Image description

দেশে সাইবার অপরাধ বাড়ছে। বিস্তৃত হচ্ছে প্রতারণার ফাঁদ।

এসব ঘটনার ৯৭ শতাংশ শিকার নারী ও শিশু। এ ক্ষেত্রে মূল লক্ষ্যবস্তু কিশোরী-তরুণীরা। ব্যাংকসংক্রান্ত আর্থিক তথ্য হাতিয়ে নিতেও এসব অপরাধী ব্যাপকভাবে সক্রিয়, যার ফলে অর্থ চুরির মতো ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। এদের জুয়ার ওয়েবসাইটগুলোর মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়।
পুলিশ সদর দপ্তর ও গোয়েন্দো সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, দেশে প্রতি পাঁচজন কিশোরী ও তরুণীর মধ্যে তিনজন সাইবার বুলিংয়ের শিকার। তবে সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে দেশে প্রায় ৮৯ শতাংশ ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না। অভিযোগ করলেও প্রায় ৭২ শতাংশ মামলা পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে নিষ্পত্তিহীন থাকে বা খারিজ হয়ে যায়।

গত বছরের প্রথম ছয় মাসে সাইবার সহিংসতার শিকারহওয়াদের মধ্যে ৯৭ শতাংশ নারী ও শিশু জানিয়ে সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন প্ল্যাটফর্ম নামে একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, জানুয়ারি থেকে দেশে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ২৯টি তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

পুলিশের গত পাঁচ বছরের তথ্য অনুযায়ী, তথ্য ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন-২০০৬ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮-এর অধীনে মোট চার হাজার ৭৯৪টি মামলা হয়েছে। কিন্তু পৃথক সাইবার অপরাধ ইউনিট না থাকায় এসব মামলার সঠিক তদন্ত ও নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রের তথ্য মতে, সারা দেশে চার বছরে ৯৪৩টি সাইবার মামলা তদন্ত করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ২১০টি মামলা হয়েছে।

সংঘবদ্ধ একটি সাইবার প্রতারকচক্র সম্পর্কে তদন্তে নেমে সম্প্রতি অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বলেছে, এই চক্রের সদস্যরা সরকারের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার নাম, পরিচয় ও পদবি ব্যবহার করে, মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে তাঁর বন্ধু, সহকর্মী ও আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে এক স্বজনের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় সাইবার জালিয়াতচক্র। 

গত ২৫ মে জিয়ারত ইসলাম নামের এক চিকিৎসকের মোবাইল ফোনে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের মেসেজ আসে, বেপরোয়া গতির কারণে তাঁর গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সড়ক ট্রাফিক আইনের ১৪ ও ২৩ ধারার সবশেষ সংশোধনী অনুযায়ী জরিমানা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরিশোধ না করা হলে এবং কোনো আপিল দায়ের করা না হলে, তা বকেয়া হিসেবে গণ্য হবে এবং এর ফলে প্রতিদিন ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারে বিলম্ব ফি যুক্ত করা হবে। মেসেজে নিবন্ধন বাতিলসহ আরো কিছু কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

মেসেজে জিয়ারতকে সমস্যা সমাধানে এমন এক ওয়েবসাইটে ঢোকার লিংক দেওয়া হয়, ওই ওয়েবসাইটে ঢুকে ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দিলে নিমেষে তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে দুই বাংলাদেশি নম্বরে এক লাখ টাকা ট্রান্সফার করে নেওয়া হয়। শুধু জিয়ারত ইসলামই নয়, সড়কে এআই মামলা শুরুর পর এমন সাইবার প্রতারণার ফাঁদে পড়েছেন অনেকে।

সাইবার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে একাধিক জুয়ার ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ শনাক্ত করার কথা জানিয়ে ডিবি সূত্র বলছে, এসব জুয়ার প্ল্যাটফর্মে লেনদেন পরিচালনার জন্য মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিসের এজেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে এ কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ চক্রকে শনাক্ত করা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তারা বলেন, মোবাইল আর্থিক সেবার দ্রুত সম্প্রসারণ তথ্য, ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করেছে। এ ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিয়ে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট ছড়ানো, অনলাইন বুলিং, ওয়েবসাইট হ্যাক করে তথ্য চুরি, হুমকি দেওয়া এবং মানহানিকর বা মিথ্যা তথ্য প্রচারও বড় ধরনের সাইবার অপরাধ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

সাইবার অপরাধ ও গুজব এখন বড় চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজি) আলী হোসেন ফকির বলেন, সাইবার অপরাধ, অনলাইন জুয়া, ফিশিং ও সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানোর মতো অপরাধ এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অতি সম্প্রতি রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমির প্যারেড মাঠে ৪২তম ক্যাডেট এসআইদের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে তিনি এসব কথা বলেন।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তদন্তে উঠে এসেছে, এভাবে সাইবার অপরাধ দেশে উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহারে এটা এখন পরিণত হয়েছে অপরাধের ভয়ংকর অস্ত্রে।

গত ১১ মে ডিজিটাল অপরাধের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা মোকাবেলায় পৃথক ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার। বাংলাদেশ পুলিশ এসংক্রান্ত একটি প্রস্তাব জমা দেওয়ার পর এ ঘোষণা আসে।

এ বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার ও সাইবার অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে সঠিক বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’

অনলাইন জুয়া এখন সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) বিভাগের বিশেষ অভিযানে সংঘবদ্ধ একটি চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করে তাঁদের কাছ থেকে ছয় হাজার ৬০০টি মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস (বিকাশ/নগদ) অ্যাকাউন্টসংবলিত সিমকার্ড, ৬৭টি বিভিন্ন কম্পানির সিমকার্ড, ৭০টির বেশি মোবাইল ডিভাইস, একটি ল্যাপটপ ও একটি মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়।

ঢাকা মহানগর ডিবির সাইবার (উত্তর) বিভাগের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৭৩টি। মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৪টি। জিডি হয়েছে এক হাজার ৯৪টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৫৫০টি।

ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘একটি বড় সাইবার অপরাধীচক্রের সদস্যদের ধরতে দেড় বছর ধরে তদন্তের পর সফল হই। গত বুধবার এই চক্রের ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাই।’

সাইবার অপরাধ বিষয়ে ডিবি কর্মকর্তা বলেন, সাইবার অপরাধে দেশীয় চক্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক চক্রও জড়িত রয়েছে। এদের জুয়ার ওয়েবসাইটগুলোর এমএফএস অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দৈনিক হাজার কোটি টাকার ওপর লেনদেন হয়।