Image description

রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগে এক রোগীর মৃত্যু ঘিরে রোগীর স্বজন ও চিকিৎসকদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্বজনরা বলছেন, অক্সিজেন না দেওয়ায় রোগী মারা গেছেন। তবে চিকিৎসকদের অভিযোগ, রোগীর মৃত্যুর পর চিকিৎসকদের ওপর হামলা করেছেন স্বজনরা।

এ ঘটনার প্রতিবাদে ওই রোগীর লাশ আটকে রাখেন চিকিৎসকরা। পাশাপাশি তিন ঘণ্টা জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। পরে মৃতের ছেলে রিফাত হোসেনকে বাসা থেকে ডেকে এনে মায়ের লাশ ফেরত দেওয়ার শর্তে হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ের একটি কক্ষে কান ধরে ওঠবস করানো হয়। এরপর মায়ের লাশ ফেরত দেন চিকিৎসকরা। এ ঘটনার ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় সমালোচনা। লাশ আটকে রেখে ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করানোর ঘটনার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় লোকজন।

স্বজন ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে রংপুর নগরীর নিউ জুম্মপাড়া পাড়া মহল্লার মাহবুব রহমানের স্ত্রী নুরজাহান বেগম (৫৫) হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে ছেলে রিফাত তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকদের কাছে রোগীকে অক্সিজেন দেওয়ার অনুরোধ করলে আগে ভর্তিপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ সময় রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং রাত ৪টার দিকে মৃত্যু হয়।

চিকিৎসকদের অভিযোগ, রোগীর মৃত্যুর পর ক্ষুব্ধ স্বজনরা দায়িত্বরত চিকিৎসকদের ওপর হামলা করেন। এ ঘটনার পর লাশ মর্গে রাখা হয়। সকাল থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত জরুরি বিভাগ বন্ধ করে হাসপাতালে ধর্মঘট পালন করেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসকদের ভাষ্য, রিফাতকে হাসপাতালে এসে ক্ষমা চাইতে হবে। তাহলে লাশ মিলবে। পরে ১১ ঘণ্টা পর বিকাল ৩টার দিকে রিফাত হাসপাতালে আসলে তাকে একটি কক্ষে নিয়ে কান ধরে ১০ বার ওঠবস করানো হয়। এরপর মায়ের লাশ ফেরত দেওয়া হয়।

ওই রোগীর লাশ আটকে রাখেন চিকিৎসকরা

ওই রোগীর লাশ আটকে রাখেন চিকিৎসকরা

 

মৃত নুর জাহানের বড় ছেলে নুরুজ্জামান রিন্টু জানান, তার স্ত্রী ফোন করে মায়ের অসুস্থতার খবর দেন। হাসপাতালে এসে দেখেন, উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে মায়ের লাশ আটকে রাখা হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সে তোলার পরও লাশ নামিয়ে নেওয়া হয়। লাশ দিতে গড়িমসি করায় বেলা দেড়টার দিকে লাশ নেওয়ার দাবিতে মেডিক্যাল মোড় এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন তারা।

প্রত্যক্ষদর্শী, ইন্টার্ন চিকিৎসক, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কার্ডিওলজি বিভাগে অক্সিজেন না দেওয়ায় মায়ের মৃত্যুর পর কর্তব্যরত সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. রাকিবুল হাসান, ইন্টার্ন চিকিৎসক নাঈম, রাকিবের ওপর চড়াও হন ছেলে রিফাত। এ সময় হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।

এর প্রতিবাদে ভোর থেকে কয়েকজন ইন্টার্ন হাসপাতালে ডেড হাউজের সামনে অবস্থান নেন। তারা মৃতের ছেলেকে গ্রেফতার না করা পর্যন্ত লাশ না দেওয়ার ঘোষণা দেন। সকাল ১০টা থেকে হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন তারা। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে চিকিৎসকরা জরুরি বিভাগে তালা দিয়ে দিয়ে ধর্মঘট শুরু করেন। এর মধ্যে কয়েক দফায় লাশ নিতে গিয়ে স্বজনরা ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে স্বজনরা অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে মর্গের সামনে আসেন। খবর পেয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আশিকুর রহমান ঘটনাস্থলে এসে লাশ স্বজনদের দেওয়ার জন্য চিকিৎসকদের অনুরোধ জানান। কিন্তু সে অনুরোধও রাখেননি চিকিৎসকরা। লাশ অ্যাম্বুলেন্সে তুলতে গেলে বাধা দেন এবং আটকে রাখেন। 

রংপুর ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মিরাজ বলেন, ‘আমরা সকাল থেকে বলে আসছিলাম লাশ নিয়ে আমাদের কোনও বক্তব্য নেই। তবে যে ব্যক্তি চিকিৎসকদের ওপর হামলা করেছে তাকে এখানে আসতে হবে। যেহেতু আমাদের দাবি তাকে আইনের আওতায় আনার, এরপরই লাশ নিয়ে যেতে দেবো বলেছি আমরা। বিকালে অভিযুক্ত ছেলে এসে কান ধরে ওঠবস করে ক্ষমা চেয়ে লাশ নিয়ে গেছে।’

নুর জাহান বেগমের ভাগনে আব্দুস সালাম ও স্বজন শাওন বলেন, ‘আমরা বারবার আকুতি করেছি। তারপরও লাশ নিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি। আমরা বলেছি আগে দাফন করি, এরপর তার ছেলেকে নিয়ে এসে ক্ষমা চাইবো। কিন্তু চিকিৎসকরা মানেননি। উল্টো ১১ ঘণ্টা লাশ আটকে রেখেছেন। শেষমেশ উপায় না পেয়ে মৃতের ছেলে এসে কান ধরে ওঠবস করিয়ে মায়ের লাশ নিয়ে গেছেন। এটি অমানবিক এবং জুলুম।’

সকাল থেকে কয়েকজন ইন্টার্ন হাসপাতালে ডেড হাউজের সামনে অবস্থান নিয়ে লাশ আটকে রাখেন

সকাল থেকে কয়েকজন ইন্টার্ন হাসপাতালে ডেড হাউজের সামনে অবস্থান নিয়ে লাশ আটকে রাখেন

আব্দুস সালাম বলেন, ‘চিকিৎসকের ওপর হামলার কোনও ঘটনা ঘটেনি। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ দেখলে সব প্রমাণ হয়ে যাবে। অক্সিজেন না দেওয়ায় রোগী মারা গেছে। এ নিয়ে ছেলের সঙ্গে চিকিৎসকদের কথা কাটাকাটি হয়েছে। হামলার কোনও ঘটনা ঘটেনি। চিকিৎসকদের অবহেলা ছিল বলেই হয়তো উত্তেজিত হয়েছিল ছেলে। এ ব্যাপারে আমরা থানায় লিখিত অভিযোগ দিইনি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আশিকুর রহমান বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। রোগীকে হাসপাতালে আনার পরপরই মৃত্যু হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দায়িত্বরত চিকিৎসকের গাফিলতি ছিল না। কোনও কারণ ছাড়াই চিকিৎসক নাঈম, রাকিবসহ অন্যদের মারধরের চেষ্টা করা হয়। এমনকি দায়িত্বরত নার্সের সঙ্গেও অশোভন আচরণ করা হয়েছে। রোগীর স্বজনরা যে আচরণ করেছেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ ছেলেকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে মায়ের লাশ ফেরত বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটিও খুবই নিন্দনীয় ঘটনা।’