Image description

প্রতি বছরের মতো এবারের বর্ষায়ও একই চিত্র-মাত্র কয়েক ঘণ্টায় তলিয়ে যায় রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকা। কোথাও হাঁটুসম, কোথাও কোমরসম পানি। বন্ধ হয়ে যায় প্রধান সড়ক, অচল হয়ে পড়ে গণপরিবহন, দুর্ভোগে পড়েন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীরা। সামান্য দূরত্ব অতিক্রম করতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায়। জলাবদ্ধতার কারণে যানজটের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যবসাবাণিজ্য, নষ্ট হয় পণ্য, বাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।

জলাবদ্ধতা নিরসনে গত দেড় দশকে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সরকার। খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেন নির্মাণ, বক্স কালভার্ট, পাম্প স্টেশন স্থাপন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নানান উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে প্রতি বর্ষাতেই ঢাকার বড় অংশ পানির নিচে চলে যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে-এত প্রকল্পের পরও কেন ডুবছে ঢাকা?

প্রকৌশলী, নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ সংকটের পেছনে চারটি প্রধান কারণ সবচেয়ে বেশি দায়ী। এগুলো হলো দুর্বল ড্রেনেজ-ব্যবস্থা ও সীমিত পাম্পিং-সক্ষমতা, বিভিন্ন সেবা সংস্থার দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা, পলিথিন ও কঠিন বর্জ্যে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং খাল-জলাধার দখল-ভরাটের পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে এ চারটি সমস্যার সমাধান ছাড়া রাজধানীকে জলাবদ্ধতামুক্ত করা সম্ভব নয়।

দুর্বল ড্রেনেজ, সীমিত পাম্পিং : বিশেষজ্ঞদের মতে ঢাকার বিদ্যমান ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক বর্তমান নগর বাস্তবতার সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাজধানীর অনেক ড্রেন, কালভার্ট ও ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন কয়েক দশক আগের জনসংখ্যা ও বৃষ্টিপাতের হিসাব ধরে নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে জনসংখ্যা, বহুতল ভবন, কংক্রিটের বিস্তার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় সেই অবকাঠামো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে। অনেক এলাকায় ড্রেনের ধারণক্ষমতা কম, কোথাও আবার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পলি জমে পানি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে সরিয়ে নিতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক পাম্প স্টেশন ও পাম্পিং-সক্ষমতা এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে বৃষ্টির পর দীর্ঘ সময় পানি আটকে থাকে।

সমন্বয়হীনতায় ভোগান্তি : রাজধানীর ড্রেনেজ, খাল, সড়ক, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর দায়িত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, রাজউক, ঢাকা ওয়াসা, বিআইডব্লিউটিএ, সড়ক বিভাগসহ একাধিক সংস্থা একই এলাকায় আলাদা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। নগরবিদদের মতে এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব জলাবদ্ধতা সমস্যা আরও জটিল করেছে। কোনো সংস্থা নতুন সড়ক নির্মাণের পর অন্য সংস্থা তা কেটে পাইপলাইন বসায়, কোথাও ড্রেন নির্মাণের পর অন্য প্রকল্পে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে একদিকে যেমন জনদুর্ভোগ বাড়ে, অন্যদিকে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও স্থায়ী সমাধান পাওয়া যায় না।

পলিথিনে বন্ধ ড্রেন : জলাবদ্ধতার অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পলিথিন ও কঠিন বর্জ্য। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল, খাবারের মোড়ক ও গৃহস্থালি বর্জ্য ড্রেন, খাল ও ক্যাচপিটে গিয়ে জমা হচ্ছে। ভারী বৃষ্টির সময় এসব বর্জ্য ড্রেনের মুখ বন্ধ করে দেওয়ায় পানি দ্রুত প্রবাহিত হতে পারে না।

হারিয়ে যাচ্ছে খাল-জলাধার : একসময় ঢাকার অসংখ্য খাল ও জলাধার প্রাকৃতিকভাবে বৃষ্টির পানি ধারণ করে নদীতে নিষ্কাশনের কাজ করত। কিন্তু বছরের পর বছর দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এসব খালের বড় অংশ সংকুচিত কিংবা বিলুপ্ত হয়েছে। অনেক জলাধার আবাসন, সড়ক বা বাণিজ্যিক স্থাপনায় রূপ নিয়েছে। এদিকে কংক্রিটের বিস্তার বাড়ায় খোলা মাটি ও সবুজ এলাকা দ্রুত কমে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হওয়ার সুযোগ প্রায় নেই। সব চাপ গিয়ে পড়ছে ড্রেনেজ-ব্যবস্থার ওপর, যা বর্তমান সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির ঘটনা বাড়ছে। তাই প্রাকৃতিক জলাধার ও খাল সংরক্ষণ না করলে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হবে।

অর্থনৈতিক ক্ষতির বোঝা : বিশেষজ্ঞদের মতে জলাবদ্ধতা শুধু নাগরিক দুর্ভোগ নয়, এটি বড় অর্থনৈতিক সমস্যাও। কয়েক ঘণ্টার জলাবদ্ধতায় উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, পরিবহন ব্যাহত হয়, ব্যবসাবাণিজ্যে ক্ষতি হয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটে। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় ডেঙ্গু ও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ে।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞ : ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ‘শুধু ড্রেন পরিষ্কার করে এ সংকটের সমাধান হবে না। সিটি করপোরেশন, রাজউক, ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে। অবশিষ্ট খালগুলো জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধার, সীমানা নির্ধারণ ও খনন শেষ করতে হবে। একই সঙ্গে পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নাগরিক সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।’

সিটি করপোরেশনের বক্তব্য : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘রাজধানীর জলাবদ্ধতা একটি বহুমাত্রিক সমস্যা। এটি শুধু সিটি করপোরেশনের একক দায়িত্ব নয়; পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, খাল-জলাধার সংরক্ষণ, সড়ক অবকাঠামো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সেবা সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই এর সমাধান সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘পলিথিন ও কঠিন বর্জ্যে ড্রেন ও আউটফল বন্ধ হয়ে গেলে পানি দ্রুত নামতে পারে না। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-জলাধার দখল ও ভরাট এবং অতিবৃষ্টির কারণে বিদ্যমান ড্রেনেজ-ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।’ এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ড্রেনেজ অবকাঠামোর উন্নয়ন, নিয়মিত খাল ও ড্রেন পরিষ্কার, পাম্পিং-সক্ষমতা বাড়ানো এবং একটি সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলছে বলে জানান তিনি। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, প্রকল্পের পর প্রকল্প নয়, সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা, খাল-জলাধার সংরক্ষণ, কার্যকর বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক ড্রেনেজ অবকাঠামো গড়ে তুলতে না পারলে প্রতি বর্ষাতেই একই প্রশ্ন ফিরে আসবে-কেন ডুবছে ঢাকা?