সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের করুণ অবস্থা ফুটে উঠেছে সরকারি এক জরিপে। বাংলা-ইংরেজি দেখে পড়া (রিডিং) কিংবা সহজ যোগ-বিয়োগ করতে পারে না দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগ শিক্ষার্থী। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ইউনিটের পরিদর্শনে তথ্য মিলেছে, সর্বনিম্ন ‘সি’ গ্রেডের স্কুলই প্রায় অর্ধেক। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মান নির্ধারণে জানুয়ারিতে ৩৫২, ফেব্রুয়ারিতে ৫৮ ও মার্চে ২৮টি স্কুলে পরিদর্শন করা হয়। মান নির্ধারণে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা রিডিং, চতুর্থ শ্রেণির যোগ-বিয়োগ এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ইংরেজি রিডিং পড়তে দেয়া হয়। শিক্ষার্থীদের মান অনুযায়ী, ৮০ থেকে ১০০ নম্বর ‘এ’, ৬১ থেকে ৭৯ নম্বর ‘বি’ এবং ০ থেকে ৬০ শতাংশ ‘সি’ গ্রেড হিসেবে বিবেচিত হয়।
জানুয়ারি মাসে ঢাকা মহানগরের নবাবগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, দোহার, ধামরাই, সাভার ও সাটুরিয়া, নারায়ণগঞ্জের বন্দর ও সোনারগাঁ, ময়মনসিংহ সদর, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ৩৫২টি বিদ্যালয় পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে গ্রেড-সি পেয়েছে ১৭৩টি, গ্রেড-বি ১৪৬টি এবং গ্রেড-এ ৩৩টি বিদ্যালয়। উপজেলাভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, নবাবগঞ্জের ২৩টি বিদ্যালয়ের মধ্যে গ্রেড-সি ৭টি, গ্রেড-বি ১৫টি ও গ্রেড-এ ১টি। কেরানীগঞ্জের ৪১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে গ্রেড-সি ১৪টি, গ্রেড-বি ২১টি ও গ্রেড-এ ৬টি। দোহারের ২২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে গ্রেড-সি ১০টি, গ্রেড-বি ১১টি ও গ্রেড-এ ১টি। ধামরাইয়ের ৩৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে গ্রেড-সি ৮টি, গ্রেড-বি ২০টি ও গ্রেড-এ ১১টি। সাভারের ৩৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে গ্রেড-সি ২৭টি, গ্রেড-বি ১০টি ও গ্রেড-এ কোনোটি নয়। সাটুরিয়ার ২৪টি বিদ্যালয়ের মধ্যে গ্রেড-সি ৭টি, গ্রেড-বি ১৩টি ও গ্রেড-এ ৪টি। বন্দরের ৫০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে গ্রেড-সি ১২টি, গ্রেড-বি ৩০টি ও গ্রেড-এ ৮টি। সোনারগাঁয়ের ৩৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে গ্রেড-সি ২১টি, গ্রেড-বি ১৩টি ও গ্রেড-এ ১টি।
ময়মনসিংহ সদরের ৬০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে গ্রেড-সি ৫২টি, গ্রেড-বি ৭টি ও গ্রেড-এ ১টি। হাজীগঞ্জের ২১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে গ্রেড-সি ১৫টি, গ্রেড-বি ৬টি ও গ্রেড-এ কোনোটি নয়। বেগমগঞ্জের ২৮টি বিদ্যালয়ের সবক’টিই গ্রেড-সি হিসেবে চিহ্নিত হয়।
ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ, ধামরাই ও সাভার এবং মহানগরের গুলশান এলাকার ৫৮টি বিদ্যালয় পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে গ্রেড-সি ২৫টি, গ্রেড-বি ২৮টি এবং গ্রেড-এ ৫টি বিদ্যালয়। কেরানীগঞ্জের ২৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে গ্রেড-সি ১৩টি, গ্রেড-বি ৯টি ও গ্রেড-এ ৩টি। গুলশানের ১১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে গ্রেড-সি ৫টি, গ্রেড-বি ৬টি ও গ্রেড-এ কোনোটি নয়। ধামরাইয়ের ১১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে গ্রেড-সি ১টি, গ্রেড-বি ৯টি ও গ্রেড-এ ১টি। সাভারের ১১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে গ্রেড-সি ৬টি, গ্রেড-বি ৪টি ও গ্রেড-এ ১টি। মার্চ মাসে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ২৮টি বিদ্যালয় পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে গ্রেড-সি পেয়েছে ২৩টি বিদ্যালয়, গ্রেড-বি ৫টি এবং গ্রেড-এ কোনো বিদ্যালয় পায়নি।
সবমিলিয়ে ৪৩৮টি স্কুলের তথ্য উঠে এই তিন মাসের প্রতিবেদনে। যাতে দেখা যায় সর্বোচ্চ ‘এ’ গ্রেড পেয়েছে ৩৮টি স্কুল, ‘বি’ ১৭৯ ও ‘সি’ ২২১টি। ‘এ’ পায় ৮.৬৮ শতাংশ, ‘বি’ ৪০.৮৭ ও ‘সি’ ৫০.৪৬ শতাংশ স্কুল। ২০২৫ সালেও ছিল প্রায় একই চিত্র। ৪ হাজার ৬১০টি প্রতিষ্ঠানে নিরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, এর মধ্যে ২.৮৯ শতাংশ ‘এ’ গ্রেড, ২৯.১৩ শতাংশ ‘বি’ গ্রেড এবং ৬৭.৯৮ শতাংশ ‘সি’ গ্রেডে রয়েছে। সংখ্যার হিসাবে ‘এ’ গ্রেডের প্রতিষ্ঠান ১৩৩টি, ‘বি’ গ্রেডের ১ হাজার ৩৪৩টি এবং ‘সি’ গ্রেডের ৩ হাজার ১৩৪টি।
এই ইউনিটের ২০ থেকে ২৫ জন কর্মকর্তা দেশের বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শনে যান। আগাম বার্তা না দিয়ে একেকজন কর্মকর্তা প্রতিদিন ১০টি করে বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। তারা তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতা সম্পর্কে জানতে চান। এর মধ্যে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা রিডিং পড়তে বলা হয়। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের গণিতের যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ করতে দেয়া হয়। আর পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বলা হয় ইংরেজি রিডিং পড়তে। এরপর শিক্ষার্থীদের শিখন দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে স্কুলগুলোকে একটি নম্বর দেয়া হয়।
বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ইউনিটের মহাপরিচালক তসলিমা আক্তার বলেন, আমাদের লক্ষ্য গোটা দেশের সব বিদ্যালয় পরিদর্শন করা। আমরা সেভাবেই কাজ করছি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বলেন, আমরা এ পরিদর্শনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। আমাদের অধিদপ্তর থেকেও নিয়মিত পরিদর্শনে যাচ্ছেন কর্মকর্তা। এর মাধ্যমে শিক্ষার প্রকৃত চিত্র আমাদের সামনে উঠে আসবে। যা প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের মানন্নোয়নের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়ক হবে।