একসময় দেশের রাজনীতিতে তাদের ছিল গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি। মন্ত্রিসভার টেবিল থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ, রাজনৈতিক সমাবেশ থেকে রাজপথ— সবখানেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু পাশার দান উল্টে যায়। চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যায় দ্রুত। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। এসব পরিবর্তনের ধাক্কায় আড়ালে চলে যায় আওয়ামী জোটের শরিক বামপন্থী ও ছোট রাজনৈতিক দলগুলো। নিষিদ্ধ না হয়েও অনেকটা নিষিদ্ধের মতো হয়ে যায় তারা।
কিন্তু দীর্ঘ সময় নীরব থাকার পর এখন আবারও নিজেদের সংগঠিত করার চেষ্টা শুরু করেছে দলগুলো। প্রকাশ্যে বড় কোনো কর্মসূচি না থাকলেও ভেতরে ভেতরে যোগাযোগ বাড়ানো, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করা এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে— এটি কি শুধুই টিকে থাকার লড়াই, নাকি ভবিষ্যতের কোনো নতুন রাজনৈতিক মেরূকরণের প্রস্তুতি?
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, ৫ আগস্টের পর তৈরি হওয়া পরিস্থিতিতে তাদের জন্য রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ইনডোর কিংবা আউটডোর— কোনো ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনার মতো পরিবেশ ছিল না। অনেক নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয়, কেউ কারাগারে যান, আবার কেউ আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হন। হামলা ও হয়রানির আশঙ্কায় অনেকেই প্রকাশ্যে আসতে চাননি। ফলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
তবে নেতারা বলছেন, প্রকাশ্য কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও দলীয় যোগাযোগ কখনোই বিচ্ছিন্ন হয়নি। সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আবারও দলীয় নেতাকর্মীরা সক্রিয় হতে শুরু করেন। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর অনেকেই নিয়মিত দলীয় কার্যালয়ে যাওয়া শুরু করেছেন। বিভিন্ন সাংগঠনিক বৈঠকও হচ্ছে।
ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে ছিটকে পড়লেও হাল ছাড়তে রাজি নন জোটের বামপন্থী নেতারা। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ-ইনু) এবং অন্য শরিক দলগুলোর নেতারা বলছেন, বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশে সংগঠন টিকিয়ে রাখার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। এরই মধ্যে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ইস্যু কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টাও চলছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে দেখছেন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার ছায়ায় থাকার কারণে এসব দলের নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনীতির মাঠে নিজেদের উপস্থিতি টিকিয়ে রাখা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যদি তারা সক্রিয় হতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিকভাবে আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই এই মুহূর্তে তাদের প্রধান লক্ষ্য হতে পারে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা এবং কর্মী-সমর্থকদের মনোবল ধরে রাখা।
বিশ্লেষকরা এটিও মনে করছেন, এর পেছনে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আওয়ামী লীগ সরাসরি রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় না থাকলেও, জোটের শরিক বামপন্থী দলগুলো ‘প্রগতিশীল রাজনীতি’র ব্যানারে নিজেদের পুনর্গঠনের চেষ্টা করতে পারে। ভবিষ্যতে তারা বর্তমান সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা কিংবা নতুন কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগেও ভূমিকা রাখতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম সেলিম মনে করেন, দেড় দশকে এসব ছোট রাজনৈতিক দলের গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তার ভাষায়, জনগণ এরই মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ এবং আরও কয়েকটি দলকে রাজনৈতিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ গণতান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী করার পরিবর্তে তারা দীর্ঘদিন একটি বড় রাজনৈতিক দলের সহযোগী শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে তাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
ড. শামছুল আলম সেলিম আরও বললেন, আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে বিভিন্ন ছোট দলের ভেতরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এমন উদ্যোগ খুব বেশি সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।
২০০৪ সালে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তিগুলো এক ছাতার নিচে এনে ১৪-দলীয় জোট গঠন করা হয়েছিল। পরে ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে জোটটি একসঙ্গে অংশ নেয়। শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারে দুই দফায় শরিক দলের নেতারা মন্ত্রিসভায়ও স্থান পান। যদিও শেষ মেয়াদে আওয়ামী লীগ এককভাবেই সরকার পরিচালনা করে।
বর্তমানে জোটের অধিকাংশ শীর্ষ নেতা রাজনৈতিকভাবে কঠিন সময় পার করছেন। জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু কারাগারে রয়েছেন এবং সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার অনেকটাই আড়ালে। একইভাবে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননও কারাগারে, আর সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা আত্মগোপনে রয়েছেন। জাতীয় পার্টি (জেপি), তরীকত ফেডারেশন, সাম্যবাদী দল এবং গণতন্ত্রী পার্টির অনেক নেতাও কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছেন।
তবুও দলগুলো নিজেদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার দাবি করছে। এর মধ্যে জাসদ গত ১৪ মে হাসানুল হক ইনুর মুক্তির দাবিতে মিছিল ও সমাবেশ করেছে। ২৩ মে রামিসা ধর্ষণ-হত্যার বিচার এবং ইনুর মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। এ ছাড়া গত ৫ জুন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে দলটি।
একই দিন রাশেদ খান মেননের ৮৩তম জন্মবার্ষিকী ও তার মুক্তির দাবিতে তোপখানা রোডে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে দলটি।
এ ছাড়া হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিচারের দাবিতে গত ১৬ মে রাজধানীর প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে তারা। সবশেষ গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবিতে রাজধানীতে বেশ বড়সড় বিক্ষোভ মিছিল করেছে ওয়ার্কার্স পার্টি। অন্যদিকে দিলীপ বড়ুয়ার নেতৃত্বাধীন সাম্যবাদী দলও বিভিন্ন জাতীয় ও রাজনৈতিক দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভার মতো কর্মসূচি পালন করে সাংগঠনিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।
জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন জানিয়েছেন, নির্বাচনের পর দলের অনেকেই আবার সক্রিয় হয়েছেন এবং নিয়মিত পার্টি অফিসে বসছেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।
জাসদের কার্যকরী সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট রবিউল আলম বলেছেন, সভাপতি কারাগারে এবং সাধারণ সম্পাদক অনুপস্থিত থাকলেও দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তার দাবি, জাসদ কখনোই রাজনীতির মাঠ থেকে সরে যায়নি।
জুলাই আন্দোলনে প্রাণহানির ঘটনায় জাসদের দায় রয়েছে— এমন অভিযোগের বিষয়ে রবিউল আলম বলেছেন, সে সময় জাসদ সরকারে ছিল না। ফলে ওই সময়ের প্রাণহানির দায় তাদের ওপর বর্তায় না। তবে নিহতদের জন্য রাজনৈতিক দল হিসেবে তারা দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নুর আহমদ বকুল মনে করেন, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সরকার বদলালেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান হয়নি।
বকুল বললেন, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান সবসময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ২৩ দফা কর্মসূচি এবং বিএনপি-জামায়াতবিরোধী রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তারা এখনো ১৯৭২ সালের সংবিধানের পক্ষে অবস্থান করছেন। ’৭২-এর সংবিধান থেকেই ‘ফ্যাসিবাদের জন্ম’ হয়েছে বলে যে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে তিনি একমত নন।
গণঅভ্যুত্থানে প্রাণহানির প্রসঙ্গে বকুল বলেছেন, নিহতদের বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। তবে আন্দোলনের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। তিনি দাবি করেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় তাদের দল ছাত্রদের দাবির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং রাশেদ খান মেনন সংসদে আওয়ামী লীগ সরকারের নানা নীতির সমালোচনা করেছিলেন।
বকুল জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকায় ১৪-দলীয় জোটের সাংগঠনিক কার্যক্রমও স্থবির হয়ে আছে। তবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে যোগাযোগ এখনো অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের সম্ভাবনাও তিনি দেখছেন। তার মতে, দেশ এখন সংকটে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ঐক্য সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ সাম্যবাদী দলের (এম-এল) পলিটব্যুরোর সদস্য লুৎফর রহমানও স্বীকার করেন যে, ৫ আগস্টের পর তাদের দল কার্যত সংকটের মধ্যে ছিল। নানা জায়গায় কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। তবে এখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় তারা আবার সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
লুৎফর রহমান বললেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের যে মূল্যায়ন আগে ছিল, এখনো তারা সে অবস্থানেই আছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত আন্দোলন ও প্রাণহানির দায় তাদের ওপর বর্তায় না। বরং বিভিন্ন সময়ে সরকারকে সতর্ক করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
লুৎফর রহমান বলেছেন, ‘আমরা একসময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, আমরা জোট থেকে বের হয়ে যাব। ইনু ও মেনন ভাইয়ের সঙ্গে আলাপও করেছি। কিন্তু তারা রাজি হননি। আমরা একা বের হয়ে গেলে তো কোনো ফল আসত না। তার পরও আমরা অনেক চেষ্টা করেছি।’
সবমিলিয়ে দীর্ঘ নীরবতার পর ১৪-দলীয় জোটের শরিক দলগুলো আবারও নিজেদের সংগঠিত করার চেষ্টা করছে। তবে তাদের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। একদিকে জনসমর্থন পুনরুদ্ধারের লড়াই, অন্যদিকে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন অবস্থান তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা। তাই এখন দেখার বিষয়, এই তৎপরতা শুধু অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়াস হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোনো সমীকরণ তৈরির ভিত্তি হয়ে ওঠে।