঢাকায় মার্কিন বিনিয়োগকারীরা শিগগিরই একটি ইউএস ইনভেস্টর সামিট আয়োজন করতে আগ্রহী। তিনি এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে নিজে কাজ করছেন বলেও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতের বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশের বিশেষ আগ্রহের কথাও উল্লেখ করেন বলে জানান উপ-প্রেস সচিব।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ দূত গোর বলেন, এ খাতে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ ভবিষ্যতে মার্কিন নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি উদ্যোগ ‘প্যাক্স সিলিকা’র অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। এ বিষয়ে তিনি উদ্যোগ নেবেন বলে জানান। বৈঠকে রোহিঙ্গাসংকট নিয়েও আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাঁর আগের দিনের সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় প্রদান এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ধন্যবাদ জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার অর্ধেকের বেশি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের অবদান থেকে আসে। এজন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সার্জিও গোর বলেন, রোহিঙ্গাসংকটের দ্রুত, টেকসই ও রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন। তিনি এ লক্ষ্যে আসিয়ান প্রতিবেশী দেশসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসায় বিনিয়োগ নিয়ে মার্কিন বিশেষ দূত ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন সার্জিও গোর। আন্তরিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক, রোহিঙ্গাসংকট, এফডিএ কার্যক্রম ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ সময় বাংলাদেশে আরও বেশি মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সয়াবিন, তুলা, গমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের সংরক্ষণাগার নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ কামনা করেন। তাঁর ভাষ্য, এসব খাতে বিনিয়োগ হলে দেশের সরবরাহব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) আরও শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক হবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের আগ্রহের কথাও প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেন। এ বিষয়ে সার্জিও গোর বলেন, আইটি খাতে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।
ভবিষ্যতে দেশটি প্যাক্স সিলিকা উদ্যোগের অংশীদার হতে পারে।
তিন দিনের সফর শেষে গতকাল নয়াদিল্লিতে ফিরে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর। সফরকালে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানসহ সরকারের অন্তত হাফ ডজন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন।
এসব বৈঠকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য চুক্তি ও যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়। সফরের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠক করেন সার্জিও গোর। মার্কিন দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানান, বৈঠকটি খুবই ভালো হয়েছে।
তবে বৈঠকে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তা জানা যায়নি। পরে দুপুরে কক্সবাজারে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের শরণার্থীশিবির পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তাদের খাদ্য ও চিকিৎসা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।