Image description

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কয়েক বছর ধরেই টানাটানি। ডলার সংকটে অর্থনীতির প্রায় সব খাতে ধাক্কা লাগে।

এখন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে সত্য, তবে এর দর যেভাবে লাগামহীন বেড়ে ১২৫ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে, তাতে ভুগছে পুরো অর্থনীতি। অথচ ডলারের এই সংকটের সময়েও রাষ্ট্রের বিপুল অঙ্কের ডলার চলে যাচ্ছে শুধু তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির পেছনে। তথ্য বলছে, গত আট অর্থবছরে এক এলএনজির পেছনেই খরচ হয়েছে ২২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। টাকার অঙ্কে যা প্রায় দুই লাখ ৭৭ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা, যা অর্থনীতির অনেকটা ‘রাক্ষস’ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে! অনেকে বলছেন, এটি এখন অর্থনীতির সক্ষমতা কুরে কুরে খাচ্ছে! শুধু তা-ই নয়, একই সময়ে সরকারকে এ খাতে ভর্তুকিও দিতে হয়েছে ৫১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখতে সরকারকে বড় অঙ্কের ভর্তুকিও বহন করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে গেলে এই চাপ আরো তীব্র হয়ে ওঠে। মার্কিন-ইরান যুদ্ধে দরবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে।

পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ছয় বছরেই দেশীয় গ্যাসের দৈনিক সরবরাহ সাড়ে ২৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে প্রায় ১৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। অন্যদিকে, এই সময়ে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে গ্যাসের ব্যবহার ব্যাপকহারে বেড়েছে। ফলে এই ঘাটতি পূরণে নিয়মিতভাবে স্পট মার্কেট ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। তবে এলএনজি দেশীয় গ্যাসের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ব্যয়বহুল হওয়ায় গ্যাস সরবরাহের সামগ্রিক ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বর্তমানে দেশে গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় চার হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

গত বুধবার জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয় দুই হাজার ৬৮৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে এক হাজার ৩৭ মিলিয়ন ঘনফুট আসছে এলএনজি থেকে। অর্থাৎ মোট সরবরাহের ৩৯ শতাংশ এখন আমদানীকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। অথচ বিপুল ব্যয়ে এলএনজি আমদানি এবং হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার পরও দেশে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ফলে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আবাসিক খাত, সবখানেই জ্বালানি সংকট দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো না গেলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে। তখন এলএনজির এই ব্যয় সামাল দেওয়া বাংলাদেশের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএনজি স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে প্রয়োজনীয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি স্থায়ী সমাধান নয়। যদি দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানির ব্যয় আরো বাড়বে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, যেহেতু দেশীয় গ্যাস উৎপাদন নেট হিসাবে কমে যাচ্ছে, তাই সেই ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি বাড়াতে হচ্ছে। গত বছর আমরা ১০৩টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছি, আর চলতি বছর ১১৫টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে আরেকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপন করা গেলে আমদানির সক্ষমতা আরো বাড়ানো সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, এফএসআরইউ চালু হওয়ার পর যাতে পাইপলাইনের সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো সমস্যা না হয়, সে জন্য ফেনী থেকে বাখরাবাদ পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের একটি প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে। গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে এবং বর্তমানে এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) চলছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। তখন এটি ছিল দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি পূরণের একটি পরিপূরক ব্যবস্থা। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেটিই এখন জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভরসায় পরিণত হয়েছে। উৎপাদন কমতে থাকায় প্রতিবছর বাড়ছে এলএনজি আমদানির পরিমাণ, সেই সঙ্গে বাড়ছে সরকারের ভর্তুকির বোঝাও।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, এলএনজি আমদানির ব্যয় বাড়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সরকারি ভর্তুকিতে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকির জন্য বাজেটে বরাদ্দ ছিল ছয় হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি এবং স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনতে হওয়ায় প্রকৃত ভর্তুকি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।

পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ৪১টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ১১৩টি কার্গো। এর মধ্যে ৫০টি কেনা হয়েছে স্পট মার্কেট থেকে। শুধু মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার মাসেই স্পট মার্কেট থেকে কেনা হয়েছে ৩১টি কার্গো। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা ১১৫টি কার্গো আমদানির। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, আগামী বছরগুলোতে এই সংখ্যা আরো বাড়বে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম কালের কণ্ঠকে বলেন, এলএনজি আমদানির পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, তার মাত্র ১০ ভাগের ১ ভাগ যদি দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খননে বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে আজ এত বেশি আমদানিনির্ভর হতে হতো না।

ম. তামিম আরো বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমদানিনির্ভরতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় জ্বালানি খাতে ব্যয় ক্রমাগত বেড়েছে। এখন এলএনজি আমদানিতে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার একটি অংশও যদি অনুসন্ধান, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী হতো। একই সঙ্গে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতাও অনেক কমে আসত।

নতুন কূপ খননে জোর : দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, আমরা এরই মধ্যে ১৫০টি কূপ খননকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করেছি।

পাশাপাশি অফশোরে (সমুদ্রে) তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য গত ২৪ মে বিডিং রাউন্ড আহবান করা হয়েছে এবং ১ জুন থেকে টেন্ডার ডকুমেন্ট বিক্রিও শুরু হয়েছে। আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ থাকবে। আশা করি, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এতে অংশ নেবে এবং মূল্যায়ন শেষে কয়েকটি ব্লকের জন্য চুক্তি করতে পারলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।

কোন অর্থবছরে কত টাকার এলএনজি ও ভর্তুকি : পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে প্রায় ১১ হাজার ৮১৩ কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করা হয়। এই অর্থবছরে ভর্তুকি দেওয়া হয় দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় ১৭ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার এলএনজি আমদানি হয়। তখন ভর্তুকি দেওয়া হয়েছিল তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৬ হাজার ৫০৬ কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করা হয়। এ সময় ভর্তুকি দেওয়া হয় তিন হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪০ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকার এলএনজি আমদানি হয়। তখন ভর্তুকি দেওয়া হয় ছয় হাজার কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি করা হয় ৩৫ হাজার ২৭৫ কোটি টাকার। ওই অর্থবছরে ভর্তুকি দেওয়া হয় ছয় হাজার ৩৩২ কোটি টাকা।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪২ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করা হয়। তখন ভর্তুকি দেওয়া হয় ছয় হাজার ৩৬ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি করা হয় ৫৩ হাজার ৯৪৭ কোটি টাকার। ওই অর্থবছরে মোট ভর্তুকি দেওয়া হয় আট হাজার ৯০০ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি বাবদ ব্যয় হয় ৫৯ হাজার কোটি টাকা এবং ভর্তুকি লেগেছে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কিন্তু দেশের বিদ্যমান এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা এক হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা বর্তমান চাহিদার তুলনায় সীমিত। নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে উল্লেখযোগ্য সাফল্য না এলে আগামী দুই থেকে তিন বছরে দেশের জ্বালানি সংকট আরো তীব্র হতে পারে।

অধ্যাপক ইজাজ হোসেন আরো বলেন, কেবল এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে দেশের গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার কারণে আমদানিনির্ভরতা অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে। তাই নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, বিদ্যমান ক্ষেত্রের উৎপাদন বৃদ্ধি, অফশোর অনুসন্ধান দ্রুত সম্পন্ন করা এবং জ্বালানির বহুমুখীকরণই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।

জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর সব ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। তবে সেই উৎপাদন বাড়তে সময় লাগবে। এর মধ্যে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত সচল রাখতে এলএনজি আমদানি বাড়ানো ছাড়া বাস্তবসম্মত কোনো বিকল্প নেই। ফলে আগামী কয়েক বছরেও দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় এলএনজির গুরুত্ব আরো বাড়বে, সেই সঙ্গে বাড়বে সরকারের ভর্তুকির বোঝাও।