ধরন বদলে যাওয়ায় জটিল আকার ধারণ করেছে ডেঙ্গুজ্বর। চলতি বছর আক্রান্তদের মধ্যে ডেন-৩ সেরোটাইপ শনাক্ত হয়েছে। ডেন-৩-এর বিস্তারের ফলে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম ও অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়ছে। আগে ডেন-২ এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা আবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে বিপদ বেশি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। জানা যায়, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। একজন ব্যক্তি একবার একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে অন্য সেরোটাইপে আবার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গত তিন বছর ডেন-২ এর রোগী ছিল।
এবার ডেন-৩ সংক্রমিত রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে। ভাইরাসের ধরন বদলের কারণে দ্রুত ডেঙ্গু শক সিনড্রোমসহ জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে রোগীর অবস্থা অল্প সময়েই সংকটাপন্ন হয়ে যেতে পারে। শিশু, বয়স্ক এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘পাহাড়ি বনাঞ্চলে যেখানে ম্যালেরিয়া বেশি, এসব অঞ্চলে ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে। সেখানে এডিস মশা রয়েছে। ওই এলাকায় দুজনের মৃত্যুর কারণ খুঁজতে গিয়ে ডেঙ্গুর ধরন ডেন-৩ পাওয়া যায়। এজন্য আমরা বারবার বলছি, জ্বর হলে অবহেলা করা যাবে না। দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে।’
আইইডিসিআর জানিয়েছে, দেশে ডেঙ্গুর সেরোটাইপের আধিপত্য বদলেছে। ২০১৩-১৬ সালে দেশে ডেন-১ ও ডেন-২ বেশি ছিল। ২০১৯ সালে দেশের ইতিহাসের বড় প্রাদুর্ভাবে প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীর শরীরে ডেন-৩ পাওয়া যায়। এরপর ২০২৩-২৫ সালে আবার ডেন-২ সবচেয়ে বেশি ছড়ায়। চলতি বছর পরীক্ষিত নমুনার ৯১ শতাংশেই ডেন-৩ শনাক্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, অতীতেও সেরোটাইপ পরিবর্তনের পর বড় আকারের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। তাই এবারও ডেন-৩ এর দ্রুত বিস্তারকে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নিয়েও বাড়ছে দ্বিধা।
রোগীর সব উপসর্গ ডেঙ্গুজ্বরের হলেও টেস্টে রিপোর্ট নেগেটিভ আসছে। এ ব্যাপারে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ডেঙ্গু শনাক্তকরণ পরীক্ষার রিপোর্টে সাধারণত কোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের বা কোন ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছে, তা উল্লেখ থাকে না। ফলে ব্যবহৃত পরীক্ষা পদ্ধতি বা ডিভাইসের মান সম্পর্কে চিকিৎসকদের নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ল্যাবরেটরির সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, আগের বছরগুলোতে যে একই ডিভাইস ব্যবহার করে নির্ভরযোগ্য ফলাফল পাওয়া গিয়েছিল, এ বছর সেই ডিভাইস দিয়ে পরীক্ষা করা হলেও রোগীর ক্লিনিক্যাল লক্ষণ ও অন্যান্য পরীক্ষার ফল ডেঙ্গুর পক্ষে থাকা সত্ত্বেও ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসছে।
এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো স্পষ্ট নয় এবং বিষয়টি আরও গবেষণার দাবি রাখে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতিতে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। রোগীর স্বজনদের কাছে বিষয়টি ব্যাখ্যা করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফল নেগেটিভ হওয়ার কারণে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ভর্তি বা ডেঙ্গুনির্ভর চিকিৎসাব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত তদন্ত, পরীক্ষা কিট ও ডিভাইসের মান যাচাই এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান অত্যন্ত জরুরি।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় (গত রবিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৫৪৬ জন, মারা গেছেন একজন। মারা যাওয়া ব্যক্তি বরিশাল বিভাগের বাসিন্দা। চলতি বছরে আক্রান্ত হয়েছেন ১৩ হাজার ৬৪৪ জন, মারা গেছেন ৪৪ জন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২১ সালে মোট ডেঙ্গু রোগীর মাত্র ১৬ শতাংশ ছিল ঢাকার বাইরের। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৩৭ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৬৫ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৬০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৬৯ শতাংশে পৌঁছায়। চলতি বছরে ঢাকা বিভাগে আক্রান্ত হয়েছেন ৫ হাজার ৬৭ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৫৫৯ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২ হাজার ৩৬৫ জন, খুলনা বিভাগে ১ হাজার ৭৪৯ জন, রাজশাহী বিভাগে ৪৭০ জন, রংপুর বিভাগে ২৫৮ জন, বরিশাল বিভাগে ৩ হাজার ৮৮ জন, সিলেট বিভাগে ৮৮ জন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, এ বছর বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, খুলনা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।